“আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রেমিকগণ।” হযরত জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঝাণ্ডা উড্ডীন করে জোরালো কণ্ঠে বলেন– “আল্লাহর শপথ! ইসলামের পতাকা ভূলুণ্ঠিত হতে পারে না।”
এরপর তিনি হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে তুলে নেন। নতুন সেনাপতি হযরত জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জ্বালাময়ী ভাষণে সৈন্যদের সাময়িক জড়তা ও হীনতা মুহূর্তে দূর হয়ে যায়। মনোবল শত্রু-বিধ্বংসী শক্তিতে রূপ নেয়। বিশাল শত্রুবাহিনীর ভীড়ের মধ্যে মুজাহিদ বাহিনী হারিয়ে গেলেও তাদের মনোবল ছিল তুঙ্গে। শক্তি ছিল তাদের অটুট। নব উদ্যোমে মুজাহিদরা লড়তে থাকে। ক্ষুধার্ত সিংহের ন্যায় প্রতিপক্ষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নারাধ্বনির রব রণাঙ্গনে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে। প্রতিপক্ষের কানে এ রব বজ্রধ্বনি হয়ে আঘাত হানে। তাদের দেশ থর থর করে কেঁপে ওঠে। এক অজানা আতঙ্ক তাদের গ্রাস করে ফেলে। নাটকীয়ভাবে যুদ্ধের ছন্দপতন ঘটে। এর বিপরীতে মুজাহিদ বাহিনী বীর-বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকে। তাদের সেনাপতিও সাধারণ সৈনিকের মত লড়তে থাকে। দীর্ঘক্ষণ তাদের পতাকা সমুন্নত ছিল।
কিছুক্ষণ পর পতাকা পতনের লক্ষণ দেখা দেয়। একবার উঁচু হয়, একবার নিচু হয়। পরবর্তী সেনাপতি হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওহা রাযিয়াল্লাহু আনহু দূর থেকে পতাকার উঠানামার দৃশ্য দেখতে পান। পতাকার এ উত্থান-পতনে তিনি বুঝতে পারেন পতাকাধারী আহত। তিনি পতাকা ঠিকমত সামাল দিতে পারছেন না। হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু আহত সেনাপতির উদ্দেশে দৌড়ে আসেন। কিন্তু চারপাশে এমন ভয়াবহ সংঘর্ষ চলছিল যে, সেখানে দ্রুত পৌঁছার কোন সুযোগ ছিল না।
প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা করে হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওহা রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতির নিকটে যেতে সক্ষম হন। তিনি সেখানে পৌঁছতেই হযরত জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু পড়ে যান। তার সমস্ত শরীর ছিল রক্তস্নাত। শরীরে এমন কোন স্থান ছিল না, যেখানে তীর, বর্শা, বা তরবারির আঘাত লাগেনি। ক্ষত-বিক্ষত এবং ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া দেহ নিয়ে এতক্ষণ পর্যন্ত হযরত জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সোজা হয়ে বসে থাকা এক অলৌকিক ব্যাপার ছিল। মনে হয় পরবর্তী সেনাপতি হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওহা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অপেক্ষায় তার রূহ এতক্ষণ পতাকা ধারণ এবং যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। হযরত জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু মাটিতে পড়েই শহীদ হয়ে যান। এদিকে হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু যথা সময়ে পতাকার কাছে পৌঁছে যাওয়ায় পতাকা হযরত জাফর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হস্তচ্যুত হলেও ভূলুণ্ঠিত হয় না। তিনি পতাকা ক্ষিপ্রগতিতে লুফে নিয়ে উঁচু করে তুলে ধরেন। তাকবীর ধ্বনি দিয়ে মুজাহিদদের জানিয়ে দেন যে, পতাকা এবং সেনাপতির দায়িত্ব এখন তার হাতে।
শত্রু বাহিনীর এ দলটি ছিল মূল বাহিনীর একাংশ মাত্র। তারা ছিল দশ থেকে পনের হাজার। এদের সকলেই গাসসানী খ্রিষ্টান। তারা এই যুদ্ধকে ক্রুসেড (ধর্মযুদ্ধ) মনে করে প্রাণপণ লড়ছিল। বিশাল এ বাহিনীর বিপরীতে মাত্র তিন হাজার মুজাহিদ আর কিইবা করতে পারে। কিন্তু তাদের নেতৃত্ব এত বিচক্ষণ এবং সমর দৃষ্টিকোণ থেকে এত সঠিক ছিল যে, মুজাহিদ বাহিনী অপূর্ব রণকৌশল এবং কৃতিত্বের সাথে পাল্লা দিয়ে লড়ে যাচ্ছিল। তাদের যুদ্ধের ধরন ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনীর মত ছিল না। কিন্তু তার পরও শত্রুসংখ্যা কয়েকগুন বেশি থাকায় মুজাহিদ বাহিনীর দুর্ভেদ্য প্রাচীরে ফাটল সৃষ্টি হতে থাকে। তাদের মাঝে বিক্ষিপ্ততা পরিলক্ষিত হয়। শত্রুর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে কতক সৈন্য রণাঙ্গন ছেড়ে চলে আসে। কিন্তু তারা বেশি দূরে না গিয়ে নিকটেই অবস্থান করতে থাকে। অবশিষ্ট মুজাহিদরা চারজন, পাঁচজন মিলে রণে লিপ্ত থাকার মাধ্যমে বিক্ষিপ্ততার শিকার হওয়া থেকে বেঁচে যায়।
সমর বিশেষজ্ঞগণ লিখেন, গাসসানীরা মুসলমানদের এই এলোপাথাড়ি অবস্থা থেকে কোন ফায়দা নিতে পারে না। তার কারণ এই ছিল যে, মুসলমানগণ এমন বীরবিক্রম এবং এমন অপূর্ব রণদক্ষতার সাথে যুদ্ধ করে যে, ইতোমধ্যে গাসসানীদের মধ্যে মুসলমানদের সম্পর্কে এক অজানা ভীতি চেপে বসে। তারা মুসলমানদের এই বিক্ষিপ্ততাকেও এক ধরনের জঙ্গী কৌশল ভাবে। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, মুসলিম সেনাপতি এবং কমান্ডারগণ উদ্ভূত পরিস্থিতি এভাবে সামাল দেন যে, পুরো বাহিনীকে আবার ঢেলে সাজাতে তারা তখনও যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন তাদেরকে কৌশলে রণাঙ্গনের বাইরে নিয়ে আসেন।
এ সময় ইসলামী পতাকা আরো একবার ভূপাতিত হয়। এর অর্থ, তৃতীয় সেনাপতি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহা রাযিয়াল্লাহু আনহুও শহীদ হয়ে যান। এ অবস্থায় মুসলমানদের অবস্থা আরো করুণ হয়ে পড়ে। তৃতীয়বার পতাকার পতন কোন শুভ লক্ষণ ছিল না; বরং তা অশুভ ইঙ্গিতবাহীই ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এই তিনজনকে সেনাপতি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এখন সেনাপতি নির্বাচন করা মুজাহিদদের উপর কর্তব্য হয়ে পড়ে।
সেনাপতির অভাবে পতাকা মাটিতেই পড়েছিল। আর পতাকার পতন অর্থই পরাজয় বরণ করা। নেতৃস্থানীয় এক মুজাহিদ হযরত সাবেত বিন আরকাম রাযিয়াল্লাহু আনহু পতাকা উঁচু করে ধরে বলেন– তাড়াতাড়ি কাউকে সেনাপতি নির্বাচিত কর। ততক্ষণ আমি পতাকা উড্ডীন রাখছি।… আমি সাবেত বিন আরকাম বলছি।”
