মার্চ মাসের শেষ দিন ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ। শীতের মৌসুম হলেও খালিদ এবং তার ঘোড়ার শরীর দিয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ছিল। তিনি ঘাঁটি বেছে নিয়ে পুরো গিরিপথের বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে ফেলেন। এতক্ষণ যারা গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত ছিল তাদেরকে আর সামনে যেতে দেন না। কেননা, মুসলমানরা তাদের মূল পরিচয় জেনে যাবার আশঙ্কা ছিল।
ধীরে ধীরে সময় বয়ে যায়। মুসলমানরাও কাছে চলে আসে। পাহাড়ী ফাঁদের অদুরে এসে তারা রাতের যাত্রাবিরতি করে।
পরদিন প্রত্যুষে ফযরের নামাযের পর মুসলমানরা রওনা হওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত হয় তখন এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “তোমার অবস্থা বলতে তুমি দৌড়ে দৌড়ে এখানে এসেছ এবং ভাল কোন সংবাদ নিয়ে আসনি।”
“হে আল্লাহর রাসূল!” মদীনার এই লোকটি বলে– “খবর ভালও নয় আবার বেশি খারাপও নয়।… মক্কাবাসীদের আচরণ সন্দেহজনক। আমি গতকাল থেকে কারাউল গামীমের পাহাড়ী এলাকায় ঘুরছি। খোদার কসম! যাদেরকে আমি দেখে এসেছি তারা আমাকে দেখেনি, আমি তাদের পুরো গতিবিধি সরেজমিনে দেখেছি।”
“এরা কারা?” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করেন।
“কুরাইশরা ছাড়া আর কারা হবে” লোকটি জবাবে বলে– “তারা সকলেই অশ্বারোহী। গিরিপথের আশে-পাশের প্রান্তরে তারা ঘাপটি মেরে বসে আছে।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চান তাদের সংখ্যা কত?
তিন-চারশ’র মাঝামাঝি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঐ গোয়েন্দা বলেন– “আমার চিনতে ভুল না হয়ে থাকলে তাদের সেনাপতি খালিদ বিন ওলীদ। তার কর্মব্যস্ত তা এবং ছোটাছুটি আমি সারাদিন চুপে চুপে লক্ষ্য করেছি। আমি তার এত কাছে যাই যে, সে আমাকে দেখা মাত্রই হত্যা করে ফেলত। খালিদ অশ্বারোহী দলকে গিরিপথের আশে-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে গোপন রেখেছে। আমার ধারণা ভুল না হলে বলব, সে আমাদের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে বসে আছে।”
“আমাদের আগমনের খবর মক্কাবাসী জেনে থাকলে তারা মনে করবে যে, আমরা মক্কা অবরোধ করতে এসেছি।” সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে হতে একজন বলেন।
“ঐ সত্তার কসম করে বলছি যার হাতে আমাদের সকলের জীবন।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “কুরাইশরা আমাকে যুদ্ধের জন্য আহবান করলেও আমি তাদের সাথে সংঘর্ষে যাব না। যে ইচ্ছা নিয়ে আমরা যাত্রা করেছি তা পরিবর্তন করব না। আমাদের লক্ষ্য মক্কায় গিয়ে উমরা পালন করা মাত্র। এই দুম্বা এবং বকরী কেবল কুরবানীর জন্য এনেছি। কুরাইশদের কারণে নিয়ত পরিবর্তন করে আল্লাহ পাককে নাখোশ করব না। রক্তপাত নয় আমরা উমরা করতে এসেছি।
এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করেন– “হে আল্লাহর রাসূল।” “তারা গিরিপথে আমাদের গতিরোধ করলে তাদের রক্ত বইয়ে দেয়া তখনও কি আমাদের জন্য বৈধ হবে না?
এক দুই পা করে সাহাবায়ে কিরাম এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে সমবেত হতে থাকে। সৃষ্ট পরিস্থিতি সহজে উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে মুক্ত আলোচনা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুক্তিসঙ্গত মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তদানুযায়ী সিদ্ধান্ত দিতেন।
দীর্ঘ আলোচনা শেষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিশজন চৌকস অশ্বারোহী বাছাই কর। তাদেরকে জরুরী দিক-নির্দেশনা দিয়ে সম্মুখে পাঠাও। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, তারা কারাউল গামীম পর্যন্ত অতি সতর্কতার সাথে যাবে। তবে গিরিপথে প্রবেশ করবে না। তাদের প্রধান কাজ হলো, খালিদ বাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করা। যদি খালিদ বাহিনী তাদের উপর হামলা করে তাহলে এভাবে রক্ষণাত্মক কৌশলী লড়াই করবে যে, ধীরে ধীরে পিছু হঁটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। তাদের আচার-আচরণ দ্বারা খালিদ বাহিনীকে এটা বুঝাবে যে, তারা মুসলমানদের অগ্রবাহিনী।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সাথে দু’টি কৌশল গ্রহণ করেন। খালিদ বাহিনীর চোখে ধুলা দিতে অগ্রবাহিনীর বেশে বিশজন অশ্বারোহী তাদের দিকে প্রেরণ করেন। যাতে তারা এদের দেখে মনে করে এবং এই অপেক্ষায় থাকে যে, পেছনে মূল বাহিনী আসছে। সাথে সাথে তিনি অবশিষ্ট মুসলমানদের নিয়ে গতিপথ পরিবর্তন করেন। শত্রুর দৃষ্টি এবং অনর্থক রক্তপাত এড়াতে তিনি স্বাভাবিক রাস্তা ছেড়ে অস্বাভাবিক রাস্তা বেছে নেন। এ পথ যেমনি ছিল দুর্গম তেমনি ছিল দীর্ঘও। পথ বন্ধুর হলেও সংঘর্ষ এড়ানোই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। সবচেয়ে বড় যে সমস্যা সামনে আসে তা হলো, এই নতুন দুর্গম পথ সম্বন্ধে মদীনাবাসীদের কারো জানা ছিল না।
♣♣♣
খালিদের দৃষ্টি মুসলমানদের অগ্রবর্তী দলটির উপর নিবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু অগ্রবর্তী বিশ অশ্বারোহী গিরিপথের কাছে এসে থেমে যায়। মাঝে মাঝে দুতিন অশ্বারোহী গিরিপথের মুখ পর্যন্ত আসত এবং এদিক-ওদিক লক্ষ্য করে ফিরে যেত। এই বিশজন যদি একত্রেও গিরিপথে প্রবেশ করত তবুও খালিদ তাদেরকে কিছু বলতেন না। কারণ তার আসল শিকার ছিল পেছনে। এই বিশজনের উপর হামলা করে তিনি ওঁৎ পেতে থাকার সংবাদ আগেভাগে প্রচার করতে চান না।
এটা বেশি দিনের ঘটনা নয়। কয়েকদিন পূর্বের মাত্র। একদিকে বিশ অশ্বারোহীর থমকে যাওয়া অপরদিকে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের মূল বাহিনী এখনও দৃষ্টিগোচর না হওয়ায় খালিদ খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। সময়ের সাথে সাথে তার স্নায়ুচাপও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাহলে কি মুসলমানরা যাত্রা মুলতবি করেছে? নাকি ওঁৎ পেতে থাকার সংবাদ ফাঁস হয়ে গেছে এই প্রশ্ন তাকে বেকারার করে তোলে। এক সময় সহ্য করতে না পেরে তিনি এক উষ্ট্রারোহীকে ডেকে ছদ্মবেশে বাইরে পাঠান এবং মুসলমানরা এখন কোথায় ও কি করছে তা জেনে আসতে বলেন।
