স্মৃতি তাকে কয়েকদিন পূর্বে টেনে নিয়ে যায়। আবু সুফিয়ান তাকে, ইকরামা এবং সফওয়ানকে বলেছিল যে, মুসলমানরা মক্কা হামলা করতে আসছে। দু’উষ্ট্রারোহীর মাধ্যমে আবু সুফিয়ান এ তথ্য জানতে পারে। তারা মুসলিম বাহিনীকে মক্কার দিকে ধেয়ে আসতে দেখেছিল।
খালিদ বাছাই করা তিনশত অশ্বারোহী নিয়ে পথিমধ্যেই মুসলমানদের প্রতিরোধ করতে পাহাড়ের খাদে খাদে পূর্ব থেকেই ঘাপটি মেরে থাকতে রওনা হয়। এ দুর্ধর্ষ বাহিনীকে তীব্রবেগে ছুটিয়ে নিয়ে যান তিনি। ত্রিশ মাইল দূরের একটি বিস্তীর্ণ পাহাড়ী অঞ্চল ছিল তার টার্গেট। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, মুসলিম বাহিনী ‘কারাউল গামীম’ থেকে এখনও বেশ দূরে। খালিদ চাচ্ছিলেন, মুসলিম বাহিনী আসার পূর্বে এখানে পৌঁছতে।
কারাউল গামীম মক্কা থেকে ত্রিশ মাইল দূরবর্তী পাহাড় অধ্যুষিত একটি এলাকার নাম। শত্রুর উদ্দেশে ওঁৎ পেতে থাকার জন্য স্থানটি খুবই উপযোগী ছিল। মুসলিম বাহিনী ইতোপূর্বেই সেখানে পৌঁছে গেলে হামলা চালানো দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।
তিনি পথিমধ্যে মাত্র দুই স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। তিনি উভয় বিরতি স্থলে অশ্বারোহী বাহিনীকে উদ্দেশ করে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন– “এটা আমাদের জন্য অগ্নি পরীক্ষা। গোত্রের মান-মর্যাদা আমাদের উপরই নির্ভরশীল। আমরাই পারি তা রক্ষা করতে। পূর্ব পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চাই আমরা। কারাউল গামীমের পাহাড়ী চক্করে ফেলে যদি আমরা মুসলিম বাহিনীকে বাধা দিতে না পারি তাহলে নিশ্চিত মক্কা মুসলমানদের পদানত হবে। আমাদের ভগ্নি, কন্যা তাদের বাঁদী দাসীতে পরিণত হবে। আমাদের সন্তানেরা তাদের গোলামে পরিণত হবে। উযযা এবং হুবলের নামে শপথ কর যে, আমরা কুরাইশ এবং মক্কার মর্যাদা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করব।”
তিনশ সৈন্যের সকলেই একযোগে গগন বিদারী শ্লোগান তোলে উযযা এবং হুবলের নামে আমরা জীবন কুরবান করব। একজন মুসলমানও জিন্দা ফিরে যেতে দেবো না।… কারাউল গামীমে মুসলমানদের রক্তগঙ্গা বইবে। মুহাম্মাদকে জীবিত ধরে মক্কায় নিয়ে যাব।… মুসলমানদের মাথার খুলি মক্কায় নিয়ে যাব।… কেটে টুকরো টুকরো করব।… মুছে ফেলব নাম-নিশানা।
তিনশ সৈন্যের এই দীপ্ত শপথে হযরত খালিদের বুক গর্বে ফুলে যায়। তিনি ওঁৎ পাতার জন্য খুবই উপযুক্ত জায়গা বেছে নেন। কার্যকর পরিকল্পনা তিনি হাতে নেন। তিনি শুধু অশ্বারোহী বাহিনী এই উদ্দেশ্যে নিয়ে যান যে, মুসলমানদের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত করবেন এবং আচমকা আক্রমণ করে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যাবেন। মুসলমানদের অধিকাংশই ছিল পদাতিক। খালিদের বিশ্বাস ছিল যে, তিনশ দুর্ধর্ষ সৈন্য দ্বারা তিনি এক হাজার চারশ মুসলমানকে ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট করে মারবেন। নিজস্ব সমর পরিকল্পনা ও বিচক্ষণতার উপর তার এতই আস্থা ছিল যে, তীরন্দাজ বাহিনী আনারও প্রয়োজন অনুমান করেন নি। অথচ পাহাড়ী অঞ্চলে তীরন্দাজ বাহিনীকে উঁচু স্থানে মোতায়েন করলে, নিচ দিয়ে অতিক্রমকারী মুসলমানদের তারা বেছে বেছে শিকার করতে পারত।
সম্মুখে এগিয়ে খালিদ তার বাহিনীকে কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে আরেক বার তাদের প্রেরণা চাঙ্গা এবং প্রতিশোধ স্পৃহাকে শান দিয়ে দেন স্বীয় বাহিনীর বীরত্বের উপর তার যথেষ্ট আস্থা ছিল।
মুসলিম বাহিনী তখনও বেশ দূরে ছিল। খালিদ উষ্ট্রচালকের বেশে তিন-চারজনকে আগে পাঠিয়ে দেন। তারা মুসলমানদের সম্পর্কে খালিদকে অবহিত করছিল। কিছুক্ষণ পরপর তারা পালাক্রমে এসে মুসলমানদের গতিবিধি সম্পর্কে জানাচ্ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গোয়েন্দাদের রিপোর্ট অনুযায়ী বাহিনীর চলার গতি বাড়াতে থাকেন। মুসলিম বাহিনী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে স্বাভাবিক গতিতে কারাউল গামীমে খালিদের পাতা ফাঁদের দিকে এগুচ্ছিল।
খালিদ এই তথ্যের মর্ম উদ্ধার করতে পারেন না যে, মুসলমানরা সাথে করে বহু দুম্বা এবং বকরী নিয়ে আসছে। তিনি এই প্রশ্নের কোন সদুত্তর বের করতে পারেন না যে, তারা মক্কা আক্রমণ করতে আসছে অথচ দুম্বা, বকরী সাথে করে নিয়ে আসছে কেন?
তাদের মধ্যে হয়ত এই আশঙ্কা এসে থাকবে যে, অবরোধ দীর্ঘ হলে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে।” খালিদের এক সাথি অভিমত ব্যক্ত করে বাস্ত বিকই এমন হলে তখন তারা এ সমস্ত পশু যবাই করে খাবে।… এ ছাড়া এ সমস্ত পশু কিইবা কাজে লাগতে পারে।”
“বেচারাদের জানা নেই যে, তারা মক্কা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারবে না।” খালিদ বলেন– “তাদের কষ্ট করে আনা বকরী-দুম্বা আমরা মজা করে খাব।”
মুসলমানরা কারাউল গামীম থেকে পনের মাইল দূরে থাকতেই খালিদ অভীষ্ট পাহাড়ে এসে ঘাপটি মারেন। তিনি তার বাহিনীকে পাহাড়ের পাদদেশে একে অপর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে অবস্থান নিতে বলেন এবং তিনি নিজে সামনে এগিয়ে যান। তিনি সামনের গিরিপথ পর্যন্ত অগ্রসর হন। সেখান দিয়ে কাফেলা এবং সৈন্যরা আসা-যাওয়া করত। তিনি এ স্থান পূর্বে বহুবার অতিক্রম করেছেন কিন্তু গিরিপথটি পূর্বে ঐ দৃষ্টিতে দেখেননি, যে দৃষ্টিতে এখন দেখছেন।
তিনি গিরিপথের ডানে-বামের উঁচু স্থানে উঠে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। নিচে নেমে মরু প্রান্তরের পিছনে যান এবং অশ্ব লুকানোর এমন স্থান খুঁজে বের করেন, ইশারা পাওয়া মাত্রই যেখান থেকে অশ্বারোহী বেরিয়ে অতর্কিতে মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
