“চিৎকার মরুভূমির কোন শিয়াল কিংবা বাঘেরও তো হতে পারে।” খালিদ মাঝখানে বলে ওঠে।
বাঘ এবং নারীর চিৎকারের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আবু যুরাইয বলে– “লোকজন এটাকে কোন মজলুম নারীর আর্তচিৎকার ভেবেছিল। তারা শেষে এই ভেবে ক্ষান্ত হয়ে যায় যে, হয়ত ডাকাতেরা কোন নারীকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে থাকবে কিংবা সে কোন জালেম স্বামীর স্ত্রী হবে। সফরে যাবার সময় স্বামীর যুলম সইতে না পেরে এমন চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু এই একই চিৎকার পরের রজনীতে আরেক এলাকায় শোনা যায়। সেখানকার কিছু লোকও চিৎকার শুনে ছুটে যায়। কিন্তু তাদের চোখেও কিছু পড়েনি। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় রজনীতেও থেকে থেকে এমনি নারী চিৎকার শোনা যেত এবং রাতের নিস্তব্ধতার মধ্যে এক সময় হারিয়ে যেত।…
তারপর পহাড়ী লোকেরা আরো জানায় যে, পরে আর্তচিৎকারের সাথে সাথে নারীর এ করুণ ডাকও ভেসে আসতে থাকে– “যারীদ তুমি কোথায়? এসো প্রিয়তম আমি তোমার অপেক্ষায়।” সেখানকার লোকেরা যারীদ নামে কাউকে চিনত না। এলাকার প্রধান লোকদের মন্তব্য যে, এটা কোন পুরুষের প্রেতাত্মা হবে, যা নারীরূপে চিৎকার করে ফিরছে।”
আবু যুরাইযের বলার ভঙ্গিতে দারুণ আকর্ষণ ছিল। যে কাউকেই সহজেই প্রভাবিত করত। কিন্তু খালিদের চেহারাতে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না।
“লোকজন ঐ রাস্তায় চলাচল করা ছেড়ে দিয়েছে যেখানে এই চিৎকার শোনা যেত।” আবু যুরাইয বলে, “একদিন এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। দীর্ঘ ভ্রমণরত দুই ঘোড়-সওয়ার দ্রুত অশ্ব ছুটিয়ে এক লোকালয়ে পৌঁছে। ঘোড়ার শরীর থেকে এমনভাবে ঘাম বের হয়, যেন সদ্য পানি হতে উঠে এল। অশ্বারোহীদ্বয় ভীত-সন্ত্রস্ত এবং ঠকঠক করে কাঁপছিল। তারা স্বাভাবিক হয়ে জানায়, এক উপত্যকার মধ্য দিয়ে গমনকালে তারা এক নারী কণ্ঠের এ আর্তনাদ শুনে– “যারীদ! দাঁড়াও! আমি আসছি।” আওয়াজ যেদিক থেকে আসে অশ্বারোহীদ্বয় সেদিকে তাকায়। একটি পর্বত-চূড়ায় এক মহিলা দাড়িয়ে তাদের লক্ষ্য করে এভাবে বলছিল। দূর থেকে তাকে যুবতীই মনে হয়। সে পর্বত থেকে তাদের উদ্দেশে নিচে অবতরণ করতে থাকলে অশ্বারোহীয় ভয়ে ঘোড়া উর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়ে দেয়।…
“সম্মুখের মরুপ্রান্তরটি বাক খাওয়া ছিল। অশ্বারোহীদ্বয় মরুচক্রের শিকার হয়। তিন-চার বার একই স্থানে চক্কর দিতে থাকে। ভয়ে তারা খেই হারিয়ে ফেলেছিল। এক মরুবাঁক পার হয়ে তাদের সম্মুখে ত্রিশ-চল্লিশ কদম দূরে এক যুবতী মহিলাকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। মহিলাটি সম্পূর্ণ উলঙ্গ এবং মাথার চুল ছিল এলোমেলো। রক্তশূন্যতার কারণে লাশের ন্যায় ফ্যাকাশে সাদা ছিল তার চেহারা। অশ্বারোহীদ্বয় থমকে দাঁড়ায়। মহিলাটি দু’হাত প্রসারিত করে সামনের দিকে দৌড় দেয় এবং বলে– “দীর্ঘদিন যাবত আমি তোমাদের দু’জনের অপেক্ষায় ছিলাম।” অশ্বারোহীদ্বয় তার এ কথা শুনে ঘোড়া ঘুরিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে পালিয়ে যায়। বুড়ো আবু যুরাইয এ পর্যন্ত বলে চুপ করে থাকে এবং খালিদের প্রতিক্রিয়া বুঝতে চেষ্টা করে। খালিদকে আনমনা দেখে সে তার হাত খালিদের রানের উপর রেখে বলে– “আমি দেখেছি তোমার কাছে কোন খাদ্য দ্রব্য নেই। তুমি চাইলে এখান থেকে প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ ও বিশ্রাম নিতে পার। আর কবে তোমার দেখা পাব, কে জানে। তোমার পিতা ওলীদ ব্যক্তিত্বশালী লোক ছিল। বলতে গেলে আমার হাতেই তোমার জন্ম। আমি তোমার আপ্যায়ন করতে চাই। অশ্ব থামিয়ে নিচে নেমে আস।
অতঃপর কাফেলাটি সেখানেই থেমে যায়।
♣♣♣
“ঐ নারীরূপটি কোন পুরুষ কিংবা মহিলার প্রেতাত্মাই হবে।” আবু যুরাইয খালিদের সামনে ভুনা গোশত পেশ করতে করতে বলে– “খাও, ওলীদের বেটা… এরপর আরেক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে। একটি এলাকায় এক অপরিচিত ব্যক্তি এমন অবস্থায় এসে ধপাস করে পড়ে যে, তার মুখমণ্ডলে ক্ষতের দীর্ঘ রেখা ছিল। ক্ষতস্থান থেকে তখনও রক্ত পড়ছিল। তার পরিহিত বস্ত্র ছিল ছিন্ন ভিন্ন দেহের অন্যান্য স্থানেও আঘাতের চিহ্ন ছিল। লোকটি ধপাস করে পড়েই অজ্ঞান হয়ে যায়। আশে-পাশের লোকজন তার ক্ষত স্থান ধুয়ে দেয় এবং চোখ-মুখে পানির ঝাপটা দেয়। কিছুক্ষণ পরে লোকটির জ্ঞান ফিরলে সে জানায়, সে দু’টি মরু পর্বতের মাঝ বরাবর পথ ধরে আসছিল। হঠাৎ এক পর্বতের উপর থেকে এক নারী চিৎকার করতে করতে এত দ্রুত নেমে আসে, যা কোন সাধারণ নারীর পক্ষে সম্ভব নয়।…
লোকটি এমনভাবে থমকে দাঁড়ায় যেন এক ভীষণ আতঙ্ক তার দেহের সকল শক্তি কেড়ে নিয়েছে। মহিলাটি এত দ্রুত আসে যে, নিজেকে সামলাতে না পেরে ঐ লোকটির সাথে ধাক্কা খায় এবং চিৎকার দিয়ে বলে– “তুমি এসে গেছ যারীদ। আমি জানতাম তুমি জীবিত। এসো এসো…।
‘লোকটি তাকে বলে, সে যারীদ নয়। কিন্তু মহিলা তার কথায় পাত্তা না দিয়ে তার হাত বাহুবন্ধ করে দস্তরমত টানতে শুরু করে এবং বলে– “তুমি যারীদ। আমার যারীদ।” লোকটি তার বাহুবন্ধন হতে মুক্তির জন্য তাকে ধাক্কা মারে। মহিলা পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। লোকটি তাকে কোন পাগলিনী ভেবে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। এবার মহিলাটি তার দিকে এমনভাবে আসে যে, তার দাঁত বাঘের মত বাইরে বের করা ছিল এবং সে হাত এমনভাবে সম্মুখে মেলে রাখে যে, তার আঙ্গুলগুলো হিংস্র প্রাণীর পাঞ্জার মত বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। লোকটি মহিলাটির এ রূপে ভয় পেয়ে পিছু হটতে থাকে। হঠাৎ এক পাথরে হোঁচট খেয়ে মাটির দিকে পিঠ করে চিত হয়ে পড়ে যায়। মহিলাটি তাকে উঠার সুযোগ না দিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বাঘ যেমন শিকারকে পাঞ্জার মধ্যে নিয়ে যায় তেমনি সেও তার পাঞ্জা ঐ লোকটির চেহারার উপর রেখে নখ দিয়ে নির্দয়ভাবে শক্ত আঁচড় কেটে দেয়।…
