আবু সুফিয়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলে– “আমি গোত্রের সর্দার হয়ে থাকলে যে অন্যায় তোমরা করেছ তা আমি ক্ষমা করব না।”
ইকরামা পাল্টা বলে– “আবু সুফিয়ান! সে সময়ের কথা হয়ত তোমার মনে আছে, খালিদ মদীনায় চলে যাবার সময় তুমি তাকেও হুমকি দিয়েছিলে। আমি তখন তোমাকে বলেছিলাম, প্রত্যেকের ধর্মীয় স্বাধীনতা রয়েছে। যে যাকে ভালবাসে সে তার কাছে যেতে পারে। সেদিন আমি তোমাকে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছিলাম যে, তুমি পদক্ষেপ পরিবর্তন না করলে আমিও সঙ্গ ত্যাগ এবং মুহাম্মাদের আনুগত্য করতে বাধ্য হব।”
“তোমরা বোঝ না যে, সম্মানিত ব্যক্তিগণ কখনো সন্ধি ভঙ্গ করে না।” আবু সুফিয়ান বলে– “তোমরা বনু বকরের সাহায্যার্থে গিয়ে এবং মুসলমানদের মিত্র গোত্রের উপর হামলা করে নিজ গোত্রের মুখে চুন-কালি লাগিয়েছ। যদি মনে করে থাক যে, মুহাম্মাদ প্রতিশোধ নিতে মক্কা আক্রমণ করলে তোমরা তা প্রতিহত করবে, তাহলে নিশ্চিত যে তোমরা অলীক স্বপ্ন এবং অনর্থক আত্মতুষ্টিতে লিপ্ত রয়েছ। মদীনার বন্যা ঠেকানোর সাধ্য তোমাদের নেই। কোন ময়দানে তোমরা মুসলমানদের ঠকিয়েছ? বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমরা মদীনা অবরোধ করনি?”
সফওয়ান বলে– “অবরোধ ছেড়ে পিছু হটার নির্দেশ তুমিই দিয়েছিলে। তুমি আগে ভাগেই পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিলে।”
“আমি তোমাদের মত জেদী এবং অদূরদর্শী লোকদের কারণে পুরো গোত্রকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে পারি না।” আবু সুফিয়ান বলে– “আমি মুসলমানদের সাথে প্রতারণা করতে পারি না। আমি মুহাম্মাদকে সমস্ত ঘটনাটি জানিয়ে বলব যে, আমাদের এক মিত্র গোত্র মুসলমানদের এক মিত্র গোত্রের উপর হামলা করেছে। আমার অজান্তে কুরাইশদের কতিপয় লোকও তাদের সাথে শরীক হয়। এর অর্থ এই নয় যে, আমি চুক্তি ভঙ্গ করেছি। আমি মুহাম্মাদকে জানাব যে, কতিপয় অদূরদর্শীর পদস্খলন সত্ত্বেও কুরাইশরা হদায়বিয়া সন্ধির উপর অটল।”
আবু সুফিয়ান ইকরামা এবং সফওয়ানকে সেখানে রেখেই দ্রুত চলে যায়।
সে দিনই আবু সুফিয়ান মদীনার উদ্দেশে রওনা দেয়। শত্রুর কাছে সে নিজে চলে যাওয়ায় মক্কার জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তার বিরুদ্ধে স্লোগান উঠতে থাকে। তার স্ত্রী হিন্দা জনগণের মাঝে ঘুরে ঘুরে সবাইকে উত্তেজিত করতে থাকে। আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে জনগণকে প্ররোচিত করে।
মদীনায় পৌঁছে আবু সুফিয়ান প্রথমে যে দরজায় নক করে তা ছিল তার কন্যা উম্মে হাবীবা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর ঘর। দরজা খুলে পিতাকে দেখে কন্যা আনন্দের পরিবর্তে তার চেহারায় এসে জমা হয় রাজ্যের কালো মেঘ। কন্যা ইসলাম গ্রহণ করলেও এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিনী হলেও পিতা তখনও ইসলামের ঘোরতম শত্রু ছিল। শুধু শত্রই নয়; শত্রুপ্রধানও। তাই পিতার আগমনে কন্যার খুশি হওয়ার কথা থাকলেও শত্রুপ্রধান এবং অমুসলিম বিবেচনায় খুশির মুহূর্তেও কন্যার মুখে হাসি ফোটে না।
পিতা নিজ কন্যার ঘরে প্রবেশ করতে পারে না?” আবু সুফিয়ান কন্যার নির্লিপ্ততা দেখে জানতে চায়।
উম্মে হাবীবা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন– “পিতা যদি ঐ সত্যধর্ম গ্রহণ করে, যা তার কন্যা গ্রহণ করেছে তাহলে কন্যা পিতার পদতলে নিজের আঁখিযুগল বিছিয়ে দিতে প্রস্তুত।”
আবু সুফিয়ান বলে– “বেটি। আমি খুব পেরেশান হয়ে এসেছি। আমি শান্তি ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে এসেছি।”
উম্মে হাবীবা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন– “বেটি কি করতে পারে? আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যান।”
মেয়ের এই অসহযোগিতায় আবু সুফিয়ান নিরাশ হয়ে সেখান থেকে চলে আসে। এখন সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যাবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। রাস্তায় অনেক পরিচিত মুখ সে দেখতে পায়। যারা কুরাইশ গোত্রের ছিল এবং এর আগে তাকে নেতা মানত। এক সময়ের পরিচিত ব্যক্তিরা এখন তার দিকে অপরিচিতের মত তাকায়। সে তাদের দুশমন ছিল। তার বিরুদ্ধে অনেক যুদ্ধ করেছে। উহুদ যুদ্ধে এই আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা মুসলিম শহীদের পেট ফেঁড়ে তাদের নাক-কান কেটে তা দিয়ে হার বানিয়ে গলায় পড়েছিল।
আবু সুফিয়ান মদীনাবাসীর উৎসুক জনতার মাঝ দিয়ে যেতে থাকে এবং এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চলে যায়। সে হাত বাড়িয়ে দিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করমর্দন করেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অমনোযোগী ও উদাসীনতা দেখান। কেননা ইতোপূর্বেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেনে যান যে, বনু বকর কুরাইশদের ছত্রছায়ায় খোজাআ গোত্রের উপর আক্রমণ করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশদেরকে এখন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মত হচ্ছে এমন শত্রুর একমাত্র জবাব হচ্ছে– সৈন্য পাঠাও, যাতে তারা এ কথা মনে করার সুযোগ না পায় যে, আমরা দুর্বল।
আবু সুফিয়ান বলে– মুহাম্মাদ! আমি এ ভুল ধারণা নিরসন করতে এসেছি যে, আমি হুদায়বিয়ার চুক্তি লঙ্গন করিছি। বনু বকরের সাহায্যে কতিপয় কুরাইশ আমার অনুমতি না নিয়ে গেলে সেটা আমার অপরাধ নয়। আমি চুক্তি ভঙ্গ করিনি। তুমি চাইলে চুক্তি নবায়ন করতে পার আমি প্রস্তুত।”
