“আমার সাথে এস।” লোকটি এ কথা বলে তার হাত ধরে টেনে সাথে করে নিয়ে চলে।
“একটু দাঁড়াও।” ইউহাওয়ার কণ্ঠে অনুরোধ – “তোমরা মোট কতজন?… আমাকে তোমরা দয়া করবে তো?… আমার ধারণা মতে তোমরা কুরাইশী।”
“এখানে আমি একা। লোকটি বলে– “ঠিকই বলেছ, আমি কুরাইশী। তোমার প্রতি দয়াই করছি।”
“কয়েকবার আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি।” ইউহাওয়া কিছুটা সাহস সঞ্চার করে বলে– “কিন্তু তোমার নাম আমি জানিনা।”
আমার নাম যারীদ বিন মুসাইয়িব।… কথা বাড়িও না। আমার সাথে এস।”
“পরে তো তুমি আমাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেবে?” ইউহাওয়া ধরা গলায় জানতে চায়– “আমি তোমাকে অসন্তুষ্ট করব না।”
ইউহাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের তাল হারিয়ে ফেললেও উটের আওয়াজ ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। এই উটটি ছিল যারীদের। উট গুহার বাইরে বসিয়ে যারীদ অধিকতর নিরাপদ হিসেবে একটি গুহাকে বেছে নিয়ে সেখানে বসে ঝড় থামার অপেক্ষা করে। ইউহাওয়া বিপদে পড়ে ঘুরতে ঘুরতে এখানে এসে পৌঁছলে দুজনের এই আলাপচারিতা ও কথোপকথন হয়। যারীদ ইউহাওয়াকে গুহার ভিতর নিয়ে যায়। দীর্ঘ শরীর, হৃষ্ট-পুষ্ট এবং আকর্ষণীয় চেহারার এক টগবগে যুবক যারীদ। সে ইউহাওয়াকে গুহার ভিতর নিয়ে পানি পান করায়। এরপর খেজুর ভর্তি একটি থলে তার সম্মুখে রেখে দেয়।
যারীদ বলে– “চুপ করে বসে থাক। ঝড়ের বেগ কমছে। আমি তোমাকে অবশ্যই বাড়ি পৌঁছে দিব।” একটু থেমে সে ইউহাওয়াকে জিজ্ঞেস করে– “আমাকে অসন্তুষ্ট করবে না, একথা কেন বলছিলে?
‘বাড়িতে পৌঁছে দেবার বিনিময় হিসেবে।” ইউহাওয়া বলে– “এ ছাড়া বিনিময় হিসেবে আর কি দেবার আছে আমার?
“কোন বিনিময় নিতে চাই না।” যারীদ বলে– “আমি তাদের মত নই। যুদ্ধ করে তোমাকে আনতে পারলে তুমি আমার পুরস্কার হতে। কিন্তু এখানে তুমি আমার দয়া ভিক্ষা করেছ। দয়ার বিনিময় গ্রহণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব।”
ইউহাওয়া তার মুখের দিকে বিস্ময়ে চেয়ে থাকে। যারীদ কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শয্যা গ্রহণ করে। ইউহাওয়া তার সাথে হাল্কা কথাবার্তা বলে। পরক্ষণেই তার নিশ্চিত বিশ্বাস হয়ে যায় যে, যারীদের মনে কোন কুমতলব নেই। এমনকি যারীদ তার সাথে মন খুলে কথা বলে না। ইউহাওয়া নিরাপদ সাথি পেয়ে খুশী। কিন্তু যারীদের মত টগবগে যুবক তার নজরকাড়া রূপে এতটুকু মোহিত না হওয়ায় সে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। এটাকে তার রূপ-যৌবনের পরাজয় মনে করে।
“যারীদ!” ইউহাওয়া হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে– “আমি কি দেখতে সুন্দরী নই? আমাকে তোমার পছন্দ হয় না?”
যারীদ তার কথা শুনে হা হা করে হেসে ওঠে শুধু মুখে কিছুই বলে না।
“হাসছ কেন?” অসহায় ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করে ইউহাওয়া– “তোমার হাসি দেখে আমার পিলে চমকে গেছে।”
“খোদার কসম! তুমি খুবই সুন্দরী। যারীদ এবার বলে– “তুমি আমার পছন্দসই ঠিকই। কিন্তু যে বিপদ সংকুল অবস্থায় এবং যে মরুতে তোমার সাথে আমার সাক্ষাৎ সেখানে অন্যায় কোন কিছু করা আমি ভাল মনে করি না।… আমার পৌরুষকে উত্তেজিত করে তুলো না। তোমার দেহ আমাকে আকর্ষণ করে ঠিকই কিন্তু এই ভয়ে শুধু আমি আত্মসংযম করেছি যে, আমার দেবতা এ অপরাধে আমাকে অভিসম্পাত করবে যে, এক বিপদগ্রস্ত নারীকে আমি আশ্রয় দিয়েছি। অতঃপর তার দেহকে নিজে উপভোগ করেছি।”
যারীদ এরপর আর কোন কথা বলে না। ইউহাওয়ার অন্তর থেকে ভীতি দূর হতে থাকে। যারীদকে তার খুবই ভাল লাগে। যারীদের অনুপম চরিত্র আর অমায়িক ব্যক্তিত্ব তাকে জয় করে ফেলে।
“যারীদকে মক্কায় বহুবার আমি দেখেছিলাম।” ইউহাওয়া কা’ব বিন আসাদের বাসভবনের ঘটনা বর্ণনার এক পর্যায়ে বলে– “কিন্তু আমি কখনো তাকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। নিজগোত্রে তার বিশেষ কোন সম্মান কিংবা উল্লেখযোগ্য কেউ ছিল না। কিন্তু সেদিন গুহায় তার একান্ত সান্নিধ্য এবং অন্ত রঙ্গভাবে তার সাথে বসে আমার উপলদ্ধি হতে থাকে যে, লোকটি বিশিষ্টজনদেরও অন্যতম।”
‘ঘুর্ণিঝড় যখন বন্ধ হয় তখন সূর্য পশ্চিমাকাশে অস্ত যাওয়ার উপক্রম। সে আমাকে চলে আসতে বললে আমি তার পিছু পিছু গুহা থেকে বেরিয়ে আসি।
অনতি দূরেই তার উট টিলার সাথে লেগে বসা ছিল। সে উটে চড়ে আমাকে তার পশ্চাতে বসায়। তার ইশারা পেয়ে উট উঠে দাঁড়ায় এবং চলতে শুরু করে। ততক্ষণ আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রাকৃতিক আলোয় স্থানটি দেখতে চেষ্টা করি। খুবই ভয়ঙ্কর। এই ভীতিকর স্থান সম্পর্কে এর আগে কত কথা শুনেছিলাম। ঘূর্ণিঝড় চলাকালে কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় থেমে যাওয়ার পর চোখ ফিরালে সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে। কোন কোন টিলা ছিল দেখতে অবিকল মানুষের মত। টিলাগুলোর রঙও ছিল হৃদয় কাঁপানো।”…
‘উষ্ট্রারোহনে আমি খুবই পাকা ছিলাম। উট দৌড়ানোও আমার জন্য মামুলী ব্যাপার ছিল। কিন্তু সেদিনের পড়ন্ত বিকেলে যারীদের পিছে উটে সওয়ার থাকা সত্ত্বেও আমার কেবল পড়ে যাওয়ার ভয় করে। যারীদের কোমরে হাত দিয়ে তাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরি। এক সময় আমার এ অনুভূতি জেগে ওঠে যে, আমি এক দুর্বল নারী মাত্র। আর যারীদ আমার রক্ষক। ধর্মের স্বার্থে আমি কি করছি তা অনেকেই জানে। কিন্তু এ তথ্য তো কেউ জানে না যে, পিতাই আমাকে এ পথে নামিয়েছেন।”
