“এখন তোমার ইচ্ছা কি?” হিরাক্লিয়াস উলঙ্গপ্রায় এক তরুণীর হাত থেকে মদের পেয়ালা নিতে নিতে জানতে চায়।
“পরিষ্কার করে বললে এতে আমারও উপকার এবং আপনারও উপকার হবে।” শীর্ষ নেতা বলে– “আপনার সৈন্য আমি দেখেছি। আমার গোত্র কোন ছোট গোত্র নয়। বেশি না হলেও আপনার সমান সৈন্য সংখ্যা আমারও আছে। আপনি স্বদেশ থেকে দূরে। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা নিজ ভূমিতে লড়ব। তখন এখানকার প্রতিটি শিশু আপনার শত্রু হয়ে যাবে।
হিরাক্লিয়াস মুচকি হেসে বলে– “তুমি আমাকে ধমক দিচ্ছ?”
যদি বাস্তবেই এটা ধমক হয় তাহলে আমি নিজেকেও তা দিচ্ছি।” গাসসানের শীর্ষ নেতা বলে– “আমি আপনাকে পারস্পরিক যুদ্ধের পরিণতির কথা বলছি মাত্র। আর তা যে আমাদের কারো জন্য মঙ্গলজনক হবে না তা আপনি ভালো করেই জানেন। তবে আমাদের যুদ্ধ থেকে মদীনাবাসীরা অবশ্যই ফায়দা লুটবে। নিজেদের রক্তক্ষয় না করে আসুন, আমরা উভয়ে জোট হয়ে মুসলমানদের ধ্বংস করি। বিজয় হলে প্রতিদান স্বরূপ আমি কিছুই চাইব না। বিজিত এলাকা হবে আপনারই। নিজ ভূখণ্ডে আমি ফিরে আসব।… নিজেরা যুদ্ধ করে শক্তি নষ্ট না করি। প্রথমে এমন এক শক্তিকে শেষ করি, যা মদীনা হতে আমাদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত হচ্ছে।”
সম্রাট হিরাক্লিয়াস বলে– “আমি তোমার প্রস্তাব সমর্থন করছি।”
“তাহলে আপনার সৈন্যদের নিষেধ করে দিন যেন তারা গাসসানী কোন বসতিতে লুটপাট না করে।”
“হ্যাঁ, নিষেধ করব।” হিরাক্লিয়াস বলে– “মদীনাবাসীদের এখানে আসার অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। আমরাই মদীনার দিকে এগিয়ে যাব।”
তাদের বেশি দিন বসে থাকতে হয় না। ইতোমধ্যেই মদীনার তিন হাজার মুজাহিদ মুতার উদ্দেশে মদীনা হতে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। মুতার কাছাকাছি ‘মাআন’ নামক স্থানে মুসলিম বাহিনী যাত্রা বিরতি করে। এই এলাকা এবং সম্মুখের অঞ্চলটি মুজাহিদদের একদম অপরিচিত। সামনের কোন খবরও তাদের জানা ছিল না। সামনে শত্রুসৈন্য আছে কি-না তা জানা অতীব জরুরী ছিল। থাকলে তারা সংখ্যায় কত এবং তারা কোন অবস্থায় আছে। এই তথ্যটুকু সংগ্রহ করতে তিন-চারজন মুজাহিদকে দরিদ্র উষ্ট্রচালকের বেশে সামনে প্রেরণ করা হয়।
এই গোয়েন্দা টিম রাতে কোথাও কাটিয়ে পরের দিন বিকেলে ফিরে আসে। তাদের সংগৃহীত তথ্য মুসলমানদের জন্য সুখকর ছিল না। তারা যেতে যেতে অনেক দূরে গিয়েছিল। সর্বপ্রথম দু’টি গাসসানী পরিবার তাদের নজরে পড়ে। তারা পূর্বের বাসস্থান ছেড়ে নতুন আবাসের উদ্দেশে কোথাও যাচ্ছিল। উভয় পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ছিল যুবতী নারী। তাদেরকে বেশ ধনাঢ্য এবং প্রভাবশালী মনে হয়। তাদের পারিবারিক জিনিস পত্রে কয়েকটি উট বোঝাই ছিল। কাফেলা বিশ্রাম নিতে এক স্থানে থামে।
মুসলিম গোয়েন্দা টিমটি সেখানে যাত্রাবিরতি করে। তারা স্বল্প সময়েই গাসসানী কাফেলার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলে। কিন্তু তাদের মুসলিম পরিচয় ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করে না। নিজেদের গন্তব্য বলতে গিয়ে বলে, তারা বসরা যাচ্ছে। সেখান থেকে বাণিজ্য পণ্য আনবে।
কাফেলার লোকেরা গোয়েন্দাদের সতর্ক করে বলে– “সামনে যেয়ো না; এখান থেকেই ফিরে যাও। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সৈন্যরা লুটপাট এবং হত্যা চালাতে চালাতে এগিয়ে আসছে। তোমাদের ধন-সম্পদ এবং উট তারা দেখলে নিয়ে যাবে। মেরে ফেলারও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।”
দীর্ঘক্ষণ ধরে চলতে থাকে হিরাক্লিয়াসের স্বয়ং সৈন্য নিয়ে আগমন সংক্রান্ত আলোচনা। গোয়েন্দারা কৌশল জেনে নেয় যে, রোমক সৈন্যের ভয়ে ভীত হলেও তারা নিজ চোখে তাদের দেখেনি। শুধু লোকমুখে শুনেছে যে, সৈন্য জর্দানে প্রবেশ করে লুটতরাজ চালাচ্ছে। যেহেতু তাদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বেশি সেজন্য তাদের রক্ষা করতে তারা অন্যত্র পালিয়ে যাচ্ছে।
হিরাক্লিয়াস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা গোয়েন্দা দলটির জন্য অপরিহার্য ছিল। কাজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদজনক। তবুও তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আরো সম্মুখে অগ্রসর হয়ে গাসসানের একটি বসতিতে প্রবেশ করে এবং এই বলে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে যে, আমরা বসরায় যাচ্ছিলাম পথিমধ্যে লুটেরা আমাদের সবকিছু লুট করে নিয়ে গেছে। লোকজন তাদের বিপদগ্রস্ত দেখে আপ্যায়ন করে এবং যথেষ্ট আন্তরিকতা ও আতিথেয়তা প্রদর্শন করে। গোয়েন্দারা তাদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য পেয়ে যায়।
বাস্তব অবস্থা ছিল এই যে, হিরাক্লিয়াস এবং গাসসান গোত্রের মধ্যে মৈত্রীচুক্তি হয়েছে। গাসসানীরা নিজেদের সৈন্য হিরাক্লিয়াসের সৈন্যের মাঝে একত্র করে দেয়। সম্মিলিত বাহিনীর বর্তমান লক্ষ্য মদীনা। হিরাক্লিয়াসের সৈন্যসংখ্যা এক লাখ আর গাসসানী সৈন্য সংখ্যাও এক লাখ ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, প্রত্যেকের এক লাখ করে নয়; বরং সম্মিলিত বাহিনী ছিল এক লাখ। প্রতিপক্ষের সৈন্যসংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা তিন হাজার ছিল।
এ গোয়েন্দা রিপোর্ট মুসলিম সেনানায়কদের গভীর চিন্তায় ফেলে দেয়। প্রতিপক্ষের বিশাল সৈন্যবহর বনাম নিজেদের সংখ্যার অতি স্বল্পতা বিবেচনা করে প্রত্যাবর্তন করাই ছিল পরিস্থিতির দাবি। কিন্তু তারা ফিরে যাবার কথা চিন্তাও করেনা। অবশ্য ‘মাআন’ থেকে সম্মুখে এগিয়ে যাবার পরিকল্পনা স্থগিত রাখে।
