এই দুঃসাহসিক হামলার পেছনে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উদ্দেশ্য ছিল, প্রলয়ঙ্কারী তুফানের হাত থেকে মুজাহিদ বাহিনীকে হেফাজত করা। প্রচণ্ড আক্রমণ করে গাসসানীদের পিছু হটিয়ে দিয়ে মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে নিরাপদে কেটে পড়াই ছিল তার মূল পরিকল্পনা। তিনি অত্যন্ত সাফল্যের সাথে এ কাজটি করেন এবং শত্রুপক্ষ পিছু হঁটে যেতেই তিনি মুজাহিদ বাহিনীকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। এভাবে এ অসম যুদ্ধ জয়-পরাজয় ব্যতীতই নিষ্পত্তি হয়।
এদিকে কিভাবে গুজব রটে যায় যে, মুজাহিদ বাহিনী পৃষ্টপ্রদর্শন করে ফিরে আসছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে মুজাহিদ বাহিনী মদীনা পৌঁছা মাত্রই লোকজন ‘পলায়নপর বাহিনী’ বলে ধিক্কার দিতে থাকে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এসব পাত্তা না দিয়ে সোজা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মখে গিয়ে রণাঙ্গনের আদি-অন্ত তুলে ধরেন। এদিকে বাইরে তিরস্কারের আওয়াজ ক্রমে জোরাল হচ্ছিল।
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনতার উদ্দেশে নির্দেশ ছুঁড়ে বলেন– থামো!” এরা রণাঙ্গন হতে পলায়নপর সৈন্য নয়। যুদ্ধ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও যুদ্ধ করতে থাকবে।… খালিদ ‘সাইফুল্লাহ্’ – আল্লাহর তরবারি।
ইবনে হিশাম এবং ওকিদী লিখেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র মুখের এই বাক্যটি পরবর্তীকালে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপাধিতে পরিণত হয়। “সাইফুল্লাহ”-আল্লাহর তরবারি। এরপর থেকে আল্লাহর পথে এ তরবারি সর্বদা কোষমুক্তই থাকে।
♣♣♣
কুরাইশদের সর্বোচ্চ নেতা আবু সুফিয়ান এতদিন হুঙ্কার ছেড়ে কথা বলতেন এবং মুসলমানদেরকে ‘মুহাম্মদী গ্রুপ’ বলে পাত্তা দিতনা কিন্তু এখন নীরব-নিস্তব্ধ। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ইসলাম গ্রহণের পর আবু সুফিয়ান সেনাপতি থেকে গোত্রপ্রধানে পরিণত হয়ে যায়। তাকে দেখলে মনে হত, যুদ্ধ-বিগ্রহের সাথে লোকটির কোনই সম্পর্ক নেই। হযরত উসমান বিন তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত প্রখ্যাত বীররাও তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তার অধীনে এখন উল্লেখযোগ্য ছিল মাত্র দু’জন, ইকরামা ও সফওয়ান। আবু সুফিয়ান অনুভব করে যে, কুরাইশী শক্তি এখন খুবই দুর্বল।
স্ত্রী হিন্দা একদিন তাকে বলে– “তুমি কাপুরুষ হয়ে গেছ আবু সুফিয়ান! তুমি মদীনাবাসীদের এই সুযোগ দিচ্ছ যে, তারা নিরাপদে সৈন্য সংগ্রহ করবে এরপর আচমকা একদিন মক্কার উপর চড়াও হয়ে মক্কা দখল করে নিবে।”
আবু সুফিয়ান হতাশাব্যঞ্জক কণ্ঠে বলে– “আমার সাথে আর আছেই বা কে হিন্দা?”
“আমাকে ঐ ব্যক্তির স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে, যে নিজ আত্মীয়-স্বজন এবং স্ব গোত্রের নিহতদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে ভয় পায়।” আবু সুফিয়ানের পৌরুষ লক্ষ্য করে হিন্দার নারী সুলভ বোমা নিক্ষেপ।
“আমি হত্যা করতে পারি।” আবু সুফিয়ান আহতস্বরে বলে– “আমি নিহত হতে পারি। আমি কাপুরুষ নই। ভীতু নই। আমি কোনমতেই স্বীয় অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারব না।…হদায়বিয়াতে মুহাম্মাদের সাথে আমার যে কথা হয়েছে তা কি তুমি ভুলে গেছ?”… কুরাইশ এবং মুসলমানরা আগামী দশ বছর পর্যন্ত যুদ্ধে লিপ্ত হবে না। যদি আমি চুক্তি ভঙ্গ করে যুদ্ধে নামি আর মুসলমানরা বিজয়ী হয়?”
“তুমি যুদ্ধ করবে না। হিন্দা বিকল্প পরিকল্পনা পেশ করে বলে– “কুরাইশরাও যুদ্ধ করবে না। আমরা নেপথ্যে থেকে অপর কোন গোত্রকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে অবতীর্ণ করতে পারি। আমাদের মূল লক্ষ্য মুসলমানদের ধ্বংস। চাই তা যেভাবেই হোক। যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে আমরা গোপনে তাদের সহযোগিতা করতে পারি।”
‘কুরাইশ ছাড়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়বে এমন দুঃসাহস কার? আবু সুফিয়ান বলে–“মুতায় হিরাক্লিয়াস এবং গাসসানের লক্ষাধিক সৈন্যের মোকাবিলায় মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার। আমার গোত্রের কোন ব্যক্তিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকারী অপর কোন গোত্রের সাহায্য করার অনুমতি দিব না।”
হিন্দা রুদ্র কণ্ঠে বলে– “ভুলে যেয়ো না আবু সুফিয়ান। আমি সেই নারী উহুদ রণাঙ্গনে যে হামযার পেট ছিড়ে কলিজা বের করে মুখে পুরে চিবিয়েছিলাম। তুমি আমার গরম রক্ত ঠাণ্ডা করতে পার কি?”
“তুমি হামযার লাশের পেট ফেঁড়ে ছিলে হামযার নয়।” আবু সুফিয়ান বিদ্রূপের হাসি হেসে বলে– “মুসলমানরা মৃত নয়।… আর তারা যাই হোক না কেন আমি চুক্তি ভঙ্গ করব না।
“চুক্তি তো আমিও লঙ্ঘন করব না।” হিন্দা বলে– “কিন্তু মুসলমানদের থেকে অবশ্যই বদলা নেব। আর সে বদলা হবে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। কুরাইশ গোত্রে এখনও বীর-বাহাদুর আছে।”
আবু সুফিয়ান আগ্রহভরে জানতে চায় “তা তুমি কি করতে চাও?”
“অচিরেই তুমি জানতে পারবে।” হিন্দা উত্তর পাশ কাটিয়ে যায়।
মক্কার পাশ্ববর্তী এলাকায় বনু খোজাআ এবং বনু বকর নামে দু’টি গোত্র বাস করত। তাদের মধ্যে পারস্পরিক বিবাদ ছিল অতি পুরোনো। হুদায়বিয়ায় মুসলমান বনাম কুরাইশদের মধ্যে আগামী দশ বছর কোন প্রকার সংঘর্ষে লিপ্ত হবে না বলে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হলে এই উভয় গোত্র সে চুক্তির আওতায় চলে আসে এভাবে যে, খোজাআ গোত্র মুসলমানদের আর বনু বকর গোত্র কুরাইশদের মিত্র হওয়ার ঘোষণা করে। হুদায়বিয়ার সন্ধি কুরাইশ আর মুসলমানদের মধ্যে হলেও খোজাআ এবং বনূ বকরের জন্য তা শান্তির পায়রা হয়ে যায়। কেননা, এ সন্ধির ফলে এবং দুই গোত্র চুক্তিবদ্ধ দু’পক্ষের পক্ষাবলম্বন করায় তাদের পারস্পরিক পুরাতন বৈরীতা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহও বন্ধ হয়ে যায়।
