ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ লিখেন, হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেকে সেনাপতির যোগ্য বলে মনে করতেন না এবং তিনি মুজাহিদদের মতামত ছাড়া সেনাপতি হতেও ইচ্ছুক ছিলেন না। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ ছিল, তিন সেনাপতি শহীদ হলে চতুর্থ সেনাপতি মুজাহিদরাই নির্বাচিত করবে। হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দৃষ্টি হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর পতিত হয়। তিনি কাছেই ছিলেন। কিন্তু হযরত খালিদের ইসলাম গ্রহণের বয়স মাত্র তিন মাস হওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে তার কোন ব্যক্তিত্ব তখনও পর্যন্ত প্রকাশ পাইনি। তা সত্ত্বেও হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর রণ-অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবগত থাকায় তিনি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দিকে পতাকা এগিয়ে দেন।
“খালিদ! নিঃসন্দেহে এই পদের যোগ্য তুমি” হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অস্বীকার করে বলেন “না” আমি এখনও এর যোগ্য হইনি।”
লড়াই কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু মুজাহিদদের আহবান করে বলেন, তোমরা খালিদকে পতাকা এবং সেনাপতির দায়িত্ব নিতে অনুরোধ কর। বেশিরভাগ মুজাহিদ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর রণকৌশল যোগ্যতা সম্বন্ধে জানতেন এবং কুরাইশগোত্রে তাঁর যে বিরাট পদমর্যাদা ছিল তাও তারা জানতেন।
“খালিদ… খালিদ… খালিদ!” চতুর্দিক হতে আওয়াজ হতে থাকে– “খালিদ আমাদের সেনাপতি।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্ষিপ্রগতিতে পতাকা হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাত থেকে নিজের হাতে নিয়ে নেন।
গাসসানীরা লড়াই চালিয়ে গেলেও সরে গিয়েছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জীবনে এই প্রথমবারের মত স্বাধীনভাবে রণনৈপুণ্য এবং নেতৃত্বের ঝলক দেখানোর সুযোগ পান। তিনি কয়েকজন সৈন্যকে নিজের পাশে পাশে রাখেন এবং তাদের দ্বারা দূতের কাজ নিতে থাকেন। নিজে ছুটোছুটি করেন এবং সেই সঙ্গে তলোয়ারও চালাতে থাকেন। এভাবে বহু প্রচেষ্টায় তিনি যুদ্ধে সক্ষম মুজাহিদ বাহিনীকে এক জায়গায় করে ঢেলে সাজান এবং তাদেরকে পিছনে সরিয়ে আনেন। গাসসানীরাও পিছে সরে যায়। তলোয়ারের ঝনঝনানী কিছুক্ষণের জন্য থেমে শুরু হয় তীরযুদ্ধ। উভয় পক্ষ হতে তীরের বর্ষণ হতে থাকে। খোলা আকাশ দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর উড়ছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিস্থিতি বুঝে নেন। মুজাহিদ বাহিনীও তাদের মনোবল দেখেন। এসব মিলিয়ে যে যোগফল বের হয় তাতে এ ছাড়া কোন উপায় ছিল না যে, সম্মুখে আর অগ্রসর না হয়ে এখানেই যুদ্ধের ইতি টানা। কেননা মুজাহিদ বাহিনীর সাহায্যের কোন সুযোগ না থাকলেও শত্র বাহিনী প্রয়োজনীয় সাহায্য চাওয়ার আগেই পেয়ে যাচ্ছিল। তদুপরি খাদ্যসঙ্কট কিংবা জনবলের কমতি তাদের ছিল না।
যুদ্ধ ক্ষান্ত করা পরিস্থিতির দাবি হলেও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধ ছেড়ে পিছু হটতে চাচ্ছিলেন না। কেননা তার আশঙ্কা ছিল, পিছু হঁটে গেলে শত্রুরা দুর্বলতা মনে করে পশ্চাদ্ধাবন করতে পারে। আর যদি আসলেই তারা পশ্চাদ্ধাবন করে তখন এই মুষ্টিমেয় সৈন্যকে রক্ষা করা কোনমতেই সম্ভব হবে না। চূড়ান্ত ধ্বংসের মুখে পড়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক চিন্তা-ভাবনার পর এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুজাহিদ বাহিনীর সম্মুখে এসে দাঁড়ান এবং চোখের পলকে গাসসানীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুজাহিদ বাহিনী পতাকা এবং সেনাপতিকে সম্মুখে দেখে তাদের শীতল রক্ত টগবগ করে উঠে। ভেঙ্গে পড়া মনোবল ইস্পাতসম দৃঢ় হয়ে যায়। “হয় হরণ নয় তো মরণ” এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। যোগ্য সেনাপতির সুনিপুণ নেতৃত্বে ক্ষুধার্ত শার্দুলের ন্যায় মুজাহিদ বাহিনী একযোগে শত্রু বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের এই হামলা এতই ক্ষিপ্র গতির ছিল যে, সংখ্যাধিক্য সত্তেও গাসসানীদের পা নড়বড় হয়ে যায়। মুসলমানদের নারাধ্বনি ও আক্রমণ আগুনের গোলা হয়ে তাদের উপর পতিত হতে থাকে। কোন কিছু বুঝার আগেই তারা মুসলমানদের হাতে হত্যাযজ্ঞের শিকার হতে থাকে। তারা এক স্থানে দাঁড়িয়ে এ হত্যাযজ্ঞ চালায় না বরং জায়গা পরিবর্তন করে করে গাসসানীদের হত্যা করতে থাকে। মুজাহিদ বাহিনী যেখানেই যায় সেখানেই লাশের স্তূপ এবং রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। মুসলমানরা ধূমকেতুর মত আভির্ভূত হয়ে চোখের পলকে কাজ করে হাওয়ায় মিলিয়ে যেত। পিছনে রেখে যেত লাশের স্তূপ আর আহতদের বুকফাটা আর্তনাদ। ঐতিহাসিকগণ লিখেন এবং হাদীসেও রয়েছে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেদিন মুষ্টিমেয় মুজাহিদ নিয়ে গাসসানীদের উপর এমন টর্নেডো সৃষ্টি করেন যে, আক্রমণের তীব্রতায় এক এক করে নয়টি তলোয়ার তার হাতে ভেঙ্গে যায়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দুঃসাহসিক এ হামলা করলেও অধিকক্ষণ এখানে অবস্থান করা উচিত মনে করেননি। তিনি কৌশলে মুজাহিদদের পশ্চাতে সরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন। এতেও তিনি সফল হন। তিনি মুজাহিদদের জিহাদী জোশ এবং ইসলামের আকর্ষণে এ দুঃসাহসিক আক্রমণ করেন। আক্রমণের তীব্রতা এবং নারাধ্বনির কম্পনে গাসসানীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে। তারা দিশেহারা হয়ে পিছনে সরে যায়। তাদের মাঝেও হতাশা সৃষ্টি হয়। এ সময় মুজাহিদদের দক্ষিণ ভাগের কমান্ডার হযরত উতবা ইবনে কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু গাসসানীদের মধ্যভাগে আচমকা প্রবেশকরে তাদের সেনাপতি মালেককে হত্যা করে। সেনাপতির মৃত্যুতে গাসসানীদের অবশিষ্ট শক্তিও নিভে যায়। ভয়-আতঙ্ক এবং উদ্বেগে সংখ্যাধিক্য হওয়া সত্ত্বেও তারা অনেক পেছনে চলে যায়। চেইন অব কমান্ড না থাকায় পুরো বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
