ঘুর্ণিঝড় ইউহাওয়াকে ধাক্কা মেরে মেরে নিয়ে চলে। ঝড়ের শো শো আওয়াজ হঠাৎ বিকটরূপ ধারণ করে। ইউহাওয়া ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে নিচের দিকে চলে। ঝড় তাকে দ্রুত নিয়ে চলে। এখানে এসে একটি দেয়ালের সাথে ধাক্কা খায়। এটি ছিল বালির দেয়াল। ইউহাওয়া দেয়াল ধরে ধরে সামনে এগিয়ে চলে। এটা নিম্নভূমি হওয়ায় এখানে মাটির টিলা এবং ডাল-পালাবিহীন মরুবৃক্ষ ছিল। পরিবেশ ও প্রকৃতিগত কারণে ঝড়ের আওয়াজ অনেক নারীর একযোগে চিৎকারের মত শোনা যায়। মাঝে মধ্যে এমন আওয়াজও শোনা যায় যার সাথে ঝড়ের আওয়াজের কোন সম্পর্ক ছিল না। মানুষের আওয়াজ বলেও মনে হয়নি। প্রেতাত্মা ও হিংস্র জানোয়ারের আওয়াজের মত মনে হচ্ছিল।
ইউহাওয়া নিজেকে অত্যন্ত সাহসী মনে করলেও এখানে এসে ভয়ে কেঁদে ফেলে। তার বিশ্বাস ছিল, এক সময় ঘূর্ণিঝড় থেমে যাবে। সাথে সাথে এ কথাও সে ভুলে না যে, কোন পুরুষের কবলে পড়লে সে তাকে তার বাড়িতে নয়; বরং নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবে। এ সম্ভাবনাও তাকে অস্থির করে তোলে যে, সুযোগ বুঝে কেউ তার ইজ্জত লুট করে তারপর হত্যা করবে। ক্রমেই রাত ঘনীভূত হচ্ছিল। বাঘ-ভাল্লুকের আশঙ্কাও ছিল। সমস্ত উদ্বেগ বাদ দিলেও এ উৎকণ্ঠা এড়ানোর কোন উপায় ছিল না যে, মক্কার সাধারণ রাস্তা ছেড়ে তার বাহন ঘোড়ার গাড়ি মরুভূমিতে একবার পথ হারালে দ্বিতীয়বার পথের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব ছিল। পথহারা মুসাফিরের শেষ পরিণতি হতো মৃত্যু। ক্লান্ত বা পরিশ্রান্ত হওয়ার কারণে নয়। পিপাসার কারণে ছটফট করে মারা যেত।
হঠাৎ উটের বিড় বিড় আওয়াজ ভেসে আসে। তার আতঙ্ক আরো বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই বলে মনকে সান্ত্বনা দেয় যে, এটা ভিন্ন কিছু নয়; বরং ঘূর্ণিঝড়েরই আওয়াজ মাত্র। খালি চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মাটির দেয়ালে হাত রেখে রেখে সে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। দেয়ালটি ছিল মূলত একটি বড় টিলা, যা কিছুদুর গিয়ে বাক খায়। পুনরায় শোনা যায় উটের আওয়াজ। এবারের এ আওয়াজ অতি নিকট থেকে আসে। এত নিকট থেকে যে, ইউহাওয়া প্রথমে আঁৎকে উঠে দু’কদম পিছনে চলে আসে। এটা উটেরই আওয়াজ বলে সে নিশ্চিত হয়।
বিরান মরুভূমিতে মানুষ ছাড়া উটের কথা ভাবাও যায় না। একটি উটের সাথে কমপক্ষে দু’তিনজন লোক অবশ্যই থাকবে। এখানে যারা আছে তারা তার সুহৃদ হওয়াটা এক প্রকার অসম্ভব। কারণ, সময়টা ছিল অত্যন্ত খারাপ। ধর্ষণ, খুন, লুণ্ঠন চলত নির্বিচারে। এসব ভেবে ইউহাওয়া সেখান থেকে সরে পড়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু কোন দিকে যাবে? কোথায় যাবে? এই জনহীন মরুভূমিতে তাকে কে একটু আশ্রয় দিবে? এদিকে ঘূর্ণিঝড় টিলা এবং মৃত্যুপ্রায় বৃক্ষের মাঝ দিয়ে গমনকালে ভীতিকর আওয়াজ সৃষ্টি করে চলছিল। মাটি ইউহাওয়ার পা শক্ত করে এটে ধরে। যাদের সাথে ঘোড়ার গাড়িতে সে চলছিল এ সময়ে এসে আরেকবার তাদের উপর তার রাগ হয়। তার রাগের কারণ, জ্যান্ত একটা মানুষ পড়ে গেল অথচ পাশেই বসে থাকা একজনও জানল না।
♣♣♣
একটি অদৃশ্য শক্তি তাকে ধাক্কা মেরে একদিকে নিয়ে যায়। সেখান থেকে দেয়ালের মত খাড়া একটি টিলা ক্রমে ভিতর দিকে চলে গিয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে স্থানটি ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে মুক্ত ছিল। এখান থেকে তিন-চার গজ দূর পর্যন্ত ইউহাওয়া স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু কোন উট তার নজরে পড়ে না, দেয়ালের গা ঘেঁষে সে আরো ভিতরে চলে যায়। দু’কদম এগুতেই একটি গিরিমুখ দেখা গেল। কিন্তু গর্তের মধ্যে যেতে তার সাহস হয় না। সে ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে।
“ভিতরে এস।” এক ব্যক্তির আহবান তার কর্ণকুহরে গিয়ে আঘাত হানে– বাইরে দাঁড়িয়ে কেন ভাই, ভিতরে এস।”
ইউহাওয়া নিজের অজান্তে সজোরে চেঁচিয়ে ওঠে এবং পিছনে ফিরে দৌড় দেয়। কিন্তু গিরি এলাকা থেকে বের হওয়া মাত্রই ঘূর্ণিবায়ু তার শরীর লক্ষ্য করে বেলচা দিয়ে বালু নিক্ষেপের মত বালু ছুঁড়ে মারে। ইউহাওয়া ঘাবড়ে পিছনে সরে আসে। এরই মধ্যে গুহা থেকে তার সন্ধানে আগত এক ব্যক্তি ঠিক তার সম্মুখে এসে দাড়ায়।
‘একি! তুমি মহিলা?” লোকটি উদ্বিগ্ন হয়ে আরো জিজ্ঞেস করে– “তুমি কি একা? একা তো হতে পারে না।”
‘আমার সাথে চারজন পুরুষ আছে।” ইউহাওয়া কাপড়ে মুখ ঢাকতে ঢাকতে বলে তাদের সাথে ঘোড়া আছে। তাদের সকলের সাথে তলোয়ার ও বর্শা রয়েছে।
“তারা কোথায়?” লোকটি জানতে চায়– “তুমি তাদের থেকে আলাদা হয়ে এদিকে কেন এসেছ?… তাদেরও এখানে নিয়ে এসো। গুহাটি বড়ই চমৎকার। সকলেই আরামে সেখানে বসতে পারব।”
ইউহাওয়া জায়গা থেকে নড়ে না। লোকটি তিন তিনবার তার সাথিদের এখানে আনতে বলে। কিন্তু ইউহাওয়ার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। সে সাথিদের ডাকতে যায় না আবার কথাও বলে না। এতে তার সন্দেহ বেড়ে যায়। লোকটি হঠাৎ ইউহাওয়ার উড়না ধরে টান মেরে চেহারা বের করে ফেলে।
‘তুমি অমুক ইহুদীর মেয়ে নও?” লোকটি ইউহাওয়ার বাবার নাম ধরে জানতে চায়– “তুমি একা?”
“হ্যাঁ, আমি একা।” ইউহাওয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে– “আমাকে একটু দয়া কর।”
এরপর ইউহাওয়া তার নিঃসঙ্গ হওয়া সহ বিস্তারিত ঘটনা খুলে বলে। এখানে কিভাবে পৌঁছল তাও তাকে জানায়।
