“খোদার কসম!” এক সাথি সাহস করে বলে– “আমরা মেহমানের সাথে এমন আচরণ করি না।”
“মেহমান মনে করেই আমি তোমাদের জীবন ভিক্ষা দিচ্ছি।” শারাহবীল বলে– “আশা করি লাশ ফেরৎ চেয়ে আমার কাছে আবেদন করবে না।”
মদীনার সবাই জানত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূত ইসলামের দাওয়াতী বার্তা নিয়ে বসরা গেছে। দুত কি জবাব নিয়ে ফিরে আসে তা জানতে সবাই আগ্রহী ছিল। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দূত ব্যতীত অপর তিন সঙ্গী ফিরে আসে। তাদের চেহারায় কেবল ক্লান্তির ছাপই ছিল না, বেদনা এবং ক্রোধও ঠিকরে পড়ছিল। তারা মদীনায় পা দিলে জনতা তাদের ঘিরে ভীড় করে।
“খোদার কসম!” আমরা বদলা নিব।” তিন মুহাফিজ সাথি হাত নাড়িয়ে একথা বলতে বলতে চলছিল– “মুতার শারাহবীলকে হত্যা করা আমাদের জন্য কর্তব্য হয়ে গেছে।”
এ হৃদয়বিদারক সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মদীনার সবাই এক জায়গায় এসে সমবেত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও যথাসময়ে সংবাদ পান। দূত হত্যায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। আরবের রীতি, হত্যার বদলে হত্যা। সমবেত জনতা “প্রতিশোধ প্রতিশোধ” বলে শ্লোগান দিচ্ছিল। বর্তমানের মত তৎকালীন যুগেও দূতিয়ালী প্রথা ছিল এবং শত্রুপক্ষের দূতকেও অপর পক্ষ সম্মান করত ও দূতকে নিরাপত্তা প্রদান করত। কারো দূত হত্যা করাকে যুদ্ধের শামিল বলে মনে করা হত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভারাক্রান্ত জনতার উদ্দেশে অশ্রুসিক্ত চোখে বেদনাহত কণ্ঠে বলেন– “প্রিয় মদীনাবাসী। আমি গাসসানীদের প্রতি যুদ্ধের বার্তা প্রেরণ করিনি। আমার বার্তা ছিল শান্তির বার্তা। আমি তাদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার আহবান জানিয়েছিলাম মাত্র। যদি তারা শান্তির বার্তা উপেক্ষা করে যুদ্ধ করতে আগ্রহী হয় তাহলে আমরাও যুদ্ধ করতে পিছপা হব না।”
জনতা শ্লোগান তোলে– “আমরা লড়ব… প্রতিশোধ নেব… মুসলমানরা দুর্বল নয়। মুসলমানের রক্ত এত সস্তা নয়। আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মান রক্ষায় জীবন দিয়ে দিব।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে সে দিনেই মুজাহিদ বাহিনী প্রস্তুত হয়ে যায়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিন হাজার মুজাহিদ যুদ্ধে নাম লেখান। সেনাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় যায়েদ বিন হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্কন্ধে।
যায়েদ শহীদ হলে সেনাপতি হবে জাফর বিন আবী তালেব।” যাবার প্রাক্কালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে দেন– জাফরও শহীদ হলে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওহা হবে তার স্থলাভিষিক্ত। আব্দুল্লাহও শহীদ হয়ে গেলে তখন মুজাহিদরা তাদের মধ্য হতে একজনকে সেনাপতি নির্বাচন করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।”
ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ লিখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরপর তিনজন সেনাপতি নির্ধারণ করে মুজাহিদ বাহিনীকে দুআ করে বিদায় দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত যায়েদ বিন হারেসা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে বলেন, মুতা পৌঁছেই প্রধান কাজ হল, আমাদের দূত হত্যাকারী শারাহবীলকে কতল করা। এরপর মুতা ও তার আশেপাশের মানুষকে ইসলামের প্রতি আহবান করবে। ইসলামের প্রকৃত পরিচয় তাদের সামনে তুলে ধরবে। তারা ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের উপর হস্ত উত্তোলন করবে না।
এই মুজাহিদ বাহিনীতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একজন সাধারণ সৈন্য তিনি কোন ইউনিট কিংবা ক্ষুদ্র দলেরও কমান্ডার ছিলেন না।
♣♣♣
রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের বাহিনী বর্তমান জর্দানের কোন এক স্থানে শিবির স্থাপন করে পূর্ব থেকেই অবস্থান করছিল। তারা গাসসান গোত্রের এলাকায় সেনা ছাউনি ফেলেছিল। ঐতিহাসিকদের ভাষ্যমতে রোম-সৈন্যসংখ্যা ছিল এক লক্ষ। বিশাল এ সেনাবহরে অত্র এলাকার বসতিগুলো ছেয়ে যায়। জমির ফসল, তাদের ঘোড়া এবং উট খেয়ে শেষ করে। জনগণের বাড়িতে যে খাদ্য সম্ভার এবং খেজুর সংরক্ষিত ছিল সৈন্যরা তা জোরপূর্বক কেড়ে নিয়ে যায়। যুবতী নারীদের ঠিকানা হয় কমান্ডারদের তাঁবু।
হিরাক্লিয়াসের তাঁবুটি ছিল চতুর্দিকে কারুকার্যখচিত মোটা পর্দা এবং উপরে বিচিত্র নক্শাগাঁথা ত্রিপালে ছাদ করা একটি ছোট্ট মহল। দামী কার্পেটে ফ্লোর মোড়ানো। প্রয়োজনীয় আসবাব পত্রেরও অভাব ছিল না। অধিকাংশটি স্বর্ণরৌপ্যের। গাসসান গোত্রের সর্বোচ্চ নেতা হিরাক্লিয়াসের সামনে হাঁটু গেড়ে বসা। হিরাক্লিয়াস স্বয়ং সসৈন্য আগমন সংবাদ পেয়ে সে মূল্যবান উপঢৌকন এবং তারই গোত্রের সেরা দশ-বারজন সুন্দরী যুবতী সাথে নিয়ে হিরাক্লিয়াসকে স্বাগত জানাতে গিয়েছিল। ঐ নারীদের দুই-তিনজন হিরাক্লিয়াসের উভয় পাশে বসা।
“তুমি আমাদের জানিয়েছ যে, মদীনার মুহাম্মদ তোমার প্রতি এই মর্মে বার্তা পাঠিয়েছিল যে, যেন তোমার গোত্র তার ধর্ম গ্রহণ করে।” হিরাক্লিয়াস গাসসানের নেতাকে বলে।
“আমি এটাও অবহিত করেছি যে, শারাহবীল নামক আমার এক আঞ্চলিক নেতা মদীনার দূতকে আমার নিকট পর্যন্ত পৌঁছতে না দিয়ে, তাকে মুতায় হত্যা করে।”
হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞাসা করে– “মদীনাবাসীদের এমন কি শক্তি আছে যে, তারা দূত হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারবে?”
শীর্ষ নেতা বলে– “তাদের শক্তি কম কিন্তু সাহস বেশি, তাদের উপর মুহাম্মাদের জাদু রয়েছে। প্রথম তাদের সম্পর্কে আমার নিকট সংবাদ পৌঁছলে আমি বিষয়টিকে তেমন আমলে নিইনি। কিন্তু ইতোমধ্যে তারা কয়েকটি রণাঙ্গনে লড়াই করেছে এবং প্রতিটিতেই বিজয় অর্জন করেছে। অথচ প্রতিটি যুদ্ধে প্রতিপক্ষের চেয়ে তাদের সংখ্যা ছিল অনেক কম। শুনেছি, মুহাম্মাদ এবং তার কমান্ডারদের যুদ্ধ-কৌশলের সম্মুখে কেউ টিকতে পারে না। আমার প্রতি তার ধর্ম গ্রহণের আহবান জানিয়ে পত্র প্রেরণ দ্বারা বুঝা যায় যে, সে নিজেকে বড় শক্তিমান ভাবছে।”
