হযরত বিশর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি গোস্তের টুকরো কেটে মুখে দিয়ে গিলে ফেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একটি টুকরো মুখে দেন কিন্তু না গিলেই থু-থু করে ফেলে দেন।
“বিশর! খেয়ো না। কারণ এই গোস্তে বিষ মিশ্রিত রয়েছে।”
হযরত বিশর ইতোমধ্যেই এক টুকরো গিলে ফেলায় গোস্তের সাথে সাথে বিষও তার পেটে গিয়ে পৌঁছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “কি হে ইহুদীনী। আমার কথা সত্য নয় যে, তুমি এই গোস্তে বিষ মিশিয়েছ?”
ইহুদীনীর পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি। তার অপরাধের প্রমাণ সামনে চলে আসে। হযরত বিশর রাযিয়াল্লাহু আনহু গলায় হাত দিয়ে উঠে দাঁড়ান এবং ঘুরে পড়ে যান। বিষ এত তীব্র ছিল যে, তিনি আর উঠতে পারেননি। বিষের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মরে যান।
“মুহাম্মাদ! শুনে রাখ” ইহুদীনী গর্বের সাথে স্বীকার করে বলে– “খোদার কসম! এটা আমার দায়িত্ব ছিল। আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ইহুদীনী এবং তার স্বামীকে হত্যার নির্দেশ দেন। খায়বারে ইহুদীদের সাথে তিনি যে সহানুভূতিমূলক আচরণ করতে চেয়েছিলেন এই ইহুদী নারীর জঘন্য মনোবৃত্তির কারণে তা পরিবর্তন করেন।
ইবনে ইসহাক লিখেন–“মারওয়ান বিন উসমান আমাকে বলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকালের ২/৩ দিন পূর্বে তার পাশে বসা উম্মে বিশরকে বলেছিলেন উম্মে বিশর। আমি আজও দেহে ঐ বিষের প্রভাব অনুভব করছি যা খায়বারের জনৈকা ইহুদীনী গোস্তের সাথে মিশিয়েছিল। আমি গোশত মুখে দিয়েই উগরে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই বিষের প্রতিক্রিয়া আজও রয়েছে। এর মধ্যে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তিম পীড়ার কারণ ছিল এই বিষই।
খালিদ বলেন– “মুহাম্মাদকে হত্যা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।”
আবু যুরাইয বলে– “তার জাদু আর কতদিন চলবে? একদিন না একদিন তাকে হত্যার শিকার হতেই হবে।…” আবু যুরাইয খালিদের কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে– “মুহাম্মাদকে হত্যার কোন পরিকল্পনা তুমি করেছ?”
“কয়েকবার।” খালিদ জবাব দেন– “যেদিন আমার গোত্র বদরের ময়দানে পরাজিত হয় সেদিন থেকে স্বহস্তে মুহাম্মাদকে হত্যার ফিকির করছি। কিন্তু আমার কোন পরিকল্পনা কার্যকর হচ্ছে না।
আবু যুরাইয আগ্রহের সাথে বলে– “পরিকল্পনা আমাকে বলবে কি?”
“কেন নয়?” খালিদ জবাবে বলেন– “খুবই সাধাসিধে পরিকল্পনা। আর তা হলো খোলামাঠে সামনা-সামনি লড়াই করে মুহাম্মাদকে হত্যা করা কিন্তু একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে আমার একার পক্ষে লড়াই করা সম্ভব নয়। পরপর তিন যুদ্ধে আমরা পরাজিত হয়েছি।
“খোদার কসম!” আবু যুরাইয হাসিতে ফেটে পড়ে বলে– আমি ভাবতেও পারিনি যে, ওলীদের বেটা এমন বোকা হতে পারে। আমি ইহুদীদের মত গোপন পরিকল্পনার কথা বলছি। আমি প্রতারণার পন্থার কথা বলছি। সামনা-সামনি লড়াই করে তুমি মুহাম্মাদকে কখনও হত্যা করতে পারবে না।”
“প্রতারণার মাধ্যমেও তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না।” খালিদ বলেন– “প্রতারণা কখনো সফল হয় না।”
বৃদ্ধ আবু যুরাইয খালিদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে তার উন্মুক্ত বক্ষে হাতের আঙ্গুলের মাথা রেখে বলে– “অন্য কারো প্রতারণা ব্যর্থ হতে পারে কিন্তু ইহুদীদের প্রতারণা ব্যর্থ হবে না। কারণ হলো, প্রবঞ্চনা ইহুদীদের ধর্মের অংশ। আমি লাঈছ বিন মোশানের অন্তরঙ্গ বন্ধু। তার একটি কথা তোমাকে শুনাচ্ছি। লোকটি অত্যন্ত বিজ্ঞ। তার কথায় জাদু ভরা। সে তোমাকে কথার দ্বারাই জাদুগ্রস্ত করে দিতে পারে। সে বলে, বছরের পর বছর লেগে যাক, এমনকি কয়েক শতাব্দী লেগে গেলে অবশেষে ইহুদীবাদেরই বিজয় হবে। দুনিয়াতে সফলতা লাভ করলে একমাত্র প্রতারণাই কামিয়াব হবে। মুসলমানরা এখনও সংখ্যায় কম, ফলে তাদের মধ্যে একতা রয়েছে। এই সংখ্যা যখন বৃদ্ধি পাবে ইহুদীরা তখন তাদের মাঝে এমন বিভেদ সৃষ্টি করে দেবে যে, মুসলমানরা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। অথচ তারা ঘুণাক্ষরেও জানবে না যে, এর নাটের গুরু কে। মুহাম্মাদ তাদেরকে এক মঞ্চে রাখতে আর কতদিনই-বা বেঁচে থাকবে।”
খালিদ দাঁড়িয়ে যান। আবু যুরাইযও উঠে দাঁড়ায়। খালিদ দুই হাত সামনে প্রসারিত করে দেন। আবু যুরাইয তার হস্তদ্বয় নিজের হস্তদ্বয়ে পুরে নেয়। করমর্দন করে খালিদ স্বীয় অশ্বে চড়ে বসেন।
“কোথায় যাচ্ছ? তুমি তো বলে গেলে না” বিদায় মুহূর্তে আবু যুরাইয তাঁর গন্তব্য জানতে চেয়ে বলে।
খালিদ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন “মদীনা!”
আবু যুরাইয শক খাওয়ার মত আঁৎকে উঠে জিজ্ঞাসা করে– “মদীনা?” “কি করতে যাচ্ছো সেখানে নিজের শত্রুর কাছে?”
“আমি মুহাম্মাদের জাদু দেখতে যাচ্ছি।” খালিদ তার কথা পূর্ণ করতে না দিয়েই ঘোড়া ছুটিয়ে দেন।
♣♣♣
কিছুদূর অগ্রসর হয়ে খালিদ পেছনে ফিরে দেখেন। আবু যুরাইযের কাফেলা দৃষ্টিগোচর হয় না। তিনি নিম্নভূমি ছেড়ে বেশ দূরে চলে গিয়েছিলেন। ঘোড়ার গতি কমিয়ে দেন। এ সময় আওয়াজ হতে থাকে “মুহাম্মাদ… জাদুকর।… মুহাম্মাদের জাদুতে শক্তি আছে।”
“না… না” তিনি মাথা ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে নিজে বলেন– “মানুষ যেটা বুঝতে সক্ষম হয় না তাকে জাদু বলে চালিয়ে দিতে চায়। আর যার সামনে দাঁড়াতে পারে না তাকে জাদুকর বলে।… তারপরেও… রহস্য অবশ্যই কিছু না কিছু আছেই।… মুহাম্মাদের মধ্যে অলৌকিক কিছু অবশ্যই আছে।”
