হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “আমরা ফিরে যাওয়ার অর্থ হিরাক্লিয়াস এবং গাসসানকে বিনা বাধায় হুড়হুড় করে মদীনা পর্যন্ত যাবার দাওয়াত প্রদান করা। আমরা এখানেই শত্রুদের গতিরোধ করব।”
হযরত যায়েদ বিন হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান– মুষ্টিমেয় এ সৈন্য নিয়ে বিশাল বাহিনীর গতিরোধ করা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব?”
হযরত জাফর ইবনে আবী তালেব হুংকার দিয়ে বলেন– “কোন্ রণাঙ্গনে আমরা সংখ্যায় স্বল্প ছিলাম না? পরামর্শ করে আমরা চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারলে কেউ মদীনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পরবর্তী নির্দেশ জেনে আসুক।”
“আমরা এতটা সময় অপচয় করতে পারি না।” হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– শত্রুরা আমাদের এ সুযোগ দিবে না। খোদার কসম! আমি কিছুতেই একথা জানতে দিব না যে, আমরা প্রতিপক্ষের সৈন্য দেখে ভীত।”
হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওহা রাযিয়াল্লাহু আনহু বৈঠক থেকে উঠে মুজাহিদদেরকে এক জায়গায় সমবেত করে এমন জ্বালাময়ী বক্তব্য দেন যে, তিন হাজার মুজাহিদের তাকবীর ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সেনাপতি হযরত যায়েদ বিন হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্মুখে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, তিন হাজার মুজাহিদ এক লাখ সৈন্যের মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা নিজেদেরকে এক বিরাট পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। ইতোমধ্যে হিরাক্লিয়াস এবং গাসসানের শীর্ষ নেতা খবর পেয়ে যায় যে, দূত হত্যার বদলা নিতে মদীনা থেকে মাত্র কয়েক হাজার সৈন্য আসছে। মুজাহিদদেরকে পদতলে পিষ্ট করতে হিরাক্লিয়াস এবং গাসসানের সম্মিলিত বাহিনীও যাত্রা শুরু করে।
♣♣♣
মুজাহিদ বাহিনী অগ্রসর হতে হতে ‘বালক’ গিয়ে পৌঁছে। আরো অগ্রসর হবার পরিকল্পনা তাদের ছিল। কিন্তু মুজাহিদ বাহিনী হতে তিন গুণ বেশি সৈন্য সমৃদ্ধ দুই প্লাটুন গাসসানী সৈন্য পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হযরত যায়েদ বিন হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহু মুজাহিদ বাহিনীকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড় করান। তিনি একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে এলাকাটি জরীপ করে নেন। এলাকাটি যুদ্ধের জন্য উপযোগী বলে তার কাছে মনে হয় না। পরবর্তী অন্যান্য সেনাপতিদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে তিনি মুজাহিদ বাহিনীকে পিছনে সরিয়ে আনেন। গাসসানী সৈন্যরা এটাকে “পিছুটান ভেবে মুজাহিদদের পশ্চাদ্ধাবন করে।
হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সমস্ত সৈন্য পিছু সরিয়ে এনে মুতায় সমবেত করে। দ্রুত বাহিনীকে যুদ্ধের কাতারে বিন্যস্ত করেন। তিনি মোট সৈন্যদেরকে তিনটি বাহিনীতে বিভক্ত করেন। ডান, বাম এবং মধ্য বাহিনী। ডান পার্শ্ব বাহিনীর কমান্ডার থাকেন হযরত উতবা ইবনে কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু। বাম পার্শ্ব বাহিনীর নেতৃত্বে হযরত উবায়া বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু আর মধ্যবাহিনীর নেতৃত্বে থাকে স্বয়ং সেনাপতি হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর হাতে।
হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উচ্চ কণ্ঠে কাতারবদ্ধ মুজাহিদদের উদ্দেশে বলেন– “আল্লাহ্ তা’আলার সত্য নবীর প্রেমিকগণ। আজ আমাদের প্রমাণ দিতে হবে যে, দুনিয়াতে একমাত্র আমরাই সত্যের পূজারী। বাতিলের হাত থেকে আজ আল্লাহর জমিন ছিনিয়ে আনতে হবে। বাতিলের সৈন্য দেখে ভীত হবে না।… মনে রেখ, এটা পেশী শক্তির লড়াই নয়। এটা সাহস, দৃঢ় মনোবল এবং বুদ্ধির লড়াই। আমি আপনাদের অধিনায়ক এবং পতাকাবাহীও। শত্রুর সৈন্য এত অধিক যে, আপনারা তাদের ভীড়ে হারিয়ে যাবেন। কিন্তু খবরদার! দেহ হারিয়ে গেলেও বুদ্ধি এবং প্রজ্ঞা হারিয়ে যেতে দিবেন না। আমরা এক সাথে যুদ্ধ করে এক সাথেই মরব।
একথা বলেই তিনি ইসলামের পতাকা হাতে তুলে নেন।
শত্রুদের পক্ষ থেকে প্রথমেই উড়ে আসে তীরের ঝাঁক। হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নির্দেশে ডান এবং বাম পার্শ্বস্থ বাহিনী প্রসারিত হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হয়। এটা ছিল সম্মুখ যুদ্ধ। মুজাহিদগণ ডানে-বামে আরো প্রসারিত হয়ে এগিয়ে যায়। যখন উভয় পার্শ্ববাহিনী অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মধ্য বাহিনীকে সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি ছিলেন সবার আগে। যুদ্ধে সাধারণত সেনাপতি মাঝখান থেকে সৈন্য পরিচালনা করে। কিন্তু মুজাহিদদের সাহস বৃদ্ধি ও প্রেরণা উজ্জীবিত রাখতে এ যুদ্ধে সেনাপতির জন্য সম্মুখে থাকা অপরিহার্য ছিল।
সেনাপতি হযরত যায়েদ বিন হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে ইসলামের পতাকা থাকায় শত্রুপক্ষ তাঁর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালাতে থাকে। বায়ুর গতিতে তার লক্ষ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুটে আসতে থাকে। ইতোমধ্যে কয়েকটি তীর তার দেহে বিদ্ধ হয়। আহত স্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে যায়। তারপরেও তিনি পতাকা নিচু হতে দেন না। থামে না মুখের তর্জন-গর্জন। এক হাতে পতাকা ধরে অপর হাতে তরবারি চালাতে থাকেন। এক সময় তার দেহে বিদ্ধ হয় বর্শা। আর সোজা হয়ে বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তিনি ঘোড়ার পৃষ্ঠ হতে জমিনে লুটিয়ে পড়ে শহীদ হয়ে যান। হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাত হতে পতাকা পড়ে গেলে মুজাহিদরা কিছুটা হতাশ হয়ে যান। কিন্তু হযরত জাফর বিন আবী তালেব রাযিয়াল্লাহু আনহু ঝড়ের গতিতে এসে পতাকা উঠিয়ে নেন।
