হযরত সা’দ বিন মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁবুতে শুয়ে পড়েন। কিন্তু কেন যেন ঘুম আসছিলনা। তিনি উঠে বসেন। আল্লাহর কাছে দু’আ করেন, হে আল্লাহ্ বড় সাধ ছিল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যারা সত্য নবী বলে মানে না তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জীবন উৎসর্গ করা। আপাতত লড়াই শেষ হওয়াতে আমার সাধ আর পূরণ হল না। তিনি আল্লাহর দরবারে বড় অনুনয়-বিনয় করে দুআ করেন, অল্পদিনের মধ্যে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে পর্যন্ত আমার হায়াত বৃদ্ধি করে দাও। আর যদি যুদ্ধের ধারাবাহিকতা আপাতত বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আমার ক্ষত ভাল করে দাও, যাতে আমার জীবন তোমার পথে উৎসর্গ হয়।
হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দুআ অন্তত চারজন লোকে শুনেন। কিন্তু তারা এটাকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ভোরে দেখা যায় হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তাঁবু থেকে রক্তের ধারা গড়িয়ে আসছে। তাঁবুতে প্রবেশ করে জানা যায় তিনি শহীদ হয়ে গেছেন। হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর দরবারে শাহাদাত কামনা করেছিলেন। আল্লাহ তার দুআ কবুল করেছেন। তার প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতের ব্যাণ্ডেজ খুলে যায়। আর তা হতে প্রচুর পরিমাণে রক্তক্ষরণের ফলে রক্তশূন্য হয়ে তিনি চির কাঙ্ক্ষিত শাহাদাত লাভে ধন্য হন।
বনু কুরাইযার পরিণতির খবর মক্কায় পৌঁছলে সবচেয়ে বেশি খুশী হয় আবু সুফিয়ান।
“আল্লাহর কসম! বনু কুরাইযার নেতা কা’ব বিন আসাদ আমাদের সাথে যে গাদ্দারী করেছিল তার উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে।” আবু সুফিয়ান আনন্দে বলে– “তারা যদি গাদ্দারী না করে রাতের অন্ধকারে মদীনায় গেরিলা আক্রমণ অব্যাহত রাখত, তাহলে আমাদেরই বিজয় নিশ্চিত হত। সহযোগিতার পুরস্কার হিসেবে মৃত্যু নয়, গণিমতের মাল দিতাম। খালিদ তুমি কি বল। বনু কুরাইযার পরিণতি কি বড়ই দুর্ভাগ্যজনক হয়নি?”
খালিদ আবু সুফিয়ানের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন আবু সুফিয়ানের কথা তার মনঃপূত হয়নি।
“বনু কুরাইযার এই পরিণতিতে তুমি কি খুশি নও খালিদ?” আবু সুফিয়ান তাঁর চাহনি দেখে প্রশ্ন করে।
“মদীনা থেকে পশ্চাদপসারণের বেদনা এতই গভীর যে, যত বড়ই সুসংবাদ হোক না কেন আমার বেদনা প্রশমিত করতে পারবে না।” খালিদ বলেন– “গাদ্দারের বন্ধুত্ব শত্রুতার চেয়েও ভয়ঙ্কর। বলতে পার, ইহুদীরা এ পর্যন্ত কার সাথে অঙ্গীকার ঠিক রেখেছে? ইহুদীবাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যারা নিজ কন্যাকে অন্য জাতির পুরুষদের শয্যাসঙ্গী করতে কুণ্ঠাবোধ করে না তাদের মত নীচ জাতিকে কখনো বিশ্বাস করা যায় না।”
“মুসলমান নয়, প্রবল ঝড়ই অবরোধ উঠিয়ে নিতে আমাদের বাধ্য করেছিল।” আবু সুফিয়ান বলে– “তাছাড়া খাদ্য সংকটও ছিল আমাদের।”
হযরত খালিদ গোস্বা ভরে একথা বলেন– “যুদ্ধের মানসিকতাই তোমার ছিল না।”
এরপর থেকে খালিদ অধিকাংশ সময় চুপচাপ থাকতেন। কেউ কথা বলতে চাপাচাপি করলে রেগে যেতেন। তার এই নীরবতাকে ঝড়ের পূর্বাভাস ভেবে আবু সুফিয়ান ভিতরে ভিতরে আতংকগ্রস্থ হয়ে ওঠে। খালিদ তাকে ভীতু-কাপুরুষ বলতেন। তিনি মনে মনে ওয়াদা করেছিলেন, যে করেই হউক মুসলমানদেরকে পরাজিত করবেনই। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে যখন মুসলিম বাহিনীর অপূর্ব রণকৌশল এবং বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার কথা মনে পড়ত তখন মনে মনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাজারো ধন্যবাদ দিতেন। এমন যুদ্ধ-স্পৃহা এবং সমর-কুশলতা ও প্রজ্ঞা কুরাইশদের মধ্যে ছিলনা। এ জাতীয় প্রজ্ঞা ও মেধা খালিদের মধ্যে ছিল। কিন্তু তিনি নিজ গোত্র থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পান না।
আজ মদীনার দিকে একাকী যাবার কালে খালিদের খন্দক রণাঙ্গন হতে সেই পশ্চাদপসারণের কথা স্মরণ হয়। মদীনায় আরেকটি আক্রমণ করার বড় ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু কুরাইশরা মোটেও সম্মত হয় না। তারা মদীনার নাম শুনলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেত।
একদিন তিনি জানতে পারলেন যে, মুসলমানরা মক্কা আক্রমণ করতে আসছে। আবু সুফিয়ানই তাকে এ সংবাদ জানায়।
“মক্কা আক্রমণ করতে মুসলমানদের দুঃসাহস শুধু এ কারণে হয় যে, আমরা বারবার প্রমাণ করেছি যে, কুরাইশরা মুহাম্মাদকে সত্যিকার অর্থেই ভয় পায়।” খালিদ আবু সুফিয়ানকে বলেন– “তুমি জনগণকে কখনো জানিয়েছ যে, মুসলমানরা মক্কা আক্রমণ করতে পারে? তারা এই হামলা প্রতিহত করতে প্রস্তুত আছে?”
আবু সুফিয়ান বলে– “এখন এটা বিশ্লেষণের সময় নেই যে, আমরা অতীতে কি করেছি আর কি করিনি। আমার গোয়েন্দারা জানিয়েছে যে, মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। তুমি এ বিষয়ে একটু চিন্তা করবে কি?”
“আমার চিন্তা করা হয়ে গেছে।” হযরত খালিদ বলেন– “আমাকে তিনশ অশ্বারোহী দাও। আমি পথেই মুসলিম বাহিনীর গতিরোধ করব। ‘কারাউল গামীম’ পাহাড়ের খাদে খাদে আমরা ওঁৎ পেতে বসে থাকব। তারা এ উপত্যকা হয়েই আসবে। আমি তাদেরকে এই পাহাড়ি ভূমিতে ধুঁকে ধুঁকে মারব।”
যত লাগে অশ্বারোহী নিয়ে যাও।” আবু সুফিয়ান তার আবেদনে সাড়া দিয়ে বলে– “এবং এখনই রওনা হয়ে যাও। এমন যেন না হয়, তোমরা সেখানে পৌঁছার আগেই তারা সে স্থান পেরিয়ে চলে আসে।
খালিদের পরিষ্কার মনে পড়ে, মুসলমান কর্তৃক মক্কার উপর আক্রমণ করতে রওনা হবার সংবাদ তার দেহে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল। তিনি ঐ দিনেই তিনশ অশ্বারোহী সমন্বয়ে এক শক্তিশালী বাহিনী গঠন করে ফেলেন। মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৪০০ শত। অধিকাংশই পদাতিক। তিনশ অশ্বারোহীর নেতৃত্ব নিজের হাতে থাকায় খালিদ খুব উৎফুল্ল ও হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন এবার তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ কারো অধীনস্থ নন। যে কোন মুহূর্তে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্ণ অধিকার তার রয়েছে। মুসলমানদেরকে চুড়ান্তভাবে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।
