বর্তমান সিরিয়ার জর্দান এলাকায় তৎকালীন যুগে গাসসান গোত্র বসবাস করত। দূর দূর এলাকায় তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। শক্তিধর হিসেবে এ গোত্রের সর্বত্র খ্যাতি ছিল। কারণ, তারা যেমন ছিল দুর্ধর্ষ যোদ্ধা তেমনি সংখ্যায়ও ছিল অনেক।
তখন রোমের সম্রাট ছিল হিরাক্লিয়াস। যুদ্ধবাজ এবং যুদ্ধ-প্রলয় হিসেবে তার খ্যাতি ছিল বিশ্বজুড়ে। ইসলাম দ্রুতগতিতে ব্যাপক প্রসার লাভ করছিল। হাজার হাজার কুরাইশ তখন ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে গেছে। তাদের বিখ্যাত নেতা ও সেনাপতিরাও মদীনায় গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেছে। যার ফলে মুসলমানরা একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ছোট ছোট কয়েকটি গোত্র ইসলামের পূর্ণ অধীনে চলে আসে।
মদীনাতে বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ পৌঁছতে থাকে যে, গাসসান গোত্র মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখতে মুসলমানদেরকে ময়দানে শক্তি পরীক্ষায় আহবান করতে চায় এবং এ উদ্দেশ্যে তারা ইতোমধ্যেই প্রস্তুতি নেয়াও শুরু করেছে। এ খবর প্রচার হয় যে, গাসসানের সর্বোচ্চ নেতা রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সাথে সখ্য গড়ে তুলে তার সমরশক্তিকেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাসসানের শীর্ষ নেতার উদ্দেশে এক রাষ্ট্রীয় দূতকে এই বার্তা দিয়ে প্রেরণ করেন যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরীক নেই। ইসলামই একমাত্র জীবন ব্যবস্থা। এর বাইরে যত ধ্যান-ধারণা আছে তা ধারণাপ্রসূত এবং মানব রচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে বার্তায় গাসসানের শীর্ষ নেতাকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বার্তাটি এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন, যাতে গাসসান গোত্র রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সমর শক্তির প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ না করে, বরং তারা ইসলাম গ্রহণ করুক। অতঃপর তাদেরকে মুসলমানদের সাথে একীভূত করে হিরাক্লিয়াসের খপ্পর থেকে রক্ষা করা হবে।
“আল্লাহর কসম! এর থেকে উত্তম কোন সিদ্ধান্তই হতে পারে না।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এক বৈঠকে বলেন– “হিরাক্লিয়াস সৈন্য প্রেরণ করলে তার অর্থ হল– শক্তির এক তুফান ধেয়ে আসছে, যা সবাইকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাওয়াত কবুল করার মধ্যেই গাসসানের মঙ্গল নিহিত।” অন্য আরেকজন মন্তব্য করে।
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আহবানে সাড়া না দিলে আমৃত্য হিরাক্লিয়াসের গোলাম হয়ে যাবে।” আরেকজন একথা সংযোজন করে।
রাষ্ট্রীয় দূত পৌঁছার আগেই হিরাক্লিয়াস গাসসানের এলাকায় চলে আসে। তার সাথে ছিল এক লাখ সৈন্য। গাসসানের শীর্ষ নেতা সঠিক সময়ে হিরাক্লিয়াসের আগমনের সংবাদ জানতে পারে। কিন্তু সে এতে উদ্বিগ্ন হয় না। কেননা ইতোপূর্বেই সে হিরাক্লিয়াসের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রেরিত দূত বসরায় যাচ্ছেন। কেননা বসরা ছিল গাসসানের রাজধানী। দূতের সাথে ছিল এক উষ্ট্রী বোঝাই পথের সম্বল ছাড়াও তিনজন প্রহরী।
দীর্ঘ সফরের পর দূত মুতায় গিয়ে পৌঁছেন। তিনি সামান্য বিশ্রাম নেয়ার জন্য ক্ষণিকের যাত্রা বিরতি করেন। কাছেই গাসসান গোত্রের একটি বসতি ছিল। বসতির সর্দারের নিকট খবর পৌঁছে যে, চারজন ভিনদেশী বসতির নিকটে বিশ্রাম নিচ্ছে। সর্দার শারাহবীল বিন আমর দূতকে তার কামরায় তলব করে এবং তার পরিচয় ও গন্তব্য জানতে চায়।
দূত জবাব দেন– “আমি মদীনার দূত; বসরা যাচ্ছি। আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বার্তা তোমাদের শীর্ষ নেতার নিকট বয়ে নিয়ে যাচ্ছি।”
শারাহবীল তিরস্কারের সুরে বলে– “কুরাইশ গোত্রের মুহাম্মাদের কথা বলছ? কি বার্তা নিয়ে যাচ্ছ?”
“বার্তার মূলকথা হলো, ইসলাম কবুল কর।” দূত জানান– “এবং ভ্রান্ত বিশ্বাস ত্যাগ কর।”
“আমাদের শীর্ষ নেতা এবং ধর্মের অপমান আমি সহ্য করব বলে ভাবছ?” শারাহবীল চড়া গলায় বলে–“বাঁচতে চাইলে এখান থেকেই মদীনা ফিরে যাও।”
বসরার পথ ত্যাগ করা আমার পক্ষে অসম্ভব।” দূত মদীনায় ফিরে যাবার আহবান প্রত্যাখ্যান করে বলেন– “এটা আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হুকুম। এ হুকুম পালন করতে গিয়ে গর্বের সাথে নিজের জীবন কুরবান করব।”।
“আর আমি গর্বের সাথে তোমার জীবন কেড়ে নেব।” শারাহবীল এ কথা বলে এবং তার লোকদের প্রতি হত্যার ইঙ্গিত দেয়।
দূতের অপর তিন সঙ্গী কক্ষের বাইরে বসা ছিল। ভেতর থেকে তিন ব্যক্তি বের হয়। তারা কারো রক্তাক্ত লাশ টেনে-হিচড়ে বের করছিল। লাশের দেহ মস্তক বিচ্ছিন্ন থাকলেও দূতের সাথিয় লাশ শনাক্ত করে ফেলে। লাশের পিছনে পিছনে শারাহবীলও বাইরে আসে।
“তোমরা তার সঙ্গী ছিলে?” শারাহবীল তিন সাথিকে বলে– “আমি মনে করি তাকে ছাড়া তোমরা বসরা যাবে না।”
এক সাথি জবাব দেয় “না। বার্তা ছিল তার কাছে।”
শারাহবীল বলে– যাও, মদীনায় ফিরে যাও। আর মুহাম্মাদকে বল– “আমরা গোত্র এবং আকীদা-বিশ্বাসের অবমাননা সহ্য করি না। লোকটি বসরা গেলে সেখানেও নিহত হত।”
