হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু’আ নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে আমর বিন আবদূদের সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ান।
“আবু তালিবের পুত্র!” আমর অশ্বপৃষ্ঠ থেকে সম্বোধন করে বলে– “তোমার কি স্মরণ নেই যে, তোমার পিতা আমার কত অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল? এটা কি অশোভনীয় নয় যে, আমি আমার প্রিয় বন্ধুর ছেলেকে নিজ হাতে হত্যা করব?”
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দেন– “পিতৃবন্ধু! বন্ধুত্বের পরিচয় অনেক পূর্বেই তো ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে। আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে একবারের জন্য এ সুযোগ দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহকে সত্য এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আল্লাহর রাসুল হিসেবে মেনে নিয়ে আমাদের হয়ে যাও।”
“তুমি একবার এসব উচ্চারণ করতে সুযোগ পেয়েছ।” আমর তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলে– “দ্বিতীয়বার এ কথা আমার কানে আর আসবে না। মনে রেখ, আমি সব সময় বলব, আমি তোমাকে কতল করতে চাইনি।”
কিন্তু আমি তোমাকে কতল করতে চাই, আমর!” হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার স্নেহসুলভ উক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেন– “অশ্ব থেকে নেমে আমার মোকাবিলায় আস। চেষ্টা করে দেখ, আল্লাহ্র রাসূলের তরবারি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পার কি-না?”
ঐতিহাসিকগণ আমরের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেন, সে ছিল বর্বর, জংলী। ক্রোধান্বিত হলে তার চেহারা বন্যজন্তুর ন্যায় হিংস্র ও অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত। সে অশ্ব থেকে লাফ দিয়ে নামে এবং মুহূর্তে তরবারি বের করে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এর উপর এত দ্রুত আক্রমণ করে যে, দর্শকরা এক প্রকার নিশ্চিত হয়ে যায় যে, তার তরবারি হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দু’টুকরো করে ফেলেছে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু সুকৌশলে এই মারাত্মক আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। প্রথম আঘাত অকল্পনীয়ভাবে ব্যর্থ হতে দেখে আমর প্রচন্ড ক্রোধে উপর্যুপরি হামলার পর হামলা চালাতে থাকে। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুও অপূর্ব রণকৌশলে নিজেকে রক্ষা করে চলেছেন। আমর বাস্তব এ দিকটা নিয়ে কখনো ভাবেনি যে, যে শরীর ও শক্তির উপর তার এত অহংকার তা সর্বত্র কাজে আসে না। তরবারি পরিচালনায় যে রকম দ্রুততা ও স্বাচ্ছন্দতা হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রদর্শন করে চলেছেন, তা আমরের দ্বারা কখনো সম্ভব নয়। কারণ আমরের তুলনায় হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দেহ ছিল হালকা এবং আকারে স্বল্প দৈর্ঘ্যের। আমর শক্তিবলে ঘোড়াকে কাঁধে উঠাতে সক্ষম হলেও ঘোড়ার গতি তার মধ্যে কখনো আসতে পারে না। এ বৈশিষ্ট্য একমাত্র ঘোড়ার। একজন মানুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, কৌশলের কাছে তার পরাজিত হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু আমরকে একটি আক্রমণও করেন না। আমর একে ‘ভীতির প্রভাব’ মনে করে। আমর সর্বোচ্চ শৌর্য প্রদর্শন করতে অবিরাম আঘাত করে চলে। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ধৈর্যের সাথে সুকৌশলে নিজেকে এদিকে ওদিকে ছুঁড়ে দিয়ে আত্মরক্ষার চরিত্রে অভিনয় করতে থাকেন। শক্তির মোকাবিলা অনেক সময় বুদ্ধির মাধ্যমে করতে হয়। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু দৈত্যকায় আমরের মোকাবিলায় এ কৌশল অবলম্বন করেন। তাই তিনি আক্রমণে না গিয়ে আত্মরক্ষার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমরকে ক্রমাগত মুক্ত আক্রমণের সুযোগ করে দেন। যাতে দৈত্যসদৃশ আমর উপর্যুপরি আক্রমণ করে অল্প সময়ের মধ্যে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে নিস্তেজ হয়ে যায়। নির্বোধ আমর এ চাল না ধরতে পেরে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে ঘূর্ণাবর্তের অতলতলে নিক্ষিপ্ত করতে থাকে। এক সময় চালাকীর জয় হয়, বিশাল শক্তি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
পরিখার ওপারে কুরাইশ সৈন্যরা হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অসহায়ত্ব দেখে এতক্ষণ হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ তাদের অট্টহাসি থেমে যায়। কারণ, দৈত্যসদৃশ আমর আক্রমণ করতে করতে এক সময় নিজেই থেমে যায়। অস্ত্র নিম্নমুখী করে কাষ্ঠের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। প্রচণ্ড হাফাচ্ছিল। হয়ত সে এ কারণে দারুণ বিস্মিত হয় যে, এত আক্রমণ সত্ত্বেও তার দেহের তুলনায় এক-বিশাংশ পরিমাণ ক্ষুদ্র দেহের অধিকারী এই যুবকটি প্রভাবিত হচ্ছে না। আমর বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন বুঝতে পারেন যে, আমর শরীরের সমস্ত শক্তি উপর্যুপরি আঘাত করে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দিয়েছে এবং এখন সিদ্ধান্তহীন হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। তখন তিনি সবাইকে হতবাক করে দিয়ে তরবারি একদিকে ছুঁড়ে ফেলে বিদ্যুৎ গতিতে আমরের দেহ জাপটে ধরেন এবং লাফিয়ে উঠে তার গর্দানকে নিজের বাহু বন্ধনে আটকে দেন। সাথে সাথে আমরের পায়ের সাথে নিজের পা লতার মত পেঁচিয়ে অভিনব কায়দায় তাকে ভূতলশায়ী করেন। আমর চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-তার বুকে চেপে বসেন।
শেষ মুহুর্তে আমর হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এর হস্তবন্ধন হতে গর্দান মুক্তির প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এর শক্তিশালী বাহুবন্ধন হতে সে গর্দানকে মুক্ত করতে পারেনি। এক সময় হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু গর্দান হতে এক হাত সরিয়ে নিজের কোমর থেকে খঞ্জর বের করে তার অগ্রভাগ আমরের শাহরগে চেপে ধরেন।
