প্রসঙ্গক্রমে ইউহাওয়া তাদেরকে এ তথ্য জানিয়ে দেয় যে, কুরাইশরা বদরে মুসলমানদের হাতে পরাজিত হয়ে এলে নিহতদের নিকটাত্মীয় মহিলারা হাত নাড়ায়ে নাড়ায়ে শোক প্রকাশ করে। ইউহাওয়ার পিতা ছিল একজন কট্টর ইহুদী। কুরাইশদের পরাজয়ে তার অশ্রু ঝরে। সে মন্তব্য করেছিল, এক হাজার কুরাইশ যোদ্ধা যদি মাত্র তিনশ তেরজন মানুষের নিকট পরাস্ত হয়, তাহলে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, “মুহাম্মাদের কাছে সত্যই কোন জাদু আছে।” সে অনুশোচনার স্বরে বলে – “মুহাম্মাদের অনুসারী তারাও তো কুরাইশ গোত্রের লোক। আসমান থেকে তারা আসেনি। তাহলে এই ক্ষুদ্র দলটি কিভাবে জয় পেল।
তখন ইউহাওয়ার বয়স কম। পরদিন তার পিতা পরিবারের সবাইকে ডেকে পূর্বরাতে দেখা স্বপ্নের কথা বলে। সে স্বপ্ন দেখেছিল, তার হাতে রক্তস্নাত একটি তরবারি। একটি লোক তার সামনে মাটিতে পড়ে ছটফট করছে। তার বস্ত্র রক্তে রঞ্জিত। ইউহাওয়ার পিতা চিনতে পারে না যে, নিহত লোকটি কে? স্বপ্নে একটি আওয়াজ তার কানে ভেসে আসে– “এটা তোমারই সম্পন্ন করতে হবে।” নিহত ব্যক্তি কিছুক্ষণ ছটফট করে নিথর হয়ে যায়। লাশ নিজে নিজেই মাটির নীচে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেখান থেকে খুব সুন্দরী এক বালিকার অভ্যুদয় ঘটে। ঠোঁট ভরা থাকে তার মুচকি হাসিতে।
তার পিতা স্বপ্নটি দেখে ঘাবড়ে যায়। তাবীর জানতে লাঈছ বিন মোশানের কাছে যায়। স্বপ্নের বৃত্তান্ত তাকে খুলে বললে লাঈছ তাকে এই পরামর্শ দেয় যে, তোমার অল্পবয়স্কা মেয়ে ইউহাওয়াকে ইসলামের শিকড় কর্তনে উৎসর্গ কর। জাদুকর লাঈছ তার পিতাকে এ ভবিষ্যদ্বাণী করে যে, মুহাম্মাদ নামে যিনি নবুওয়াতের দাবি করছেন তিনি এ মেয়েটির হাতেই নিহত হবেন অথবা এই মেয়েটি তাঁর নবুওয়াতের পরিসমাপ্তির কারণ হবে। লাঈছ ইউহাওয়ার পিতাকে তার কাছে নিয়ে আসতে অনুরোধ জানায়।
ইউহাওয়াকে লাঈছ বিন মোশানের হাওলা করে দেয়া হল।
“আমি মেয়েটিকে উপযুক্ত ট্রেনিং দিয়েছি।” লাঈছ বিন মোশান ইউহাওয়ার কথার মাঝখানে বলে– “ইহুদীদের খোদা তাকে যে রূপ-যৌবন দান করেছে, তাতে তাকে আকর্ষণীয় তরবারি কিংবা বিষাক্ত মিষ্টান্ন বলা যেতে পারে। কুরাইশ-মুসলমান সংঘর্ষে লিপ্ত হতে সে যে ভূমিকা পালন করেছে তা তোমাদের কারো পক্ষে রাখা সম্ভব নয়। বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্র-প্রধানদেরকে এই মেয়েটি অত্যন্ত সফলভাবে ঐক্যবদ্ধ নিপুণ ব্যবস্থা সে আমাকে সামনে রেখে করেছে, তা তারই মুখ থেকে শোনা যাক।”
ইউহাওয়া বলতে শুরু করে, লাঈছ বিন মোশান তার মধ্যে এমন সাহস এবং এমন মেধার সমন্বয় ঘটায় যে, সে রূপের যাদুতে পুরুষকে কুপোকাত করতে কল্পনাতীত পারদর্শী হয়ে ওঠে। অপূর্ব সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার মধ্যে পুরুষের ন্যায় সাহসও সৃষ্টি হয়। কিন্তু তার উস্তাদ তাকে ঘুণাক্ষরেও একথা জানায় না যে, যে নতুন ধর্ম-বিশ্বাস রুখতে এবং যে মহান ব্যক্তিকে হত্যা করা তার অভিলাষ, সে ধর্ম-বিশ্বাস স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালারই প্রদত্ত এবং তিনিই ঐ মহান ব্যক্তিকে এই নতুন ধর্মমতের প্রচার-প্রসার এবং উন্নতির উদ্দেশে রাসূল করে জগতে প্রেরণ করেছেন।
ইউহাওয়াকে এমন চিন্তা-চেতনায় গড়ে তোলা হয় যে, সে নিজের ধর্মকেই কেবল পৃথিবীর একমাত্র সত্য ধর্ম বলে মনে করত। সত্য পন্থীদের সাথে যে আল্লাহ পাক থাকেন– একথা তার মগজে প্রবেশ করত না। সে নিজ ধর্ম ছাড়া কিছুই বুঝত না, মানত না। লাঈছের প্রশিক্ষণ তাকে কট্টর ও ইহুদীবাদের অন্ধ ভক্তে পরিণত করে। আল্লাহ তায়ালা ঘূর্ণিঝড়ের মাঝে তাকে একাকী নিক্ষেপ করে বাস্তব চেতনায় অনুপ্রাণিত করতে চান কিন্তু সে আল্লাহর ইঙ্গিত ও অভিপ্রায় বুঝতে পারে না। বিপদে ফেলে ভুল ভেঙ্গে দেয়াই ছিল আল্লাহ্ পাকের অভিলাষ। দৃঢ় হিম্মত এবং অসীম সাহসিকতার ব্যাপারে তার মধ্যে যথেষ্ট অহংকার ছিল। সে নিজেকে এ ব্যাপারে পুরুষের ন্যায় বলে মনে করত। অথচ এখন সে এক অতি দুর্বল এবং চরম অসহায় এবং নারী ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইউহাওয়া পুরুষের দেহ সম্পর্কে অপরিচিত ছিল না। যারীদ বিন মুসাইয়িবের দেহ এক পুরুষের দেহ ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না। কিন্তু তার কাছে যারীদের দেহ অত্যন্ত পূত-পবিত্র মনে হয়। যারীদ তার কাছে যেন সাক্ষাৎ ফেরেশতা। তার এ অনুভবের কারণ, সে তার রূপ-যৌবন, রেশমী চুল এবং আকর্ষণীয় দৈহিক গঠনে বিন্দুমাত্রও প্রলুব্ধ হয়নি। যারীদের এই নির্মল চরিত্রের প্রভাব ইউহাওয়ার উপর এমন গভীর রেখাপাত করে যে, সে তার দেহের প্রতি এক ধরনের টান ও আকর্ষণ অনুভব করে।
মক্কা বেশি দূরে ছিল না। গভীর রাতে যারীদ ইউহাওয়াকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেয়। কেল্লার মত গেট খুলতেই তার পিতাকে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন দেখা যায়। তার আশা ছিল না যে, তার মেয়ে জীবিত ফিরে আসবে। তার পিতা যারীদকে ভেতরে ডেকে নিয়ে শরাব দ্বারা আপ্যায়ন করে। যারীদ চলে গেলে ইউহাওয়া তার নিজের মাঝে এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করে।
পর দিনই ইউহাওয়া এক কাসেদের মাধ্যমে যারীদকে সাক্ষাৎ করতে বলে। খবর পেয়ে যারীদ তৎক্ষণাৎ চলে আসে। এটা ছিল অনুরাগের সাক্ষাৎ। এরপরেও তাদের রুটিন মাফিক সাক্ষাৎ হতে থাকে। ইউহাওয়া অনেক পূর্বেই যারীদকে ভালবেসে ছিল। বারবার দেখা-সাক্ষাতের পর যারীদের অন্তরেও ইউহাওয়ার প্রতি ভালবাসা জন্ম নেয়। তবে এ মহব্বত ছিল নিষ্কলুষ। ইউহাওয়া বিস্মিত না হয়ে পারে না, যখন দেখে তার আত্মার মাঝে মহব্বত অনুরাগ বিদ্যমান। সম্পর্ক গভীর হলে একদিন যারীদ ইউহাওয়ার কাছে জানতে চায়, সে তার সাথে কেন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় না?
