আবু সুফিয়ান বলে– “আরো কিছু অশ্বারোহী পাঠাও। অন্তত একটি হামলা চালাও।”
এক অশ্বারোহী বলে– “নেতাজি। গেরিলা হামলা চালাতে আমরা বহু চেষ্টা করেছি। কিন্তু মুসলমানদের তাঁবুর আশে পাশে রাতদিন পাহারাদার ঘুরঘুর করে বেড়ায়।”
কুরাইশদের পক্ষ থেকে আরো কিছু অশ্বারোহী গেরিলা হামলার জন্য প্রেরণ করা হয়। তারা সন্ধ্যার একটু পর গেরিলা আক্রমণের উদ্যোগ নিলে মুসলিম টহল বাহিনী তাদের কয়েকজনকে আহত করে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়।
মক্কাবাসীদের মধ্যে থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। তারা রাতে নিদ্রাও যেত না। অবরোধের ভয়ে সর্বক্ষণ জাগ্রত এবং সতর্ক থাকত। এভাবে একের পর এক কয়েকদিন অতিবাহিত হয়। হঠাৎ একদিন এক মুসলিম অশ্বারোহী মক্কায় প্রবেশ করে আবু সুফিয়ানের ঠিকানা জানতে চায়। উৎসুক জনতার ঢল নামে তার পেছনে পেছনে আবু সুফিয়ানের উদ্দেশে সে কি বার্তা নিয়ে এসেছে তা জানতে সবাই সাথে সাথে চলতে থাকে। আবু সুফিয়ান আগন্তককে দূর থেকে দেখে দ্রুত আসে। খালিদও আসেন।
“আমি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বার্তা নিয়ে এসেছি।” মুসলিম অশ্বারোহী আবু সুফিয়ানকে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানায় এবং বলে– আমরা উমরা করতে এসেছি মাত্র “যুদ্ধ করতে আসিনি। উমরা করে ফিরে যাব।”
আবু সুফিয়ান জানতে চায় অনুমতি না দেয়া হলে কি করবে? আমরা আল্লাহ্ তা’আলার নির্দেশ মান্য করি মক্কাবাসীর নয়। মুসলিম অশ্বারোহী বলে– “আমরা আমাদের এবং ইবাদতখানার মাঝে কাউকে অন্তরায় হতে দেই না। মক্কায় আমাদের প্রবেশে বাধা দিলে মক্কা ধ্বংসের নগরীতে পরিণত হবে। মক্কার অলি-গলিতে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে।…আবু সুফিয়ান। ধ্বংস নয় আমরা শান্তির পয়গাম নিয়ে এসেছি। নিরাপত্তার উপঢৌকন নিয়েই আমরা এখান থেকে ফিরে যেতে চাই।”
হযরত খালিদের ঐ মুহূর্তগুলো স্মরণ হচ্ছে যখন এই মুসলিম অশ্বারোহী গম্ভীর কণ্ঠে তাদেরকে ধমক দিচ্ছিল। খালিদের রক্তে আগুন ধরে যাওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু কেন যেন তার রক্ত উত্তপ্ত হয় না। লোকটিকে তার খুবই ভাল লেগেছিল। তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর তাকে মোহিত করে। আবু সুফিয়ান মুসলিম অশ্বারোহীকে সেদিন যে জবাব দিয়েছিল তাও তার খুব মনঃপূত হয়েছিল। আবু সুফিয়ান বলেছিল, উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ একত্রে বসে সন্ধির শর্তাবলী চুড়ান্ত করবে।
♣♣♣
উভয় পক্ষের আলোচনা সাপেক্ষে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে একটি সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। মুসলমানদের থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং এবং কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল বিন আমর এ সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এ সন্ধি মোতাবেক সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, মুসলমান এবং কুরাইশদের মধ্যে আগামী দশ বছরের মধ্যে কোন ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহ হবে না। মুসলমানরা এ বছর ওমরা না করে ফিরে গিয়ে আগামী বছর উমরা করতে আসবে এবং মক্কায় মাত্র তিনদিন অবস্থান করতে পারবে।
সন্ধির শর্ত মোতাবেক মুসলমানরা ফিরে গিয়ে পরের বছর আবার আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ অসংখ্য সাহাবায়ে কিরাম এখন মক্কায়। সকলের দেহে উমরার বেশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন কুরাইশী। খালিদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভাল ভাবেই চিনতেন। কিন্তু অনেক দিন পর আজ মক্কায় রাসূলকে দেখে তার মনে হতে থাকে, এ যেন অন্য কোন মুহাম্মাদ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নুরানী চেহারা, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং অনুপম আচরণে তিনি এমন মুগ্ধ ও মোহিত হন যে, তার মাথা হতে এই ধারণা দূর হয়ে যায় যে, ইনি সেই ব্যক্তি যাকে সে স্বহস্তে হত্যা করার পরিকল্পনা করত।
খালিদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একজন সেনাপতি হিসেবে দেখতে থাকেন এবং শ্রেষ্ঠ সমরবিদ হিসেবে তিনি তাকে স্বীকৃতি দিন। হুদায়বিয়ার সন্ধি পর্যন্ত মুসলমানরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে ছোট-বড় আঠাশটি যুদ্ধ করেছিলেন। একটি যুদ্ধে সাময়িক বিপর্যয় ছাড়া প্রতিটি যুদ্ধেই তারা একচেটিয়া প্রভাব ফেলতে সক্ষম হন।
মুসলমানরা নিরাপদে উমরার কাজ সম্পন্ন করে। এদিকে তিনদিন পরেই তারা ফিরে যায়। কিন্তু এ সীমিত সময়ে তাদের আচার-আচরণ, বিচক্ষণদের অন্তরে নীরবে দাগ কাটে। এদের অন্যতম হলেন খালিদ। প্রায় দুমাস হল মুসলমানরা মদীনায় চলে গেছে। মুসলমানরা চলে যাওয়ার পর খালিদ আরেক খালিদে রূপ নেন। তিনি এখন আগের মত মুসলমানদের বিরোধিতা করেন না। তার মস্তিষ্ক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করার নিত্য-নতুন নীল নকশা প্রণয়ন করে না। কোলাহলপূর্ণ সরব জগৎ ছেড়ে ভাবেন নীরব সুদিন। নীরবে কাটে তার অধিকাংশ সময়। কিন্তু এ নীরবতা ছিল ঝড়ের আগাম বার্তা। একটি আসন্ন মনোবিপ্লব লুক্কায়িত ছিল এ রহস্যময় নীরবতায়। খালিদ ছিলেন রণাঙ্গনের মানুষ। যুদ্ধ ছিল তার পেশা। যুদ্ধ ছাড়া তিনি এতদিন কিছু বুঝেন নি, বুঝতে চাননি। ধর্ম-কর্ম বলতে তিনি কিছু বুঝতেন না। যুদ্ধই ছিল তার ধর্ম, প্রাণ সঞ্জীবনী শক্তি। ধর্মের ব্যাপারে তার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। তাই এ ব্যাপারে গভীরভাবে উপলদ্ধি করার প্রয়োজনও তিনি উপলদ্ধি করেন না। ধর্মগত বিরোধের কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কুরাইশদের মধ্যে এত রক্তক্ষয় তা নিয়েও তিনি কখনও ভাবেন নি। তার ধর্মের বাস্তবতা কতটুকু এবং মুহাম্মাদের প্রচারিত ইসলামের মর্মবাণী কি-তা তিনি কখনও যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখেন নি। আজ নতুন করে তার মধ্যে ভাবান্তর ঘটে। অতি কাছে থেকে মুসলমানদের দেখাই ছিল তার এ ভাবান্তরের সূচনা। মুসলমানদের সুন্দর স্বাচ্ছন্দময় তাদের জীবন-ধারা তার চিন্তার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আরবের পৌত্তলিকতা সঠিক না কি মুহাম্মাদের প্রচারিত ইসলাম সত্য এ প্রশ্নটি তার হৃদয় মুকুরে উধিত হয়। ধর্ম-বিশ্লেষণের প্রতি তার দৃষ্টি পতিত হয় মানবজীবনে ধর্মের গুরুত্বই বা কতটুকু তাও তার গবেষণার মধ্যে শামিল হয়।
