কা’ব বিন আসাদ কম্পিত কণ্ঠে বলে– “পবিত্র মোশান! আপনার জাদু কি ঐ বর্শা ও তলোয়ারগুলো টুকরো টুকরো করতে পারে, যা আমাদেরকে হত্যা করতে উদ্যত?”
“হ্যাঁ, পারে।” বুড়ো লাঈছ কা’বকে অভয় দিয়ে বলে– “মুহাম্মাদের জাদু বেশি বেড়ে গেলে আমার জাদু দেখাতে বাধ্য হব।… তুমি উপরে গিয়ে কি দেখে এলে?”
“খোদার কসম!” কা’ব বিন আসাদ বলে– এই নু’আইম বিন মাসউদই চাণক্য গোয়েন্দাগিরি করেছে। আমি জানতামনা যে, সে মুসলমান হয়ে গেছে। মুসলমানরা এখন অবরোধের পর্যায়ে আছে। আমাদের বের হবার সকল রাস্তা বন্ধ।”
“এ দু’জনকে যে কোন পন্থায় বের করার ব্যবস্থা কর।” লাঈছ বলে– ইউহাওয়া! যারীদকে নিয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যাও। আমি তোমাদের পেছনে আসছি।”
‘লাঈছ বিন মোশান। আপনি উপরে যাচ্ছেন না কেন” কা’ব উৎকণ্ঠার সাথে বলে– “আপনার সেই প্রজ্ঞা এবং জাদু-নৈপুণ্য কোথায় গেল, যা আপনি…।”
বুড়ো লাঈছ বলে– “এ রহস্য বোঝা তোমার সাধ্যের বাইরে, হযরত মুসা আলাইহিস সালাম একদিনেই ফেরআউনকে ধ্বংস করে দেন নি। আমার হাতে যে লাঠি দেখতে পাচ্ছ তা ঐ লাঠি, যা দিয়ে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম পানিতে আঘাত করলে পানি দুভাগ হয়ে গিয়ে তাঁর সাথিদের জন্য রাস্তা তৈরী করে দিয়েছিল। এটা লাঠিরই মোজেযা ছিল যে, ফেরআউনের দলবল এবং সে নিজে মাঝ দরিয়ায় ডুবে ধ্বংস হয়ে যায়। যেভাবে হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর গোত্রকে মিসর থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন, তদ্রুপ আমি তোমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাব।”
ইউহাওয়া এবং যারীদ ইতোমধ্যে জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। লাঈছ বিন মোশানও হাঁটা শুরু করে।
মুসলিম সৈন্যরা বনু কুরাইযার বসতির কাছে চলে এলে মহিলা এবং শিশু তুলকালাম কাণ্ড সৃষ্টি করে। সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মহিলা এবং শিশুরা নিজ নিজ ঘরে পালিয়ে যেতে থাকে। মোকাবিলার জন্য একজনও কেল্লা হতে বের হয় না। যে সৈন্যরা পর্বতশৃঙ্গের দিক থেকে অবরোধের জন্য আসতে থাকে দুজন পুরুষ আর একজন নারী তাদের চোখে পড়ে। তিনজনই পালাচ্ছিল। বৃদ্ধ পুরুষ এবং মহিলাটি তাদের সাথিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। লোকটি বারবার ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাচ্ছিল এবং সামনে যেতে চাচ্ছিল না।
এ তিনজন ছিল লাঈছ, যারীদ এবং ইউহাওয়া। লাঈছ যারীদের মগজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হত্যার জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলে কিন্তু যারীদ এখন তার জন্যই আপদ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্বার আসক্তিতে এ সময় তার মন-মগজ তীব্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। সে তাদের হাত থেকে বারবার ছুটে যেতে চায়। ইউহাওয়া প্রেমের টানে তাকে সাথে নিয়ে চলে। তার প্রবল আশঙ্কা ছিল, যারীদকে ছেড়ে দিলে সে নির্ঘাত মুসলমানদের হাতে নিহত হবে। লাঈছের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। সে তাকে জোর করে হলেও এই উদ্দেশে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে এজন্য যে পরে সুযোগমত আবার তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হত্যার কাজে ব্যবহার করবে। তারা যতই তাকে নিয়ে যেতে চায়, সে ততই বলতে থাকে– “যে নিজেকে নবী বলে দাবি করে সে কোথায়?… সে আমাদেরই লোক।… আমার হাতেই তার মৃত্যু।… আমাকে ছেড়ে দাও।… আমি মদীনায় যাব।”
এক মুসলমান পর্বতশৃঙ্গে দাঁড়িয়ে তাদের থামতে কড়া নির্দেশ দেয়। লাঈছ এবং ইউহাওয়া আওয়াজের উৎস লক্ষ্য করে পিছনে তাকিয়ে যারীদকে সেখানে ফেলে রেখে নিজেরা পালিয়ে যায়। যারীদ অসি কোষমুক্ত করে।
“মুহাম্মাদ কোথায়?” যারীদ তরবারি নাচিয়ে পর্বতশৃঙ্গের দিকে আসতে আসতে বলে– “সে আমাদেরই বংশের সন্তান। আমি তাকে ভালভাবেই চিনি। আমি তাকে হত্যা করব। সে নবুওয়্যাতের দাবি করছে।… ইউহাওয়া শুধুই আমার।”
“ইউহাওয়া হুবল ও উযযা দেবী হতেও পবিত্র।” যারীদ সামনে চলে এবং গর্জে উঠে বলতে থাকে– “নবী কই? তাকে সামনে হাজির কর।”
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এত বড় অপমান কোন্ মুসলমান সহ্য করতে পারে? যে মুসলমান তাদেরকে থামতে বলেছিলেন, তিনি ধনুকে তীর সংযোজন করেন এবং চোখের পলকে তীর যারীদের ডান চোখ দিয়ে ঢুকে মাথার খুলির বেশ গভীরে চলে যায়। যারীদের এক হাতে ছিল তলোয়ার। তার অপর হাত মুহূর্তে ডান চোখে চলে গেলে হাত তীরের উপর গিয়ে পড়ে। সে থমকে দাঁড়ায়। শরীর দুলতে থাকে। হাঁটু মাটিতে গিয়ে লাগে। তলোয়ার ধরা হাত মাটিতে এমনভাবে গিয়ে পড়ে যে, তলোয়ারের আগা উর্ধ্বমুখী ছিল। যারীদ ধপাস করে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়। তলোয়ারের অগ্রভাগ তার শাহরগে আমূল ঢুকে যায়। হাল্কা দাপাদাপি করে চিরদিনের জন্য নিথর ও নীরব হয়ে যায় সে।
আহত হযরত সা’দ বিন মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহু কা’ব বিন আসাদের দরজায় গিয়ে নক করেন। কা’ব কোন খাদেম না পাঠিয়ে নিজেই গিয়ে দরজা খোলে দেয়।
“বনূ কুরাইযার নেতা!” হযরত সা’দ ভূমিকা ছাড়াই বলেন– “তোমার গোত্রের ছোট শিশুও জানে এবং দেখেছে যে, তোমাদের বসতি আমরা ঘেরাও করে ফেলেছি। তুমি অস্বীকার করতে পার যে, তুমি ঐ অপরাধ করনি, যার শাস্তি তোমার গোত্রের সকলে ভোগ করবে? চিন্তা করে দেখেছ, চুক্তি লঙ্গনের পরিণতি কত ভয়ানক?
