লোকটি মহিলাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজেকে তার নিচ থেকে বের করে আনে। কিন্তু মহিলা তার লম্বা লম্বা নখগুলো লোকটির পার্শ্বদেশে ঢুকিয়ে দেয়। পরিহিত বস্ত্র ছিন্ন-ভিন্ন করে দেয়। চামড়াও মারাত্মকভাবে ক্ষত করে। আহত লোকটি আরো জানায়, মহিলার চোখ মুখ থেকে আগুনের শিখা বের হওয়ার মত মনে হয়। এ পশুসুলভ আচরণে লোকটি তাকে মানুষরূপী হিংস্র জানোয়ার মনে করে। লোকটির কাছে খঞ্জর ছিল কিন্তু সে খঞ্জর বের করার কথাও ভুলে যায়। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মহিলাটির চুল তার হাতের নাগালে এসে যায়। সে চুল মুঠোতে নিয়ে এমন জোরে ঝাঁকি দেয় যে, মহিলাটি মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যায়। এই সুযোগে লোকটি পড়ি মরি ছুট দেয়। পেছন থেকে ঐ মহিলার চিৎকার তার কানে ভেসে আসতে থাকে। সে ভয়ে পিছন ফিরে তাকায় না; রুদ্ধশ্বাসে সম্মুখ পানে দৌড়াতে থাকে। সে মোটেও বলতে পারে না যে, কিভাবে সে এই লোকালয়ে এসে পৌঁছল। চেহারার ক্ষতের কারণে সে অজ্ঞান হয় না; চরম আতঙ্কেই তার জ্ঞান হারায়।
এর কিছুদিন পর দু’মুসাফির জানায়, তারা রাস্তায় এক ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছে। লাশের অবস্থা বলে, কোন হিংস্র প্রাণীর থাবায় সে মারা গেছে। মুসাফিররা আরো জানায়, মৃতব্যক্তির বস্ত্র ছিন্ন-ভিন্ন এবং সমস্ত শরীরে নখের আঁচর ছিল। মহিলাটি যেখানে থাকত বলে জানা যায় তার ধারে কাছে একটি ছোট্ট বসতি ছিল। সেখানকার বাসিন্দারা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে সেখানে লাঈছ বিন মোশান পৌঁছে যায়। কিভাবে যেন সে জানতে পারে যে, এই অঞ্চলে একটি মহিলা যারীদ, যারীদ বলে ডাকে এবং চিৎকার করে। হাতের কাছে কাউকে পেলে মারাত্মকভাবে আহত করে ছাড়ে।”
আবু যুরাইয অবশিষ্ট কাহিনী এভাবে বর্ণনা করে, প্রেতাত্মা সম্পর্কে তার খুবই কৌতূহল ও আগ্রহ ছিল। লাঈছ বিন মোশানও ছিল তার পরিচিত ব্যক্তি। সে যখন জানতে পারে যে, এই ইহুদী জাদুকর প্রেতাত্মার ঘটনাস্থলে গিয়েছে তখন সেও ঘোড়ায় চড়ে সেখানে যায়। দুতিন এলাকায় জিজ্ঞেস করতে করতে সে ঐ এলাকায় উপস্থিত হয় যেখানে লাঈছ পূর্বেই এসেছিল।
‘আবু যুরাইয!” বুড়ো লাঈছ দাঁড়িয়ে হস্ত প্রসারিত করতে করতে বলে– “তুমি এখানে কি করে এলে?”
“আমি এই সংবাদ শুনে এসেছি যে, তুমি ঐ প্রেতাত্মাকে বাগে আনতে এখানে এসেছ।” আবু যুরাইয বলে– “আমি যা শুনেছি তা-কি সত্য যে, এটা প্রেতাত্মা হোক বা অন্য কিছু হোক দু’তিনজন লোককে মারাত্মক আহত করেছে?”
“সে প্রেতাত্মা নয় দোস্ত” লাঈছ বিন মোশান কথাটি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত আওয়াজে বলে– “সে জিউসের খাঁটি প্রেমিক এক যুবতী। সে নিজের জীবন-যৌবন, সবকিছু ইহুদী স্বার্থে ওয়াকফ করে রেখেছিল। হতভাগীর নাম ইউহাওয়া।”
“আমি মক্কাতে কয়েকবার তাকে দেখেছি।” আবু যুরাইয বলে– “তার কিছু সত্য-মিথ্যা ঘটনাও শুনেছি। এর মধ্যে এটাও রয়েছে যে, সে যারীদ নামক এক কুরাইশকে তোমার কাছে নিয়ে গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যার জন্য তৈরি করেছিল।
আমি এটাও শুনেছি যে, তুমি এবং ইউহাওয়া মুসলমানদের অবরোধ থেকে পালিয়ে গিয়েছিলে আর যারীদ পেছনে থেকে যায়। যদি ইউহাওয়া জীবিত থাকে এবং প্রেতাত্মা না হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে তার এ দুর্গতি কিভাবে হল?
“সে নিজের সবকিছু আল্লাহর নামে ওয়াকফ করে রেখেছিল।” লাঈছ বিন মোশান বলে– “কিন্তু তারপরেও সে একজন মানুষই ছিল। তার দেহে ছিল ভরা যৌবন। সে যৌবনের তুফানের কাছে পরাজিত হয়। যারীদের প্রেম অন্তরে ঠাঁই দেয়। আমার জাদু-মন্ত্রের প্রভাব যারীদের উপর যতটুকু ছিল, ইউহাওয়ার আন্তরিক ভালবাসার প্রভাবও ঠিক ততটুকু ছিল।”
আবু যুরাইয বলে – “বুঝেছি। যারীদ বিন মুসাইয়্যিবের মৃত্যু তাকে পাগলিনী করেছে।… তোমার জাদুবিদ্যা এই নারীর উপর চালানো যায় না?”
লাঈছ বিন মোশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং শূন্য দৃষ্টিতে আবু যুরাইযের দুই স্কন্ধে দু’হাত রেখে ঝুঁকে তাকায় এবং কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে– “আমার জাদু তার কাছে ফেল। সে আমার উপরেও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমার জাদু তখনই কাজ করত যখন আমি তার চোখে চোখ রাখতে পারতাম এবং আমার হাত অল্প সময়ের জন্য হলেও তার মাথার উপর থাকতে পারত।”
“প্রেমবিদ্যা সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি তার আলোকে বলছি।” আবু যুরাইয বলে– সে অনেক আগে থেকেই যারীদের প্রেমে পাগল ছিল। ফলে তোমার কারণে যারীদকে হারিয়ে সে তোমাকে শত্রু মনে করে।”
“হ্যাঁ, আমাকে দুশমন মনে করা তার একমাত্র কারণ হলো, আমি যারীদকে আমাদের সাথে না নিয়ে মুসলমানদের দয়ার উপর ছেড়ে এসেছিলাম।” লাঈছ বিন মোশান বলে, “আমি তাকে সঙ্গে আনতে পারতাম। কিন্তু সে আমার তেলেসমাতির প্রভাবে এতই প্রভাবিত হয় যে, তাকে জোর করে আনতে গেলে আমার কিংবা ইউহাওয়াকে হত্যা করার সম্ভাবনা ছিল। আমি তার মস্তিষ্কে হিংস্রতার এমন প্রভাব চাঙ্গা করে দিয়েছিলাম যে, সে রক্তপাত ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারত না। একটি গাছের প্রতি ইশারা করে যদি বলতাম, এই যে ‘মুহাম্মাদ’, তবুও সে তরবারি দ্বারা ঐ গাছে আক্রমণ করত। তাকে ছেড়ে যাওয়ার পেছনে আমার এই আশা ছিল যে, হয়ত সে কোনভাবে মুহাম্মাদ পর্যন্ত পৌঁছে তাকে হত্যা করতে পারবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সে নিজেই মারা পড়ে।”
