কিন্তু ন্যায়-নীতির আচমকা সন্ধি ভঙ্গ করে বনু বকর কোন ঘোষণা ছাড়াই এক রাতে খোজাআ বসতির উপর চড়াও হয়। বনু বকরের চুক্তিভঙ্গ করার কারণ কারো জানা ছিল না। তবে এক বর্ণনামতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এর পেছনে হিন্দার কুটচাল ছিল। হিন্দার যুক্তি ছিল, খোজাআ গোত্র যেহেতু মুসলমানদের মিত্র তাই বনু বকর খোজাআ গোত্রের উপর হামলা করলে তারা মুসলমানদের সাহায্য চাইবে। মুসলমানরা অবশ্যই সাহায্য করবে। এদিকে কুরাইশরাও তৈরী থাকবে। মুসলমানরা বনু বকরের উপর হামলা করতেই কুরাইশরা ‘মিত্র রক্ষার’ দোহাই দিয়ে মুসলমানদের উপর হামলা করে অতীত পরাজয়ের বদলা নিবে।
অন্য এক তথ্যমতে বনু বকরের আক্রমণ মূলত গাসসানী খ্রিস্টান ও ইহুদীদের ষড়যন্ত্রের ফসল ছিল। তারা এভাবে নীলনক্সা আঁকে যে, যে কোন উপায়ে কুরাইশ এবং মুসলমানদের মিত্র গোত্রে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারলে মিত্রতার খাতিরে কুরাইশ এবং মুসলমানদের মাঝে সংঘর্ষ বেঁধে যাবে। বনু বকর খোজাআদের চেয়ে শক্তিশালী গোত্র ছিল। গাসসানী এবং ইহুদীরা বনু বকরের এক মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে খোজাআ গোত্রের এক বসতির কাছে রেখে আসে। এদিকে বনু বকরের সর্দারের নিকট গিয়ে বলে, খোজাআরা তার গোত্রের একটি মেয়েকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। বনু বকর গোপনে তদন্ত করে তাদের একটি মেয়েকে খোজাআর এক বস্তিতে পেয়ে যায়।
হিন্দা আবু সুফিয়ানকে কিছু না জানিয়েই বনু বকরের সাহায্যে কুরাইশদের কয়েকজন লোক পাঠায়। এদের মধ্যে কুরাইশদের প্রখ্যাত সেনাপতি ইকরামা এবং সফওয়ানও ছিল। রাতের আঁধারে অতর্কিতে হামলা হওয়ায় খোজাআর বিশজন লোক মারা যায়। হিন্দা গোপনে লোক পাঠালেও এ তথ্য ফাঁস হয়ে যায় যে, বনু বকরের হামলায় সহায়তা করতে কুরাইশদের পক্ষ থেকে লোক গিয়েছিল।
খোজাআ প্রতিরোধের কোন সুযোগই পায় না। অনর্থক তাদের বিশজন প্রাণ হারায়। খোজাআ দলপতি এই অন্যায় হামলার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে সাহায্য প্রাপ্তির আশায় দুই তিনজন সাথি নিয়ে মদীনায় যায়। খোজাআ ছিল অমুসলিম গোত্র। খোজাআর এ প্রতিনিধিদল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমীপে পৌঁছে জানায় যে, বনু বকর কুরাইশদের সহযোগিতায় আমাদের উপর আক্রমণ করে। কয়েজন কুরাইশ যোদ্ধাও এই আক্রমণে অংশ নেয়। তারা আরও জানায় যে, ইকরামা এবং সফওয়ানও এই হামলায় অংশগ্রহণ করেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতিশয় ক্ষুব্ধ হন। এটা ছিল সরাসরি চুক্তি লঙ্ঘন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ মুজাহিদদের যুদ্ধ প্রস্তুতির নির্দেশ দেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর। ঘটনাটি যদি কেবল বনু বকর ও খোজাআর মধ্যে সীমাবদ্ধ হত তাহলে তিনি হয়ত অন্য সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু বনু বকরের উপর হামলায় কুরাইশদের বিখ্যাত সেনাপতি ইকরামা এবং সফওয়ান অংশগ্রহণ করায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ অপরাধ এবং সন্ধিভঙ্গের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব কুরাইশদের উপরই বর্তায়।
“আবু সুফিয়ান হুদায়বিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করেছে।” মদীনার অলি-গলিতে এই আওয়াজ প্রচার হতে থাকে –“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে আমরা মক্কার একটি একটি করে ইট খুলে ফেলব।… কুরাইশদের এবার পায়ের উপর আছড়ে ফেলে তবেই আমরা ক্ষান্ত হবো।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি চলতে থাকে।
আবু সুফিয়ান উড়ো খবরের মাধ্যমে এতটুকুই জানতে পারে যে, বনু বকর খোজাআ গোত্রের উপর গেরিলা ধরনের হামলা চালিয়েছে এবং এতে খোজাআ গোত্রের কিছু লোক নিহত হয়েছে। এ সংবাদ পাওয়ার পর তার মনে পড়ে যে, খুব ভোরে ইকরামা এবং সফওয়ানকে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে কোথা হতে ফিরে আসতে দেখেছিল। সে তাদের নিকট জানতে চেয়েছিল যে, তারা এত ভোরে কোথা থেকে আসছে। তারা তাকে এই জবাব দিয়েছিল যে, আমরা ভোরের হাওয়ায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। ভোরে মুক্ত বাতাসে একটু ঘুরে এলাম। আবু সুফিয়ান তাদের কথা বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু যখন দুপুরে সে জানতে পারে যে, বনু বকর খোজাআর উপর হামলা করেছে তখন আবু সুফিয়ানের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। সে তখনই ইকরামা এবং সফওয়ানকে ডেকে পাঠায়।
“খোজাআ গোত্রে বনু বকরের হামলায় তোমরা ছিলেনা-এর স্ব পক্ষে তোমরা প্রমাণ দিতে পারবে?” আবু সুফিয়ান ক্রুদ্ধ কণ্ঠে তাদের নিকট জানতে চায়।
“তোমার কি স্মরণ নেই যে, বনু বকর আমাদের মিত্র?” সফওয়ান বলে– “মিত্র সাহায্যের জন্য আবেদন করলে তুমি পিঠ দেখাবে?”
“সবকিছু আমার স্মরণ আছে।” আবু সুফিয়ান বলে– “খোদার কসম! তোমরা ভুলে গেছ যে, কুরাইশ সর্দার কে?… আমিই তোমাদের সর্দার।… আমার অনুমতি না নিয়ে তোমরা কারো সাহায্যে এগিয়ে যেতে পার না।”
ইকরামা বলে– “আবু সুফিয়ান! আমি তোমাকে গোত্রপ্রধান বলে অবশ্যই স্বীকার করি। তোমার নেতৃত্বে অসংখ্য যুদ্ধ করেছি। তোমার প্রতিটি নির্দেশ সঠিকভাবে পালন করেছি। কিন্তু এখন দেখছি, তুমি গোত্রের মান সম্মান দিন দিন হারিয়ে দিচ্ছ। তোমার মনে ‘মদীনা-ভীতি’ গভীরভাবে জেঁকে বসেছে।”
