“হ্যাঁ।” খালিদ মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলেন– “শুনেছি। বড় লজ্জা করে যখন শুনি যারীদ আমার গোত্রের লোক ছিল। এখন সে কোথায়? এক বছরেরও বেশি হয়ে গেল তার কোন খোঁজ নেই। শুনেছি ইউহাওয়া তাকে সাথে করে ইহুদী জাদুকর লাঈছ বিন মোশানের নিকট নিয়ে গিয়েছিল। মোশান মুহাম্মাদকে হত্যার জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে গড়ে তোলে। কিন্তু মুসলমানদের তরবারির সামনে লাঈছের জাদু অসহায় হয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনী খন্দক হতে ফিরে সোজা বনু কুরাইযার বসতি অবরোধ করার সময় লাঈছ, ইউহাওয়া ও যারীদ সেখানে ছিল। কা’ব বিন আসাদের সহযোগিতায় এ তিনজন জানালা-পথে সরে পড়তে সক্ষম হয়। এরপরে আর কি হলো জানি না।” “জানালা-পথে তিনজন বের হলেও দু’জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।”
আবু যুরাইয পরবর্তী ঘটনা জানায়– “যারীদের মধ্যে লাঈছের জাদুর আছর হঠাৎ চাঙ্গা হয়ে উঠলে যারীদ তাদের সাথে পালিয়ে যেতে অস্বীকার করে। বাধ্য হয়ে ইউহাওয়া এবং লাঈছ তাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। ঠিক এ মুহূর্তে তারা অবরোধকারী একদল মুসলিম সৈন্যের নজরে পড়ে যায়। সৈন্যরা তাদের থামতে বললে ইউহাওয়া ও লাঈছ প্রাণ বাঁচাতে যারীদকে রেখেই পালিয়ে যায়। জাদুর প্রভাবে যারীদের হিতাহিত জ্ঞান ছিল না। সে মুসলিম সৈন্যর আওয়াজ পেয়ে তরবারি কোষমুক্ত করে সৈন্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যারীদ যেতে থাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম ধরে ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি ও তাকে হত্যার কথা ব্যক্ত করে। এতে অবরোধকারী সৈন্যরা তীর ছুঁড়লে সে তীরের আঘাতেই যারীদ মারা যায়। একটু থেমে আবু যুরাইয আবার বলে– “লাঈছ এবং ইউহাওয়া জীবন নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও এখন তাদের মধ্যে মাত্র একজন বেঁচে আছে। আর সে হল লাঈছ। শুধু লাঈছ বিন মোশানই বেঁচে আছে।”
“আর ইউহাওয়া?” খালিদ গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চান– “তার কি হল? সে এখন কোথায়?”
“সে এখন প্রেতাত্মায় পরিণত।” আবু যুরাইয বলে– “সে এক দীর্ঘ কাহিনী, হৃদয়বিদারক ঘটনা। তুমি শুনতে চাইলে খুলে বলতে পারি। ইউহাওয়াকে তুমি ভাল করেই চেন। সে মক্কাতেই বাস করত। যদি বল যে, তাকে দেখে তোমার অন্তরে কখনো আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি এবং তোমার মধ্যে উষ্ণ শিহরণ জাগত না তাহলে আমি বলব, তুমি মিথ্যা বলছ। খালিদ! তোমাকে কেউ জানায়নি, কেন গাতফান কুরাইশদের পাশে গিয়ে দাঁড়াল? অন্যান্য গোত্রের সরদাররাও কিভাবে আবু সুফিয়ানকে শীর্ষ নেতা হিসেবে মেনে নিল? এটা ইউহাওয়া এবং তার মত আরো চারজন ইহুদী নারীর জাদু ছিল। তাদের জাদুবলেই ‘অসম্ভব’ সম্ভবে পরিণত হয়েছিল।
ঘোড়া এবং উটগুলো যাচ্ছিল নিজস্ব গতিতে। উটের গলায় ঝুলানো ঘন্টা আবু যুরাইযের বাক-ভঙ্গির সাথে তাল মিলিয়ে মুগ্ধকর মিউজিক সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। খালিদ গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল প্রতিটি শব্দ।
যারীদ বিন নুসাইয়্যিব ইউহাওয়ার প্রেমডোরে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর যুরাইয ইউহাওয়ার ঘটনা বলতে শুরু করে– “তুমি জান না ইবনে ওলীদ। ইউহাওয়া যারীদকে নিজের জাদুতে বন্দি করে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিল। আমি লাঈছ বিন মোশানকে চিনি। যুবক বয়সে আমাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ও সখ্যতা ছিল। জাদুগিরি এবং নজরবন্দি তার পিতার বিশেষ জ্ঞান ছিল। পিতাই তাকে এই বিদ্যা উত্তরাধিকার সূত্রে দান করে যায়। তুমি আমার কথা শুনছ তো ওলীদের পুত্র না কি বিরক্ত হচ্ছ? কথা বলা ছাড়া এখন আমার কিছুই করার শক্তি নেই।”
খালিদ হেসে উঠে বলেন– “শুনছি আবু যুরাইয! মনোযোগ দিয়ে শুনছি।”
“এটা তো তুমি জান যে, মুসলমানদের পরিখা এবং ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের সৈন্যরা মদীনার অবরোধ তুলে নিয়ে পিছু হঁটতে বাধ্য হওয়ার পর যখন মুহাম্মাদ কালবিলম্ব না করে বনু কুরাইযার কেল্লা অবরোধ করে।” আবু যুরাইয গোড়া হতে আরম্ভ করে– “তখন লাঈছ বিন মোশান, ইউহাওয়া এবং যারীদ কেল্লার মধ্যে ছিল। অবরোধের কথা জানতে পেরে তারা সুড়ঙ্গ পথে বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু পথিমধ্যে জনৈক মুসলিম সৈন্যের চোখে পড়ে যাওয়ায় নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে তারা যারীদকে ফেলে রেখেই পালিয়ে যায়।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আবু যুরাইয!” খালিদ বলেন– “এ ঘটনাও আমার জানা আছে যে, অবরোধের পর মুসলমানরা বনু কুরাইযার পুরুষদের হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদের সাথে নিয়ে যায়।”
“আমার কথা শুনতে শুনতে তুমি বিরক্ত হচ্ছ তাই না?” আবু যুরাইয হাসতে হাসতে বলে– “তুমি আমার সব কথা শুনছ না।”
খালিদ বলেন– “ঘটনা সেখান থেকে শুনাও যেখান থেকে আমি ইতোপূর্বে শুনিনি। আমি এ পর্যন্ত জানি যে, বুড়ো জাদুকরের যাদুর প্রভাবে যারীদ অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় এক মুসলিম সৈন্যের বাণাঘাতে মারা যায় এবং লাঈছ ইউহাওয়াকে সাথে নিয়ে পালিয়ে যায়।”
আবু যুরাইয বলে যায়। এর পরের ঘটনা হলো উহুদ পাহাড়ের মধ্যবর্তী যে বসতি আছে তারা এক রাতে কোন মহিলার চিৎকার শুনতে পায়। তৎক্ষণাৎ বাহাদুর প্রকৃতির তিন-চারজন লোক ঘোড়ায় চেপে তরবারি-বর্শা নিয়ে দ্রুত ছুটে আসে। কিন্তু বহু খোঁজাখুঁজির পরও কোন নারীর দেখা তারা পায়নি এবং চিৎকারও থেমে যায়। তারা এদিক-ওদিক ঘুরে-ফিরে চলে আসে।”
