“এখন কি ইউহাওয়াকে বাগে আনতে পারবে?” আবু যুরাইয লাঈছকে জিজ্ঞেস করে।
“তাকে বাগে আনতে পারবো বলে আমি এখনও আশাবাদী।” লাঈছ বিন মোশান আবু যুরাইযের প্রত্যুত্তরে জানায়।
“আমাকে তোমার সঙ্গে নিতে কোন অসুবিধা আছে?” আবু যুরাইয জিজ্ঞেস করে এবং বলে– “আমি কৌতূহল নিবৃত্ত করতে চাই। কিছু শিখতে চাই।”
“বার্ধক্য বাধা না হলে যেতে চাইলে যেতে পার।” লাঈছ বিন মোশান বলে, কিছুক্ষণ পরই আমি রওনা হব। এলাকার কিছু লোকও আমার সাথে যাবে।”
♣♣♣
“এই ইবনে ওলীদ!” বৃদ্ধ আবু যুরাইয এ পর্যন্ত এক নিঃশ্বাসে বলে পাশে বসা খালিদের কাঁধে হাত রেখে আবেগজড়িত কণ্ঠে বলে– “আমরা দুই বুড়ো উটে চড়ে ঐ পাহাড়ের দিকে যাত্রা করি, যেখানে একটি নারীর উপস্থিতির কথা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারপর আমরা সংকীর্ণ এক উপত্যকায় প্রবেশ করি। আমাদের পেছনে ছিল ১০/১২ অশ্বারোহী এবং ৩/৪ উষ্ট্ররোহী। উপত্যকায় প্রবেশকালে সবাই তীর সংযোজন করে ধনুক প্রস্তুত করে নেয়। উপত্যকাটি সামনের দিকে গিয়ে প্রশস্ত হয়ে যায়। আমরা ডান দিকে মোড় নিতেই লাশ ভক্ষণরত কয়েকটি শকুন দৃষ্টিগোচর হয়। শকুনদের মাঝ হতে একটি শিয়াল দৌড়ে বের হয়। আমি তার মুখে মানুষের একটি হাত দেখি। আমরা সামনে অগ্রসর হই। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে আরো দুটো শিয়াল বের হয় এবং শকুন দল উড়ে যায়। সেখানে মানুষের হাড় বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। মস্তক ছিল আলাদা লাশের লম্বা চুল এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিল। মস্তকের খুলির সাথেও কিছু চুল ছিল। চেহারার অর্ধেকাংশে তখনও চামড়া ছিল।… লাশটি ছিল ইউহাওয়া। লাঈছ বিন মোশান দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত তার বিক্ষিপ্ত হাড়গোড় এবং অর্ধেক খাওয়া চেহারা দেখতে থাকে। তার চোখ থেকে অশ্রুধারা বেয়ে তার দুধের মত সাদা দাড়িতে আটকে যায়। শেষে আমরা ফিরে আসি।”
২.২ হাল্কা বিদ্রুপের ছোঁয়া
“লাঈছ বিন মোশান এবং ইউহাওয়া যারীদ বিন মুসায়্যিবকে মুহাম্মাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে গড়ে তুলেছিল।” খালিদ কথাটি এমন ভঙ্গিতে বলে যার মধ্যে হাল্কা বিদ্রুপের ছোঁয়াও ছিল– “যারীদ মুসলমানদের হাতে নিহত হয় আর ইউহাওয়ার পরিণাম তো তোমরা তোমাদের চোখেই দেখেছ। এসব থেকে কিছু অনুধাবন করেছ আবু যুরাইয?”
“হ্যাঁ, আমি বুঝেছি।” বৃদ্ধ আবু যুরাইয জবাবে বলে, “লাঈছের জাদু থেকে মুহাম্মাদের জাদু অনেক শক্তিশালী। মানুষ ঠিকই বলে যে, মুহাম্মাদের হাতে জাদু আছে। এই জাদুরই নৈপুণ্য যে, মানুষ দলে দলে তার ধর্ম গ্রহণ করে চলেছে।… আর যাই বল, যারীদের হত্যাই প্রাপ্য ছিল।”
খালিদ বলেন “প্রিয় বন্ধু! ঐ প্রেতাত্মার ঘটনা নিশ্চয় মদীনায় পৌঁছে থাকবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস সেখানে কেউই ভীতু নয়। ভীত হওয়া তো দূরের কথা মুহাম্মাদের অনুসারীরা তাও হয়ত বিশ্বাস করবে না যে, এটা কোন জিন, ভূত বা প্রেতাত্মা।”
“মুহাম্মাদের অনুসারীদের ভয় পাওয়ারই বা কি দরকার।” আবু যুরাইয বলে– “মুহাম্মাদের জাদু মদীনার চতুর্দিকে পরিবেষ্টিত। মুহাম্মাদকে কখনই হত্যা করা যাবে না। সে উহুদ যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হয়েও যথারীতি বেঁচে যায়। তোমাদের এবং আমাদের সম্মিলিত বিশাল বাহিনী মদীনার এক একটি ইট খুলে নিতে গেলে এমন ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয় যে, আমাদের সৈন্যরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যায়। রণাঙ্গনে যেই মুহাম্মাদের সামনে গেছে সেই অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে।… আরো একবার মুহাম্মাদের হত্যা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কথা জান?”
“শুনেছি।” খালিদ বলেন– “পুরোপুরি জানি না।”
“এটা খায়বারের ঘটনা” আবু যুরাইয বলে– “মুসলমানরা খায়বারে ইহুদীদের উপর হামলা করলে তারা মোকাবিলায় একদিনও টিকতে পারিনি।”
‘ধোঁকাবাজ জাতি ময়দানে লড়তে পারে না।” খালিদ বলেন– “ইহুদীরা অসি নয়, মগজ চর্চায় বেশ পটু। তারা আক্রমণ করে পিঠে, বুকে নয়।”
“তারা খায়বারে এমন করে।” আবু যুরাইয বলে– ইহুদীরা যদিও মোকাবিলা করে কিন্তু আগে থেকেই তাদের মধ্যে “মুহাম্মাদ ছিল ত্রাস’। আমি শুনেছি, মুসলমানরা খায়বারে আক্রমণ করতে এলে ইহুদীরা মোকাবিলা করতে নেমে আসে। তাদের অনেকেই মুহাম্মাদকে চিনত। একজন জোরে বলে ওঠে, মুহাম্মাদও এসেছে। পরে অন্যজনও চিৎকার করে বলে, মুহাম্মাদও এসেছে। ইহুদীরা যুদ্ধে নামলেও তাদের মধ্যে ‘মুহাম্মাদ ভীতি’ এত বেশী সঞ্চারিত হয় যে, প্রতিরোধ যুদ্ধে হাতিয়ার কে কার আগে গিয়ে সমর্পণ করবে এই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে।”
আবু যুরাইয খালিদকে খায়বার যুদ্ধের বিবরণ শুনিয়ে এক এক করে ইহুদী নারীর কাহিনীও শুনায়। খায়বার বিজয়ের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং বনী আদীর ভাই আনসারীকে খায়বারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। খায়বার বিজয়ের পর এখানে গণিমতের মাল ভাগ করার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন– “ভবিষ্যৎ উম্মতের দারিদ্রের আশঙ্কা আমার না থাকলে প্রত্যেক বিজিত অঞ্চল মুজাহিদদের মধ্যে ভাগ করে দিতাম। বিজিত অঞ্চল, দেশকে ভবিষ্যৎ উম্মতের জন্য উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাব।”
ইহুদীরা পরাস্ত হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করা আরম্ভ করে এমন কিছু দৃশ্যের অবতারণা করে, যার প্রত্যেকটি প্রমাণ করে যে, মুসলমানদের মহব্বতে ইহুদীদের হৃদয় ভরপুর। খায়বারে অবস্থানকালীন সময় এক ইহুদী মহিলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার গৃহে খানার দাওয়াত দেয়। সে মহিলা এমন আবেগময় ভঙ্গিতে ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রকাশ করে যে, তাকে নিরাশ করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচিত মনে করেননি। তিনি মহিলার বাড়ি যান। তাঁর সাথে বিশর নামে এক সাহাবীও ছিলেন। ইহুদী মহিলা যয়নব বিনতে হারেস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায় এবং তাঁর সামনে খানা পেশ করে মহিলা আস্ত দুম্বা ভুনা করেছিল। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করে, দুম্বার শরীরের কোন অংশ আপনার পছন্দ? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহুর কথা বলেন। এবং মহিলা দুম্বার বাহু কেটে আনে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত বিশর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে এনে রেখে দেয়।
