কা’ব পরাজয়ের সুরে বলে– “অস্বীকার করি না। কিন্তু আবু সুফিয়ান আমার মাধ্যমে যে অপরাধ করাতে চেয়েছেন তা আমি করিনি।”
এজন্য করোনি যে, তুমি তার নিকট জামানত হিসেবে নেতৃপর্যায়ের লোক দাবি করেছিলে।” হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “এর পূর্বে তুমি তাকে আশ্বস্ত করেছিলে যে, মদীনায় যেখানে মহিলা ও শিশুরা ছিল সেখানে তোমার গোত্র রাতের অন্ধকারে গেরিলা হামলা চালাবে। একজন গোয়েন্দাও তুমি প্রেরণ করেছিলে পাপিষ্ঠ নরাধম! তুমি ভুলে গিয়েছিলে যে, এক মুসলিম নারীও যদি সতর্ক থাকে তাহলে সে ইহুদীবাদের জঘন্য কারসাজি মাত্র একটি লাঠির দ্বারা ব্যর্থ করে দিতে পারে।”
“জানি, নু’আইম বিন মাসউদ তোমাদের এ তথ্য প্রদান করেছে যে, আমি তোমাদের সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছি।” কা’ব বিন আসাদ পরাজয়ের ভঙ্গিতে বলে– “যা শুনেছ সবই সত্য। তবে আমি যা কিছু করেছি কেবল আমার গোত্রের নিরাপত্তার জন্যই করেছি।”
“ভাল কথা, এখন গোত্রের শাস্তি নিজেই নির্ধারণ কর।” হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “তোমার জানা আছে, চুক্তিভঙ্গকারী গোত্রকে কেমন ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। তুমি নিজে কোন শাস্তি নির্ধারণ না করলেও তুমি অবগত আছ যে, তোমার গোত্রের পরিণাম কি হবে? বনু কায়নুকা এবং বনু নযীরের পরিণতির কথা ভুলে গেছ? আল্লাহর কসম! তোমার গোত্রের পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ।”
কা’ব বিন আসাদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে– “হ্যাঁ, সা’দ, আমি জানি, আমার গোত্রের পরিণতি কি হবে! আমাদের শিশু এবং মহিলারাও শেষ হয়ে যাবে। আমার সিদ্ধান্ত, চুক্তি মোতাবেক আমার গোত্রের সকল পুরুষকে হত্যা করে ফেল মহিলা এবং বাচ্চাদেরকে তোমাদের সাথে নিয়ে যাও। আমরা মারা গেলেও তারা তো জীবিত থাকবে।”
“শুধু জীবিতই থাকবে না।” হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “তারা আল্লাহর সত্য নবীর অনুসারী হয়ে সম্মানের সাথে জীবন যাপন করবে।… পুরুষদের বাইরে বের করে দাও।”
♣♣♣
হযরত সা’দ বিন মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখান থেকে ফিরে আসেন।
তিনি ফিরে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন– “হে আল্লাহর রাসূল! বনু কুরাইযা নিজেরাই শাস্তি বেছে নিয়েছে। যুদ্ধ-সক্ষম পুরুষদের হত্যা করা হবে। আর নারী ও শিশুদেরকে আমাদের দায়িত্বে নিয়ে যেতে হবে।”
বনূ কুরাইযার পুরুষদের সকলে কেল্লা ছেড়ে বাইরে আসতে থাকে। কড়া অবরোধের জন্য কারো পালিয়ে যাবার সুযোগ ছিল না। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, ইহুদীদের ইতিহাস নৈরাশ্য, আর চুক্তি লঙ্ঘনের ইতিহাস। তাদের মানবেতিহাস এ সমস্ত অমোছনীয় কলঙ্কে ভরা। এ জন্য বিশ্বে তারা ‘আল্লাহর তিরস্কৃত’ জাতি হিসেবে পরিচিত। তাদেরকে যেই সম্মান প্রদর্শন করেছে, তারা তাকে চির লাঞ্ছিত করে ছেড়েছে। বনু কুরাইযাকে যদি ক্ষমা করে দেয়া হত তা হলে তা হত সাংঘাতিক বোকামির কাজ। মুসলমানরা জেনে-শুনে এ পথে পা বাড়ায় না। তারা যুদ্ধে সক্ষম সকল পুরুষকে হত্যা করে। আর বৃদ্ধ, নারী ও শিশুদেরকে নিজেদের অভিভাবকত্বে নিয়ে নেয়।
দু’জন ঐতিহাসিক লিখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযায় সৈন্য প্রেরণ করলে ইহুদীরা প্রবলভাবে সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। মুসলমানরা দীর্ঘ পঁচিশ দিন যাবৎ তাদের অবরোধ করে রাখে। পরিশেষে ইহুদীরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এই আবেদন করে যে, যেন হযরত সা’দ বিন মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের অনুরোধে সাড়া দেন এবং এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আসেন যে, বনূ কুরাইযার যুদ্ধ সক্ষম পুরুষদের হত্যা করা হবে। এবং নারী ও শিশুরা গণিমত হিসেবে বিবেচিত হবে। সমঝোতা অনুযায়ী চারশ ইহুদীকে কতল করা হয়।
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, মুসলমানদের সাথে বনু কুরাইযার সংঘর্ষ হয়নি। অবরোধের এক পর্যায়ে তারা তাদের অপরাধের শাস্তি মাথা পেতে নিতে কেল্লা ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
মদীনায় ইহুদীদের গণহত্যার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ইতোপূর্বে এমন ঘটনা আরো দু’বার ঘটেছে। বনু কায়নুকা এবং বনু নযীর নামক ইহুদীদের অপর দু’টি গোত্র চুক্তি ভঙ্গ করায় ইতোপূর্বে মুসলমানরা তাদেরকে এমনই শাস্তি দিয়েছিল। তখন তাদের নারী এবং শিশু-কিশোররা সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়ে নতুন বসতি স্থাপন করেছিল। তৎকালে সিরিয়া ছিল ইরানীদের দখলে। পরে হিরাক্লিয়াস নামক এক খ্রিষ্টান নরপতি হামলা চালিয়ে সিরিয়া দখল করে নেয়। ইহুদীরা তার সাথেও গাদ্দারী করে। এতে বাদশা হিরাক্লিয়াস খুবই ক্ষেপে যায়। মদীনায় মুসলমানরা বনু কুরাইযাকে যে মুহূর্তে হত্যা করে চলে, ওদিকে হিরাক্লিয়াসও তখন বনূ নযীর ও বনূ কায়নুকার উপর প্রতিশোধ নিতে গণহত্যা চালায়।
হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর উদ্ধৃতি দিয়ে হযরত হিশাম বিন উরওয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন এবং বনু কুরাইযার ইহুদীদেরকে হত্যা করা হয়। হযরত হিশাম রাযিয়াল্লাহু আনহু তাও উল্লেখ করেছেন যে, তার সম্মানিত পিতা তাকে এ ঘটনা শুনিয়েছেন যে, খন্দক যুদ্ধে হযরত সা’দ বিন মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বুকের উপরিভাগে বর্শা বিদ্ধ হয়। বনু কুরাইযার শাস্তি শেষ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে মসজিদে নব্বীর কাছে হযরত মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য একটি তাঁবু স্থাপন করা হয়। চিকিৎসা ও সেবা যত্নের সুবিধার্থে তাকে এখানে রাখা হয়।
