কয়েকজন সশস্ত্র উষ্ট্রারোহীকে মদীনা থেকে আসার পথে এবং আরো সম্ভাব্য দু’তিন দিকে এ উদ্দেশ্যে দ্রুত পাঠিয়ে দেয়া হয় যে, তারা মুসলমানদের অগ্রযাত্রার সংবাদ মক্কায় পৌঁছাতে থাকবে। মহিলারা উঁচু বাড়ির ছাদে উঠে মদীনার দিকে দেখতে থাকে। সূর্য ক্রমে নিচে নামছিল। মরুর আভা খুবই আকর্ষণীয় হয়। কিন্তু আজ মক্কার গোধুলি আভায় ছাপ ছাপ রক্ত দেখা যাচ্ছিল।
কোন প্রান্ত হতে উৎক্ষিপ্ত ধূলি ঝড় দেখা যায় না।
“তাদের এতক্ষণ চলে আসার কথা।” খালিদ ইকরামা ও সফওয়ানকে বলেন– “আমরা এত দ্রুত পরিখা খনন করতে পারব না।”
ইকরামা বলে– “আমরা পরিখার সাহায্যে লড়ব না।”
“আমরা তাদের অবরোধের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ব।” সফওয়ান বলে– “তাদেরকে দাঁড়াতেই দিব না।”
সূর্য অস্ত যায়। রাত গভীর থেকে গভীর হতে থাকে। কিছুই ঘটে না।
মক্কা সমগ্ররাত জেগে থাকে। আজ যেন সেখানে রাতই হয়নি। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদেরকে কেল্লা সদৃশ স্থানে স্থানান্তর করা হয়। আর যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম তারা সেনাপতির নির্দেশে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপিত মোর্চা মজবুত করছিল।
রাত অর্ধেক পেরিয়ে যায় তবুও মদীনার লোকদের আসার কোন লক্ষণ দেখা যায় না।
এক সময় পুরো রাতও পেরিয়ে যায়।
♣♣♣
আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করে– “খালিদ! কই তারা?”
“তুমি যদি মনে কর যে, তারা আসবে না তাহলে নিঃসন্দেহে এটা একটা মারাত্মক ধোঁকা হবে; যার মধ্যে তুমি নিপতিত।” হযরত খালিদ জবাবে বলেন– “মুহাম্মাদের মগজ পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতা তোমার নেই। যা সে চিন্তা করতে পারে তুমি তা মোটেও পার না। নিশ্চিত সে আসবে।”
এরই মধ্যে মুসলমানরা অন্যান্য কয়েকটি গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সর্বত্র তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। খায়বার যুদ্ধ এর মধ্যে অন্যতম। এ সমস্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণের ফলে তারা রণ-অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে।
খালিদ বলেন– “আবু সুফিয়ান! উহুদ প্রান্তরে মুসলমানদের যে রূপ তুমি দেখেছিলে এখন সে রূপ ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। তারা এখন যে কোন রণাঙ্গনে ত্রাস সৃষ্টি করতে সক্ষম। যুদ্ধ বিষয়ে তারা যথেষ্ট অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। এখনও সামনে না আসাটাও তাদের একটি যুদ্ধ-কৌশল।”
আবু সুফিয়ান কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল, ইতোমধ্যে এক উষ্ট্রারোহীর উদয় হয়। দ্রুতগামী একটি উট তাদের উদ্দেশে ছুটে আসতে থাকে। উষ্ট্রারোহী আবু সুফিয়ান এবং খালিদের কাছে এসে লাফ দিয়ে নিচে নামে।
“আমার চোখের দেখা হয়ত তোমরা বিশ্বাস করবে না।” আরোহী নেমেই বলে– “আমি মুসলমানদেরকে হুদায়বিয়াতে শিবির স্থাপন করে অবস্থান করতে দেখেছি।”
আবু সুফিয়ান উষ্ট্রারোহীর দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলে– “সে মুহাম্মাদ এবং তার বাহিনী হতে পারে না।”
“খোদার কসম! আমি মুহাম্মাদকে তেমনভাবে চিনি যেমনভাবে তোমরা দু’জন আমাকে চেন।” উষ্ট্রারোহী বলে– “আমি আরো এমন কতিপয় লোকদের দেখেছি, যারা ইতোপূর্বে আমাদেরই লোক ছিল এবং পরে মুহাম্মাদের দলে যোগ দিয়েছে।”
মক্কা থেকে তের মাইল পশ্চিমে একটি স্থানের নাম ‘হুদায়বিয়া’। রক্তপাত এড়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে দূরবর্তী এই হুদায়বিয়া নামক স্থানে এসে শিবির স্থাপন করেন।
খালিদ বলেন– “আমরা তাদের উপর রাতে গেরিলা আক্রমণ করব। তাদেরকে স্বস্তিতে থাকতে দেব না। তারা যে পথ ধরে হুদায়বিয়া গেছে, সে পথ তাদের ক্লান্ত করে দিয়েছে। তাদের হাড় ভেঙ্গে যাবার উপক্রম। তারা ক্লান্তি ঝেড়ে স্বাভাবিক হয়ে মক্কা আক্রমণ করবে। আমরা তাদেরকে বিশ্রামের সুযোগ দিব না।”
“আমরা তাদেরকে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারি।” খালিদ বলেন– “গেরিলা বাহিনী প্রস্তুত কর।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিবির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পূর্বেই সম্পন্ন করে রেখেছিলেন। অশ্বারোহী ইউনিট রাতে শিবিরের চতুর্দিকে টহল দিতে থাকে। দিনের বেলাও পাহারার ব্যবস্থা ছিল।
অশ্বারোহী টহল বাহিনী শিবিরের অল্পদূর দিয়ে আরেক অশ্বারোহী দলকে ধীরে ধীরে যেতে দেখে। মুসলিম টহল বাহিনী তাদের প্রতি এগিয়ে যায়। অপর অশ্বারোহী দলটি ছিল কুরাইশদের গেরিলা দল। তারা কড়া প্রহরা দেখে বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর অন্য প্রান্ত দিয়ে ফিরে আসে এবং মুসলমানদের তাঁবু হতে অল্প দূরে একটু থেমে আবার চলে যায়।
দ্বিতীয় দিন কুরাইশ গেরিলা দলটি মুসলিম তাঁবুর বেশ কাছে চলে আসে। এ সময় মুসলমানদের একটি টহল বাহিনী টহল দিতে দিতে বেশ দূরে গিয়ে আবার ফিরে আসে। তারা তাঁবুর পাশে কুরাইশদের দেখে ঘিরে ফেলে। কুরাইশ গেরিলা দলটি মুসলমানদের ঘেরাও থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তরবারি কোষমুক্ত করে। টহল বাহিনীর তরবারি পূর্ব থেকেই কোষমুক্ত ছিল। তারা ফুঁসে ওঠে। বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় তাদের উপর। ইতোমধ্যে টহল বাহিনীর অধিনায়ক এসে তার বাহিনীকে অস্ত্র সংবরণ করতে বলে।
“তাদের বেরিয়ে যেতে দাও।” টহল-কমান্ডার বলে– “আমরা যুদ্ধের জন্যে এসে থাকলে তাদের একজনকেও প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে দিতাম না।”
কমান্ডারের হস্তক্ষেপে কুরাইশ গেরিলা দলটি নিরাপদে চলে যায় এবং আবু সুফিয়ানকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে।
