♣♣♣
দীর্ঘ এক বছর পর খালিদ এখন মদীনার পথে। নিজের বিশ্রাম এবং ঘোড়াকে যথা সময়ে পানি পান করিয়ে চলছিলেন। ঘোড়াকে ক্লান্ত হতে দেন না। মক্কা থেকেই ঘোড়া স্বাচ্ছন্দে পথ পাড়ি দিয়ে আসে। খালিদ ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক। তার দেমাগে ইচ্ছা বেশি উদয় হত। দেমাগের উপর সর্বদা তার কড়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু মদীনার পথে এসে দেমাগ তার উপর সওয়ার হয়ে যায়। স্মৃতির থাবা সামুদ্রিক তুফানের মধ্যে চলন্ত জাহাজের ন্যায় তার অভ্যন্তরে উত্থান-পতন ঘটাতে থাকে। ভারসাম্যহীনের মত তার অবস্থা কখনো এমন হত যে, তিনি খুব তাড়াতাড়ি মদীনায় যেতে চাইছেন। আবার কখনো চলার গতি বলে দিত যে, তার তাড়াতাড়ি যাওয়ার মোটেও তাড়াহুড়া নেই। তার চোখে দূরের বাড়ি-ঘরগুলো মরীচিকা মনে হয়। চলার সময় এগুলো ক্রমে দূরে সরে যেতে থাকে।
আরোহী মাথা ঝাঁকি দিয়ে আশেপাশে দেখে নেন। তার ঘোড়া একটু উঁচু জায়গা পার হচ্ছিল। দিগন্ত থেকে উহুদের পর্বতগুলো ইতোমধ্যে আরো উপরে উঠে আসে। খালিদের জানা ছিল একটু পরেই এই পাহাড়সমূহের গা ঘেঁষে মদীনার শহর ভেসে উঠতে থাকবে।
এ সময় স্মৃতি আরেকবার তাকে পশ্চাতে নিয়ে যায়। মদীনার পরিখা এবং তা হতে পশ্চাদপসারণের কথা স্মরণ হয়। পাশাপাশি মুসলমানদের হাতে ৪০০ ইহুদীর হত্যার দৃশ্যও তার চোখে ভেসে উঠে। বনু কুরাইযার এই মর্মান্তিক সংবাদে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান বেজায় খুশি হলেও খালিদ খুশিও হননি আবার দুঃখও প্রকাশ করেননি।
“ইহুদীদের প্রতারণার উপর নির্ভর করে কুরাইশরা মুহাম্মাদের অনুসারীদের পরাস্ত করতে চায়।” খালিদের মাথায় এই একটি কথা বারবার উদয় হতে থাকে। তিনি চিন্তা থেকে এই কথাটি ঝেড়ে-মুছে ফেলতে সমস্ত মাথায় হাত বুলান।
স্মৃতির চাকা খালিদকে অতীত থেকে দূর অতীতে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ঘণ্টার টুনটুন শব্দ তাকে অতীত থেকে বের করে নিয়ে আসে। তিনি শব্দের উৎস খুঁজতে থাকেন। বামে বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি ছিল। তিনি চলছিলেন উপর দিয়ে। বামের নিম্নপ্রান্তে গিয়ে তার চোখ স্থির হয়ে যায়। চারটি উট নিম্নপ্রান্ত দিয়ে এগিয়ে আসতে দেখেন। উটগুলো চলছিল একের পর এক, লাইন দিয়ে। উটগুলোর পাশে একটি ঘোড়াও চলছিল। উটে দুজন নারী, কতক শিশু এবং দু’জন পুরুষ ছিল। কোন উটে আসবাবপত্রও ছিল। ঘোড়ার আরোহী ছিল এক অশীতিপর বৃদ্ধ। তাদের চলায় যথেষ্ট গতি ছিল। খালিদ ঘোড়ার গতি একটু কমিয়ে দিলেন।
উট-ঘোড়া সমৃদ্ধ ছোট কাফেলাটি খালিদের কাছে এসে পড়ে। বৃদ্ধ অশ্বারোহী তাকে চিনে ফেলে।
“তোমার সফর শুভ হোক ওলীদের পুত্র!” বৃদ্ধ হস্তদ্বয় প্রসারিত করে দোলায় এবং বলে– “নিচে এস, কিছুদুর এক সাথে যাই।”
খালিদ লাগাম ধরে টান দেন এবং হালকাভাবে ঘোড়ায় পদাঘাত করেন। প্রশিক্ষিত ঘোড়া প্রভুর ইশারা পেয়ে চোখের পলকে নিচে নেমে আসে।
খালিদ নিজের ঘোড়াটি বৃদ্ধের ঘোড়ার পাশে নিয়ে গিয়ে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন– “আবু যুরাইয!… আমার অনুমান এরা তোমার পরিবার-পরিজন।”
বৃদ্ধ আবু যুরাইয বলে– “হ্যাঁ ঠিকই ধরেছ, এরা আমার পরিবারের লোক।… তা খালিদ তুমি কোথায় যাচ্ছ? আমার বিশ্বাস, নিশ্চয় মদীনায় নয়।… সেখানে তোমার কি দরকার?”
কাফেলাটি ছিল গাতফান গোত্রের। তারা বসতি স্থানান্তর করছিল। আবু যুরাইয নিজেই যখন বলে যে, খালিদ মদীনায় যাচ্ছে না তখন তিনি তার গন্তব্য না জানানোই ভাল মনে করেন।
কুরাইশদের বর্তমান ভাবনা কী?” আবু যুরাইয জানতে চায়। এ খবর কি সত্য নয় যে, মানুষ দলে দলে মুহাম্মাদকে নবী বলে স্বীকার করে নিচ্ছে? এ ধারা চলতে থাকলে সেদিন কি অতি নিকটে নয় যে, মদীনাবাসী একদিন মক্কার উপর চড়াও হবে আর আবু সুফিয়ান তাদের সামনে সারেন্ডার করবে?”
“যে নেতা নিজের পরাজয়ের বদলা গ্রহণ করা জরুরী মনে করে না, হাতিয়ার সমর্পণ করাটা তার নিকট কিছুই নয়।” খালিদ বলেন– “তোমার মনে নেই, আমরা সম্মিলিতভাবে মদীনা আক্রমণ করতে গেলে মদীনাবাসী আক্রমণ এড়াতে চতুর্দিকে পরিখা খনন করেছিল?” কিছুক্ষণ থেমে খালিদ আবার বলেন– “আমরা ইচ্ছা করলে পরিখা অতিক্রম করতে পারতাম। আমি অতিক্রম করেছিলামও। ইকরামাও ওপারে গিয়েছিল। কিন্তু আমাদের সৈন্যরা-যাদের মধ্যে তোমার গোত্রের সৈন্যরাও ছিল– আমাদের সহযোগিতা করেনি, দূরে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতে থাকে। দুঃখের কথা আর কি বলব, মদীনা থেকে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি পশ্চাদপসারণ করে, সে লোকটি ছিল আমাদের সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু সুফিয়ান।”
“আমার বাহুতে এখন আর বল নেই ইবনে ওলীদ” আবু যুরাইয দুর্বলতার কারণে কম্পমান একটি হাত খালিদের সম্মুখে তুলে ধরে বলে– “শরীরে একটু শক্তি থাকলেও আমি সে যুদ্ধে নিজ গোত্রের সাথে থাকতাম।… যেদিন আমার গোত্র মদীনা থেকে পশ্চাদপসারণ করে ফিরে আসে সেদিন আমি কেঁদেছিলাম।… যদি কা’ব বিন আসাদ গাদ্দারী না করত এবং মদীনায় তিন-চারটি গেরিলা আক্রমণ চালাত তাহলে বিজয় নিশ্চিত আমাদেরই হত।”
খালিদ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন তিনি আবু যুরাইযের প্রতি ক্রোধের দৃষ্টিতে তাকান এবং চুপ থাকেন।
“ইউহাওয়া নাম্নী এক ইহুদী নারী যারীদ বিন মুসাইয়্যিব নামক তোমার গোত্রের এক ব্যক্তিকে মুহাম্মাদকে হত্যা করার উদ্দেশে প্রস্তুত করার ঘটনা তুমি শুনেছ?” আবু যুরাইয জিজ্ঞেস করে।
