ইউহাওয়ার ঠোঁটে মুচকি হাসির আভা খেলে যায়। পরিকল্পিত ভঙ্গিতে দুই ঠোঁটের ওঠা-নামায় সে আভা দ্যুতিময় হয়ে কণ্ঠকে মোহনীয় করে তোলে। এক অজানা আকর্ষণে উপস্থিত সকলেই ইউহাওয়ার কান্তিময় হুররূপী চেহারার দিকে অপলক নেত্রে চেয়ে থাকে। কারো চোখে পলক পড়ে না। ইউহাওয়া তার কাহিনী বলতে শুরু করে।
♣♣♣
কয়েক মাস পূর্বে মক্কা থেকে ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। ইউহাওয়া লাজ-শরমের মাথা খেয়ে বলতে থাকে যে, খালিদ, ইকরামা ও সফওয়ান-তিন প্রখ্যাত কুরাইশ সেনাপতিকে সে তার রূপ-যৌবনের জাদুতে পৃথক পৃথকভাবে বন্দি করতে চায়। তাদেরও পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ সৃষ্টির চেষ্টা করে কিন্তু তিনজনের কেউই তার জালে বন্দি হয় না। কাউকে সে ফুসলিয়ে প্ররোচিত করতে পারে না। তিন সেনাপতির অন্তরে কুরাইশ দলপতি ও সর্বাধিনায়ক আবু সুফিয়ানের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করারও জোর প্রয়াস চালায়।
ইউহাওয়া বলে–“কিন্তু খালিদ মানুষ নয়, পাথর। স্পষ্টভাবে সে আমাকে প্রত্যাখ্যানও করে না আবার ঐ আকর্ষণও দেখায় না, আমি যা কামনা করছিলাম। আমার বিশ্বাস, ইকরামা এবং সফওয়ানের উপর খালিদেরই প্রভাব রয়েছে। এই তিন সেনাপতি যুদ্ধ প্রেমিক। যুদ্ধ-বিগ্রহ বিনে তারা আর কিছুই বোঝে না। দ্বিতীয় কোন বিষয় চিন্তাও করেনা।”
ইউহাওয়া হাল ছাড়ে না। অব্যাহত রাখে তার চেষ্টা। খালিদ থেকে দ্রুত দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। কারণ তার মন-মানসিকতায় একমাত্র এ চিন্তা বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, মুসলমানদেরকে রণাঙ্গনে সরাসরি পরাস্ত করতে হবে এবং যুদ্ধবন্দী কিংবা লড়াইরত অবস্থায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হত্যা করতে হবে।
একদিন ইউহাওয়া মক্কা থেকে চার মাইল দূরের এক গ্রামে যায়। বিকেলে সেখান থেকে রওনা হয়। তার সাথে আরো দুইজন মেয়ে এবং তিনজন পুরুষ ছিল। এরা সবাই ইহুদী। দু’টি ঘোড়ার গাড়িতে সওয়ার হয়ে তারা ফিরে চলে। অর্ধেক রাস্তা যেতে না যেতেই ভয়াবহ সাইমুম শুরু হয়। এতে বালুর টিলাগুলো কমতে কমতে এক সময় অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। এ ঝড়ের গতি এতই তীব্রতর হয় যে, দেহের কোন স্থান খোলা থাকলে উৎক্ষিপ্ত বালু সেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আঘাত হানত। বালুকণা চামড়া ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করত। উট-ঘোড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে এদিক-ওদিক ছুটে পালাত।
দুনিয়া থেকে আসমান পর্যন্ত উঁচু একটি কৃত্রিম দেয়াল আচমকা উত্থিত হয়ে আঘাত হানে এবং প্রাচীরটি নিমিষে ইহুদীদের বহনকারী ঘোড়ার গাড়িটি ধ্বংস করে দেয়। আকাশ রক্তিম হয়ে ওঠে। সমুদ্রে সৃষ্ট তুফানের প্রবল তরঙ্গরাশি যেমন জাহাজের উপর আছড়ে পড়ে তাকে ডুবিয়ে দেয়ার উপক্রম করে, ঠিক তেমনি ঘুর্ণির প্রবল ঝাপটা শক্তিশালী থাবা হয়ে তাদের ভূপাতিত করতে থাকে। বালুর ঢিবিগুলোর মূলোৎপাটন করে চলে। মরুঝড় চলাকালে দাঁড়িয়ে থাকলে বিপর্যয় ডেকে আনে। বেলচা দ্বারা বালু নিক্ষেপ করলে যেমন বালুর স্তুপ জমে তেমনি উৎক্ষিপ্ত বালু গায়ে আছড়ে পড়ে নিচে পড়ে জমা হয়। এভাবে বালু জমতে জমতে অল্পক্ষণের মধ্যে সেখানে বালুর টিবি হয়ে যায়। মানুষকে কেন্দ্র করে এই স্তুপ গড়ে ওঠার কারণে সে ব্যক্তি কৃত্রিমভাবে তার মধ্যে জীবিতই দাফন হয়ে যায়। কিন্তু সে জীবিত থাকে না। বালুর চাপে দম আটকে মারা যায়।
“ঘূর্ণিঝড় আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসে।” ইউহাওয়া শোনায়– ঘোড়া ধূলিঝড় সহ্য করতে না পেরে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়। ঘূর্ণির দিকে মুখ করে ঘোড়াগুলো গাড়ি নিয়ে ছুটতে থাকে। এ পথে অস্বাভাবিক ছোট বড় গর্ত পড়ে। ঘোড়ার গাড়ি জোরে লাফিয়ে উঠে ঢুলতে থাকে। আরোহীও গাড়ি ঘোড়ার করুনার উপর উড়ে চলতে থাকে। গাড়ির ভিতরে এভাবে বালি বৃষ্টি হতে থাকে যে, নিজে নিজেকে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল না।…
“এক জায়গায় এসে গাড়ির এক পাশের চাকা গভীর গর্তে পড়ে যায়।” ইউহাওয়া একটু থেমে আবার সেই ভয়াল স্মৃতি মন্থন করে– “অথবা অন্য পাশের চাকা অস্বাভাবিক উঁচুতে উঠে যায়। গাড়ি এক দিকে এত উঁচু হয়ে যায় যে, কাত হয়ে উল্টে যাচ্ছিল। কিন্তু উল্টে না। তবে গাড়ি তীব্র ঝাঁকুনি খাওয়ায় উঁচু সাইড দিয়ে আমি বাইরে পড়ে যাই। গাড়ি নিজ গতিতে ছুটতে থাকে। গাড়ি থেকে পড়ে আমি গড়াগড়ি খেতে থাকি। এক সময় নিজকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াই এবং সাথিদের নাম ধরে ডাকতে থাকি। কিন্তু ঝড়ের তীব্র ঝাপটা এবং শো শো আওয়াজের কারণে আমার ডাক নিজের কান পর্যন্তই পৌঁছে না। সম্ভবত সাথিরা আমার পড়ে যাওয়া খেয়াল করতে পারেনি। আর খেয়াল করলেও কারো হিম্মত ছিল না যে, আমার নিঃসঙ্গতা দূর করতে সেও গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়বে।”….
“এমন ভীত-সন্ত্রস্ত আমি আর কোনদিন হইনি।” ইউহাওয়া চেহারায় কৃত্রিম উদ্বেগ সৃষ্টি করে বলে– “এবং এমন ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে পড়িনি। যেমনি ঝড় তেমনি অন্ধকার, চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমার আশেপাশে কোন রাস্তাও ছিল না। ঘোড়া মূল রাস্তা ছেড়ে যে এদিক-ওদিক চলছিল তাও আমার খেয়াল ছিল। আমি কোন উপায়ান্তর না করে কাপড়ে মুখ ঢেকে বাতাসের গতি লক্ষ্য করে চলতে থাকি। হাঁটছিলাম কিন্তু বাতাসের তীব্র দাপটে পা মাটিতে ঠিকমত রাখতে পারছিলাম না।”
