“পবিত্র পিতা।” ইউহাওয়া ধরা গলায় অনুনয়ের স্বরে বলে– “এত কষ্ট যারীদ সহ্য করতে পারবে না। নিশ্চিত মরে যাবে। শুধু এ লোকটিই…।”
ইহুদীদের খোদার চেয়ে অধিক ভালবাসার যোগ্য আর কেউ নয়।” লাঈছ ইউহাওয়ার আবেদন মাঝপথে কেটে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে– “এতটুকু ত্যাগ তোমাকে সহ্য করতেই হবে। যারীদ আর কোনদিন মক্কায় ফিরে যাবে না।”
ইউহাওয়া ও যারীদ আর মক্কায় ফিরে যায় না। বুড়া লাঈছ উভয়কে তিনদিন তিনরাত একটি কক্ষে বন্দি করে রাখে। যারীদকে নিজের সম্মুখে বসিয়ে তার চোখে চোখ রাখে। এরপর তাকে কিছু পান করিয়ে দুর্বোধ্য ভাষা মন্ত্র উচ্চারণ করে। সে ইউহাওয়াকে একদম উলঙ্গ করে যারীদের পাশে বসিয়ে দেয়। লাঈছ ইউহাওয়াকে যে নির্দেশ দেয়, সে বিনা বাক্য ব্যয়ে তা করে যায়।
“যারীদের চিন্তা-চেতনা কিভাবে আমি নিয়ন্ত্রণ করলাম তা এখানে সকলের সম্মুখে খুলে বলা সঙ্গত মনে করি না।” লাঈছ কক্ষের লোকদের উদ্দেশে বলে– “আমি তাকে আমার সাথে করেই নিয়ে এসেছি। তোমরা নিজ চোখে তাকে দেখতে পার।”
লাঈছ ইউহাওয়াকে ইশারা করলে সে বের হয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পর যারীদকে সাথে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। যারীদ ভেতরে প্রবেশ করে পালাক্রমে সবার প্রতি নজর বুলাতে থাকে।
যারীদ মুখ তুলে বলে– “সে এখানে নেই। আমি তাকে ভাল করেই চিনি। সে আমারই গোত্রের লোক। সে এখানে নেই।”
“সবর কর যারীদ।” বুড়ো লাঈছ বলে– “আমরা অবশ্যই তোমাকে তার পর্যন্ত পৌঁছে দিব। কাল হ্যাঁ, আগামীকালই যারীদ!… এখন বস।”
যারীদ ইউহাওয়ার গা ঘেঁষে বসে পড়ে এবং তার হাত ধরে আরো কাছে টেনে আনে।
খন্দক যুদ্ধ জয়ের পরবর্তী দিন যখন মদীনার জনগণ বিজয়ের রজত জয়ন্তী উদযাপন করছিল এবং অপরদিকে কা’ব বিন আসাদের বাসভবনে ইসলামের বিরুদ্ধে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের নীল নক্সা অংকিত হয় ঠিক সে মুহুর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানানো হয় যে, বনু কুরাইযার সরদার কা’ব বিন আসাদ মদীনা অবরোধ কালে কুরাইশ ও গাতফানের সাথে এক গোপন চুক্তি করে। হযরত নু’আইম বিন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সে চুক্তি ব্যর্থ করে দেন।
এটিও ছিল বিগত চারদিন আগের একটি ঘটনা। এ ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফুফু হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা এক ইহুদী গোয়েন্দাকে হত্যা করেছিলেন। গোয়েন্দাটি মুসলমানদের স্ত্রী ও সন্তানদের আশ্রিত ছোট কেল্লার বাইরে থেকে গোপনে প্রবেশ করা যায় কি-না তা নিরীক্ষা করছিল। কিন্তু সে হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর চোখে পড়ে যায়। তিনি ইহুদীকে চ্যালেঞ্জ করলে ইহুদী তাকে একজন দুর্বল নারী ভেবে বড় গর্বের সাথে আত্মপরিচয় দিয়ে বলেছিল, সে একজন ইহুদী এবং গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছে। হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা অলৌকিকভাবে ইহুদীর তরবারির মোকাবিলা করেন লাঠির সাহায্যে এবং কৌশলে তাকে কুপোকাত করে করুণভাবে হত্যা করেন।
‘আল্লাহর কসম!” জনৈক সাহাবী জোরালো কণ্ঠে বলেন– ইহুদীদেরকে বিশ্বাস করা এবং তাদের চুক্তি ভঙ্গের অপরাধ ক্ষমা করা নিজ হাতের খঞ্জর নিজের হৃদপিণ্ডে আমূল বসিয়ে দেয়ার নামান্তর।”
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আসমা এবং হযরত নাফে রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বরাতে বর্ণনা করেন যে, খন্দক যুদ্ধ শেষে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ জারী করেন– “তোমরা বনু কুরাইযাতে গিয়ে আসরের নামায পড়বে।”
হযরত আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আরেক হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, জিব্রাইল বাহিনীর অশ্বখুরে উত্থিত ধুলিঝড় আমার নজরে এখনও ভাসছে। এ দৃশ্য তখনকার, যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযার চুক্তি ভঙ্গ এবং ঘৃণ্য প্রতারণার সাজা দিতে গিয়েছিলেন।
সকল ঐতিহাসিক একযোগে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে মুসলমানগণ সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র অবস্থায় রওনা হয়ে বনু কুরাইযার সব ক’টি দূর্গ অবরোধ করেন। বহু হাদীস থেকে জানা যায় যে, হযরত সা’দ বিন মুয়াজ রাযিয়াল্লাহু আনহু কে বনু কুরাইযার নেতাদের প্রতি এই পয়গাম দিয়ে প্রেরণ করা হয় যে, চুক্তি লঙ্ঘণের শাস্তি যেন তারা নিজেরাই স্থির করে নেয়। হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু আহত ছিলেন। খন্দক যুদ্ধ চলাকালে হাব্বান বিন আরাফা নামক এক কুরাইশীর বর্শাঘাতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন।
♣♣♣
লাঈছ বিন মোশান, ইউহাওয়া এবং নেতা গোছের আরো তিন চার ইহুদী তখনও কা’ব বিন আসাদের কাছে বসা ছিল। যারীদ বিন মুসাইয়্যিবও সেখানে ছিল। তারা চক্রান্ত বাস্তবায়নের জন্য রাতের আঁধারকে সর্বসম্মতভাবে বেছে নেয়। প্রস্তাব পাশ হওয়ার ঠিক মুহূর্তে এক ইহুদী দৌড়ে কক্ষে প্রবেশ করে।
“মুসলমানরা এসে গেছে।” ইহুদী ভীত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে– “এটা স্পষ্ট যে, তারা বন্ধু হয়ে আসছে না। ধূলা বলছে, তারা আসছে। ধূলা ডানে-বামে ছড়ানো।… দেখ। শীঘ্র চল এবং দেখ।”
কা’ব বিন আসাদ দৌড়ে বাইরে এসে দূর্গ-শীর্ষে ওঠে সেখান থেকে এক প্রকার দৌড়ে নিচে নামে এবং সোজা লাঈছ বিন মোশানের কাছে চলে যায়।
