মুসলিম অশ্বারোহীগণ গিরিপথের আশেপাশে আনাগোনা অব্যাহত রাখে। এক-দুবার গিরিপথের মুখে এসে একটু অপেক্ষা করে আবার ফিরে যায়। কয়েকবার তারা অপর প্রান্ত দিয়ে পাহাড়ে প্রবেশ করে। খালিদ সন্তর্পনে সেদিকে যান। কিন্তু সেখান থেকেও তারা এক সময় বেরিয়ে পড়ে। এভাবে বিভিন্ন আচরণের মাধ্যমে বিশ মুসলিম অশ্বারোহী খালিদের দৃষ্টি তাদের দিকে নিবন্ধ রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ মুসলমানদেরকে নিরাপদে খালিদ বাহিনীর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে যেতে সহযোগিতা করেন। খালিদ মূল বাহিনীকে আক্রমণের আশায় এই বিশজনকে হাতের নাগালে পেয়েও ছেড়ে দেন।
সূর্যাস্তের পর খালিদের প্রেরিত গোয়েন্দা ফিরে আসে।
গোয়েন্দা খালিদকে রিপোর্ট দেয় তারা সেখানে নেই।”
খালিদ তিরস্কারের সুরে জিজ্ঞাসা করেন– “তোমার চোখ কি মানুষ দেখাও ছেড়ে দিয়েছে?”
উষ্ট্রচালক বলে– “কেবল তাদেরকে দেখতে পারে, যারা বিদ্যমান থাকে। যাদের না থাকার কথা বলছি তারা আসলেই নেই। তারা অন্যত্র চলে গেছে। কোন দিকে গেছে তাও আমি বলতে পারি না।”
এ গোয়েন্দা রিপোর্ট খালিদকে গভীর চিন্তার মধ্যে ফেলে দেয়। ইতোমধ্যে পাহাড়ের উপর রজনীর গাঢ় আঁধারের পর্দা চেপে বসায় তার পক্ষে নতুন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও উপায় ছিল না। তিনি অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকেন। হঠাৎ তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মুসলমানদের অগ্রবর্তী যে দলটি গত কয়দিন ধরে এখানে রহস্যজনকভাবে ঘুরাফেরা করছে তাদের গ্রেপ্তার করে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে। তিনি অনুভব করেন যে, অগ্রবর্তী দলটিও আর আগের জায়গায় নেই। অন্যদিন ঘোড়ার হ্রেষা ধ্বনি ভেসে আসলেও আজ সে স্থানটি নীরব।
সকালে সূর্য যথারীতি উদিত হয়। পৃথিবীকে আঁধারের কবল থেকে মুক্ত করে মুঠি মুঠি আলো বিলিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পূর্বে যেখানে আঁধারের চাদর ছিল এখন সেখানে সোনালী আস্তরণ। এ প্রভাত মদীনাবাসীর জন্য আনন্দ বয়ে নিয়ে এলেও খালিদ বাহিনীর ব্যর্থতাকে আরো ব্যাপৃত করে। খালিদ ভোর হতেই গিরিপথ থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। কিন্তু হঠাৎ তার মুখ ম্লান হয়ে যায়। সারারাত যা ধারণা করেছিল তাই বাস্তব হল। অগ্রবর্তী দলটির কোন খোঁজ নেই। আশে-পাশে খুঁজেও তাদের টিকিটিও ধরা যায় না। চরমভাবে নিজের ব্যর্থতা অনুভব করতে থাকেন। মনের ইচ্ছা এবং সমস্ত যুদ্ধ পরিকল্পনা মাটির সাথে মিশে যায়। একবার তার মনে হয়েছিল, নিজেই আসফান পর্যন্ত গিয়ে খবর নিয়ে আসবেন। কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে সে পরিকল্পনা বাতিল করেন। চতুর্দিকে নজর রাখতে দুই-তিনজন সৈন্যকে উঁচু উঁচু পাহাড়ে অবস্থানের নির্দেশ দেন।
অর্ধ দিন চলে যায়। সন্তোষজনক কোন সংবাদ আসে না। মুসলমানদের অগ্রবর্তী বাহিনীর বিশ অশ্বারোহীরও হদিস নেই। তার আশা ছিল যে অগ্রবর্তী বাহিনী আবার আসবে। কিন্তু না, তাদের টিকিটিও পাওয়া যায় না। মধ্যাহ্নে কাছাকাছি সময়ে তার এক অশ্বারোহী দ্রুত ঘোড়া হাকিয়ে তার কাছে এসে থামে।
অশারোহী দ্রুতকণ্ঠে বলে– “শীঘ্র আমার সাথে আসুন। যা আমি দেখেছি তা আপনিও দেখবেন।”
খালিদ উদ্বেগের সাথে জানতে চান “তুমি কি দেখেছ?” অশ্বারোহী বলে– “উৎক্ষিপ্ত ধূলি। এমন ধূলি কোন কাফেলার হতে পারে না। তারা মুসলিম বাহিনী এটা কি হতে পারে না?”
খালিদ সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া ছুটিয়ে পাহাড়ী এলাকার বাইরে চলে আসেন। তিনি জমীন থেকে ধুলিঝড় উঠতে দেখেন।
খালিদ বলেন– “মহান দেবতার কসম মুহাম্মাদের মত বিচক্ষণ কুরাইশ গোত্রে আর একজনও নেই। সে আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে।”
মুসলমানরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে কারাউল গামীমের অপর পাশ দিয়ে মক্কার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। অগ্রবর্তী দলের বিশ অশ্বারোহীও বহুদূর ঘুরে পাহাড় অতিক্রম করে রাতেই মূল বাহিনীর সাথে গিয়ে মিলিত হয়। খালিদ ঘোড়া ঘুরিয়ে ছুটে চলেন। তিনি কারাউল গামীমের ভিতরে প্রবেশ করে চিৎকার এবং ঘোড়া নিয়ে পায়চারি করতে থাকেন।
“সবাই বেরিয়ে এস। মদীনাবাসীরা মক্কায় চলে গেছে। সকলে সামনে এস।”
মুহুর্তে ৩‘শ অশ্বারোহী তার সম্মুখে এসে দাঁড়ায়।
খালিদ অশ্বারোহীদের সম্বোধন করে বলেন– “তারা আমাদের চোখে ধুলা দিয়ে গেছে। তোমরা হয়ত বিশ্বাস করবে না যে, তারা চলে গেছে কেননা, এই গিরিপথ ব্যতীত এ এলাকা অতিক্রম করার দ্বিতীয় কোন পথ নেই।… এখন আমাদের জীবন-মরণ নিয়ে খেলতে হবে। সামান্য অলসতা করলেই তারা মক্কা ঘিরে ফেলবে। তারা বাজিতে জিতে যাবে। বুদ্ধির পরীক্ষায় হেরে যাব আমরা।”
আজ মদীনায় যাবার সময় মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছে খালিদের আরো মনে পড়ে যে, মুসলমান কর্তৃক মক্কা অবরোধের শঙ্কা তার থাকলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই অপরূপ চালে তিনি ধন্য ধন্য করে উঠেছিলেন। তিনি নিজেও বড় যুদ্ধবাজ এবং অনুপম কুশলী ছিলেন। তিনি পরে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাহিনীকে ধোঁকা দিতে অগ্রবর্তী দলটি পাঠিয়েছিলেন। তারা সফলভাবে ধোঁকা দিতে পেরেছে। বিশজনের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে নিজে অন্য রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে যান।
