খালিদ দীর্ঘ গবেষণার পর প্রাপ্ত তত্ত্ব তার অন্যতম সহসেনাপতি এবং পারিবারিক সূত্রে তারই ভ্রাতুষপুত্র ইকরামাকে বলেন– “ইকরামা! আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছি।… আমি বুঝে গেছি।” “কি বুঝে গেছ খালিদ।” ইকরামা আগ্রহ ভরে জানতে চায়।
“মুহাম্মাদ জাদুকর নয়।” খালিদ বলেন– “এবং সে কবি নয়। মুহাম্মাদকে দুশমন মনে করা আমি ছেড়ে দিয়েছি। শুধু তাই নয়, আমি মুহাম্মাদকে আল্লাহর রাসূল বলেও মেনে নিয়েছি।”
“হুবল এবং উযযার শপথ! এটা তোমার ইয়ার্কি ছাড়া আর কিছুই নয়।” ইকরামা বলে– “কেউ বিশ্বাস করবে না যে, ওলীদের বেটা বাপ-দাদার ধর্ম ত্যাগ করছে।” “ওলীদের পুত্র পৌত্তলিক ধর্ম ত্যাগ করেছে।” খালিদ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন।
মুহাম্মাদ আমাদের অসংখ্য মানুষ হত্যা করেছে, তা কি তুমি ভুলে গেছ?” ইকরামা বলে– “তুমি তার ধর্ম গ্রহণ করতে যাচ্ছ, অথচ আমরা যার রক্ত পান করতে উদগ্রীব!”
“তুমি যাই বল, আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।” খালিদ সুস্পষ্ট ভাষায় তার মনোভাব জানিয়ে বলেন– “আমি বুঝে-শুনে ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল অবিচল।”
সেদিন সন্ধ্যায় আবু সুফিয়ান খালিদকে তার বাসগৃহে ডেকে নেয়। ইকরামাও সেখানে উপস্থিত ছিল।
আবু সুফিয়ান খালিদকে জিজ্ঞেস করে– “মুহাম্মাদের কথার মারপ্যাচে তুমিও আটকে গেছ?”
“তুমি সত্যিই শুনেছ আবু সুফিয়ান।” খালিদ দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন– মুহাম্মাদের কথা অনেকটাই গভীর, প্রভাবপূর্ণ।
ঐতিহাসিক ওকিদী লিখেন, আবু সুফিয়ান গোত্রপ্রধান হেতু সে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বলে। অন্যথায় তাকে হত্যা করার হুমকি দেয়। খালিদ আবু সুফিয়ানের হুমকি মুচকি হেসে উড়িয়ে দেন। কিন্তু পাশে বসা হযরত খালিদের ভাতিজা ইকরামা আবু সুফিয়ান কর্তৃক চাচার এই অপমান সহ্য করতে পারে না। আবার ইকরামা নিজেও খালিদের সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধী ছিল।
ইকরামা ক্রোধান্বিত কণ্ঠে বলে– “আবু সুফিয়ান! আমি তোমাকে গোত্রপ্রধান মানি। কিন্তু তাই বলে খালিদকে যে ভাষায় তুমি হুমকি দিচ্ছ তা সহ্য করতে পারবোনা। তুমি খালিদকে ধর্মান্তরিত হতে নিষেধ করতে পার না। তারপরেও যদি তুমি খালিদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করো তাহলে খালিদের সাথে আমিও মদীনায় চলে গেলে তোমার অবাক হওয়ার মত কিছু থাকবে না।”
পরদিনই মক্কার মানুষের মুখে ছিল– “খালিদ ইবনে ওলীদ মুহাম্মাদের কাছে চলে গেছে।”
খালিদ মদীনা পানে এগিয়ে চলছেন। অতীত স্মৃতির মাঝে তিনি এমনভাবে হারিয়ে যান, যেন তিনি ঘোড়ায় চড়ে মদীনা নয়; বরং পায়ে হেঁটে ঘটনাবহুল অতীতে পায়চারী করছেন। তিনি এভাবে চলতে চলতে মদীনার এত কাছে চলে এলেন যে, উঁচু উঁচু ভবনের শীর্ষ চূড়াগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে।
কেউ তার নাম ধরে ডাক দেয় “খালিদ!” কিন্তু তিনি এটাকে অতীতের খেয়ালী আওয়াজ ভেবে পাত্তা দেন না।
কিছুক্ষণ পর অশ্বের খুরধ্বনি শুনতে পেয়ে তিনি মাথা উঠিয়ে তাকান। তাকে লক্ষ্য করে দু’টি ঘোড়া পাশাপাশি ছুটে আসতে দেখেন। তিনি দাঁড়িয়ে যান। ঘোড়া তার কাছে এসে থেমে যায়। এক অশ্বারোহী ছিল তারই গোত্রের বিখ্যাত যোদ্ধা আমর ইবনুল আস। আর দ্বিতীয় ঘোড়ায় ছিল উসমান বিন তালহা। তারা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি।
“তোমরা দুজন আমাকে মক্কায় ফিরিয়ে নিতে এসেছ?” খালিদ তাদেরকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারেন।
আমর ইবনুল আসের পাল্টা প্রশ্ন “তার আগে বল তুমি যাচ্ছ কোথায়?”
“তা তোমরা যাচ্ছ কোথায়?” খালিদ পুনরায় তাদেরকে প্রশ্ন করেন
“খোদার কসম! আমাদের জবাব তোমার মনঃপুত হবে না।” প্রশ্নের ধারাবাহিকতা পরিবর্তন করে উসমান বিন তালহা বলে– “আমাদের গন্তব্য মদীনা।”
“কথা পূর্ণ কর উসমান।” আমর ইবনুল আস পরিষ্কার ভাষায় তাদের উদ্দেশ্য বলে– “খালিদ! আমরা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করতে যাচ্ছি। আমরা মুহাম্মাদকে আল্লাহর সত্য নবী বলে স্বীকার করে নিয়েছি।”
“তাহলে তো আমরা একই পথের পথিক।” খালিদ উৎফুল্ল হয়ে বলেন– “এস আমরা একত্রে চলি।”
৬২৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মে ইসলামের ইতিহাসের দুই বিখ্যাত সেনাপতি খালিদ বিন ওলীদ এবং আমর ইবনুল আস এ দিন মদীনায় প্রবেশ করেন। তাদের সাথে ছিল উসমান বিন তালহাও। তিনজনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে গিয়ে হাজির হন। সর্বপ্রথম হযরত খালিদ বিন ওলীদ ভিতরে প্রবেশ করেন। তার পেছনে আমর ইবনুল আস এবং উসমান বিন তালহা প্রবেশ করেন। তিনজনই একযোগে ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দাঁড়ান এবং এক এক করে সবাইকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করেন।
♣♣♣
মদীনায় এসে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পর তার মধ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। এরই মধ্যে তিন মাস অতিক্রান্ত হয়ে যায়। তিনি বেশিরভাগ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্যে থেকে বিভিন্ন দিক থেকে উপকৃত হতেন। এ সময়ের মধ্যে কোন যুদ্ধের দামামা না বাজায় তার যুদ্ধ-নৈপুণ্য দেখানোর সুযোগ হয় না। যুদ্ধবিদ্যায় তার বিশেষ প্রজ্ঞা ও দক্ষতা ছিল। তার আভিজাত্য এবং বংশ মর্যাদাও সাধারণ আরবদের থেকে উন্নত ছিল। এরপরও তিনি কোনদিন সেনাপতি পদে বরিত হওয়ার দাবি করেননি। তিনি আজীবন নিজেকে একজন সাধারণ সিপাহী মনে করেন এবং তাতেই তিনি তুষ্ট থাকেন।
