এটা জাদু নয়।” খালিদ মনে মনে বলেন– “নেতৃত্ব আমার হাতে এলে আমিও এমন চাল দেখাতে পারি।”
এ কথা সত্য যে, খালিদের পিতা তাকে এমন ট্রেনিং ও প্রশিক্ষণ দেয় যে, তাকে রণাঙ্গনের জাদুকর বললেও বাড়াবাড়ি হবে না। কিন্তু তিনি তার দক্ষতা ও প্রজ্ঞা কাজে লাগানোর সুযোগ পান না। কেননা, তার নেতা ছিল আবু সুফিয়ান। সে শুধু গোত্রপতিই নয়। গোত্রের সর্বাধিনায়কও ছিল। আবু সুফিয়ানের অধীনস্থ থাকায় তিনি নিজের পক্ষ থেকে কোন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা কার্যকর করতে পারতেন না। এই অপারগতাসুলভ দুঃখ তার অন্তরে আবু সুফিয়ানের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করেছিল।
♣♣♣
কয়েকদিন আগের এ ঘটনাটি তার এক এক করে মনে পড়ছিল। এক হাজার চারশ মুসলমান তার ফাঁদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে মক্কাপানে এগিয়ে গিয়েছিল। তিনশ অশ্বারোহী নিয়ে পেছন থেকে আক্রমণের কোন চিন্তাই খালিদ করেন না। কেননা তিনি জানতেন, যে মুসলমানরা সংখ্যায় স্বল্প হওয়া সত্ত্বেও অধিক সংখ্যক শত্রুকে নাস্তানাবুদ করতে পারে, তাদেরকে এই তিনশ সৈন্য দ্বারা পরাস্ত করা সম্ভব নয়। কারণ, বর্তমানে মুসলমানদের সংখ্যা তাদের প্রায় চারগুণ।
তিনি কল্পনার চোখে মক্কা হাতছাড়া হয়ে যেতে দেখেন। এই আশংকার বাণও তার হৃৎপিণ্ডে খচখচ করে বিঁধতে থাকে যে, তার ফাঁদ ব্যর্থ হওয়ায় আবু সুফিয়ান তাকে তীব্র ভর্ৎসনা করবে, শুধু তাই নয়, কুরাইশদের পরাজয় এবং মক্কা পতনের জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে।
খালিদ তার বাহিনীকে একটি পথের ধারণা দিয়ে বলেন, মুসলমানদের আগেই মক্কায় পৌঁছতে হবে। এ পথের দূরত্ব অনেক বেশি হলেও মুসলমানদের চোখ এড়ানোই ছিল তার উদ্দেশ্য। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তিনশ অশ্বারোহী উল্কাবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। ভিন্ন পথের কারণে তিন মাইল দূরত্ব দেড় গুণ বৃদ্ধি পায়। খালিদ চলার গতি বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অতিরিক্ত দূরত্ব পুষিয়ে নিতে প্রয়াসী হন।
খালিদের মনের বেগের চেয়ে অধিক বেগে ঘোড়া ছুটতে থাকে। উন্নত জাতের তেজি ঘোড়া সন্ধ্যার বেশ আগেই মক্কা পৌঁছে যায়। সেখানে মুসলমানদের বাতাস তখনও পৌঁছেনি। মক্কার লোকজন অসংখ্য ঘোড়া আনাগোনার শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আবু সুফিয়ানও বাইরে আসে।
আবু সুফিয়ান প্রথমেই জানতে চায়। “তোমাদের ফাঁদ সফল হয়েছে?”
খালিদ ঘোড়া হতে নামতে নামতে বলেন– “তারা ফাঁদে পা-ই দেয়নি, তুমি মক্কার চারপাশে এমন পরিখা খনন করাতে পার, মুহাম্মাদ মদীনায় যেমনটি করিয়েছিল?”
“তারা এখন কোথায়?” আবু সুফিয়ান কাঁপা কণ্ঠে জানতে চায়– “তাদের সম্পর্কে আমাকে কিছু বললে হয় না?”
“যে সময় তুমি তাদের সম্পর্কে জানবে এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে ভাববে তার মধ্যে তারা মক্কা অবরোধ করে ফেলবে সহজে।” খালিদ বলেন– “হুবল এবং উযযার মর্যাদার শপথ। তারা পাহাড় এবং মরুর বুক চিরে চিরে আসছে। যদি তারা কারাউল গামীমের অপর কোন পথ ধরে আসে তাহলে তারা মানুষ নয়। কোন পদাতিক বাহিনী সে স্থান এত দ্রুত অতিক্রম করতে পারে না, যত দ্রুত তারা অতিক্রম করে এসেছে।”
আবু সুফিয়ান বলেন– “খালিদ! একটু ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে চিন্তা কর। খোদার কসম! আতঙ্কে তোমার কণ্ঠ কাঁপছে।”
হযরত খালিদ ফুঁসে ওঠে বলেন– “আবু সুফিয়ান, তোমার গুণ বলতে এতটুকু যে, তুমি আমার গোত্রপ্রধান। আমি তোমাকে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, তাদের পক্ষে মক্কার প্রতিটি ইট খুলে ফেলাও কোন কঠিন ব্যাপার নয়।”
খালিদ একথা বলে মাথা উঠালে তার অপর দুই সহসেনাপতি ইকরামা এবং সফওয়ানকে কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তিনি এবার তাদের সম্বোধন করে বলেন– “তোমাদের নেতা কে? আজ ভুলে যাও। শুধু এতটুকু মনে রাখ যে, মক্কাপানে তুফান ধেয়ে আসছে। নিজের ঐতিহ্য ও ইজ্জত রক্ষা কর। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে থেক না। মক্কা নগরী রক্ষা কর। দেব-দেবীদের বাঁচাও।”
মুহূর্তের মধ্যে সারা শহরে হুলস্থুল পড়ে যায়। যোদ্ধারা বর্শা, তীর-ধনুক এবং তরবারি নিয়ে মক্কা রক্ষায় বেরিয়ে পড়ে। নারী ও শিশুদেরকে দূর্গ সদৃশ স্থানে স্থানে স্থানান্তর করা হতে থাকে। যুবতী মহিলারাও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। এটা শুধু তাদের শহর এবং জান-মালের নয় বরং তাদের ধর্মের প্রশ্ন ছিল। তার গোত্র সমগ্র আরবে যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। তার পিতাকে আরবের লোকেরা ‘সমরপতি’ বলে অভিহিত করত। খালিদ নিজ গোত্রের যশ-খ্যাতি এবং গোত্রীয় ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
তিনি আবু সুফিয়ানকে এড়িয়ে যান। ইকরামা এবং সফওয়ানকে সাথে নিয়ে এমন পরিকল্পনা করেন, যার সুবাদে তিনি মুসলমানদেরকে শহর থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হন। তিনি কিছু সংখ্যক সৈন্য এ উদ্দেশ্যে বাছাই করেন, যারা শহর থেকে বহু দূরে চলে যাবে এবং মুসলমানরা অবরোধ করলে পেছন থেকে অবরোধকারীদের উপর চড়াও হবে। কিন্তু বেশিক্ষণ না। বরং অতর্কিতে হামলা করে মুহূর্তে গায়েব হয়ে যাবে।
যোদ্ধাদের ব্যতিব্যস্ততা ও রণধ্বনির মাঝে কতক নারীর মিষ্টি-মধুর স্বরও ঝংকৃত হতে থাকে। সকলের আওয়াজ মিলে একটি আওয়াজের রূপ পায়। এই সম্মিলিত গানের কথার মধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হত্যার উল্লেখও ছিল। আবেগ সঞ্চার এবং রক্তে তোলপাড় সৃষ্টিকারী গান ছিল। কণ্ঠশিল্পীরা মক্কার অলি-গলিতে এই গান পরিবেশন করে বেড়ায়।
