হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “এখনও আমার আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনলে আমি তোমার প্রাণ ভিক্ষা দিব”
আমর যখন দেখে যে, সারা আরব তার যে শক্তির উপর গর্ববোধ করত, তা অর্থহীন হয়ে পড়েছে, তখন সে এই ঘৃণ্য আচরণ করে যে, বুকের উপর বসা হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চেহারা লক্ষ্য করে থু থু নিক্ষেপ করে।
দর্শকদের আরেকবার অবাক হবার পালা। সবার ধারণা হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খঞ্জর আমরের শাহরগ ভেদ করে দেহ থেকে গর্দান বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু না, সবাইকে হতবাক করে তিনি আমরের বুক থেকে নেমে আসেন। খঞ্জরকে খাপে পুরে দিয়ে হাত দ্বারা মুখমণ্ডল পরিষ্কার করেন। আমর হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হস্ত বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে এমনভাবে উঠে দাঁড়ায় যেন তার গায়ে শক্তি বলতে কিছুই নেই। শুধু আমরের নয়, বরং প্রতিটি দর্শকের ধারণা ছিল হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবার তাকে জীবিত রাখবেন না। কিন্তু তিনি কিছুই না বলে স্বাভাবিকভাবে পাশে সরে গিয়ে দাঁড়ান।
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর এ অবাক করা আচরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন– “আমর! মহান আল্লাহর নামে আমি তোমার সাথে জীবন-মৃত্যু পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিলাম। কিন্তু মুখে থু থু মেরে তুমি আমার অন্তরে ব্যক্তিগত শত্রুতার উদ্রেক করেছ। এখন তোমাকে কতল করলে সেটা হতো আমার ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে বদলা নেয়া। কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রুতার দরুণ আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না। কারণ, হতে পারে আমার আল্লাহ এ বদলা গ্রহণ সমর্থন করবেন না। প্রাণ ভিক্ষা দিলাম। নিরাপদে চলে যেতে পার।”
আমর পরাজয় মেনে নেয়ার মত লোক ছিল না। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম পরাজয়। তাই কোনভাবেই সে এটাকে মেনে নিতে পারে না। সে এরই মধ্যে পরাজয়কে জয়ে পরিণত করার ফন্দী করে। আমরকে চলে যেতে বলে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুও চলে যেতে উদ্যত হন। কিন্তু নরাধম আমর যায় না। সে অলক্ষ্যে তরবারি বের করে কাপুরুষোচিতভাবে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এই আচমকা হামলার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হেফাজতের জন্য দু’আ করেছিলেন। তাই একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন আমরের তরবারি এবং হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর গর্দানের মাঝখানে দু’চার আঙ্গুল ব্যবধান ছিল তখন হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু উদ্যত আঘাত সম্পর্কে জানতে পেরে দ্রুত ঢাল ধরেন। আমরের আঘাত এত প্রচণ্ড ছিল যে, তার তলোয়ার হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঢালকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে। ঢালের ভগ্নাংশ হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কানের কাছে মাথার উপর পড়ে। এতে আঘাতের স্থান হতে টপটপ করে রক্ত গড়িয়ে পড়ে।
আমর আক্রমণ করে ঢাল থেকে তরবারি ছাড়াচ্ছিল। ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তরবারি অতি দ্রুত খাপ মুক্ত হয়ে আমরের গর্দানের উদ্দেশ্যে জোর লাফ দেয়। জায়গা পেয়েই তরবারি কাজ শুরু করে। আমরের গর্দান কেটে যায়। গর্দান পুরোটা না কাটলেও শাহরগ ঠিকই কেটে যায়। আঘাতের প্রচণ্ডতায় আমরের তলোয়ার হাত থেকে ছিটকে দুরে পড়ে। তার শরীরও দুলতে থাকে। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু দ্বিতীয় কোন আঘাত করেন না। প্রথম আঘাতের ফলাফল দেখেই তিনি বুঝে গেলেন যে, এ আঘাতই যথেষ্ট। আমরের পা জড়িয়ে যায়। হাঁটু মাটিতে গিয়ে ঠেকে। এক সময় কাটা কলাগাছের ন্যায় মাটিতে আঁছড়ে পড়ে। মদীনার মাটি তার রক্ত চুষতে থাকে।
পরিখার ওপারে শত্রু-সৈন্যেদের মাঝে এমন পীনপতন নীরবতা নেমে আসে, যেন পুরো সেনাবাহিনী দাড়িয়ে থেকেই মারা গেছে। এর বিপরীতে পরিখার এপারে মুসলমানদের তাকবীরধ্বনি আকাশ-বাতাশ মুখরিত করে তোলে।
আরব নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে যায়। মুসলমানদের এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য ইকরামা এবং তার সহযোগীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কুরাইশদের ক্ষুদ্র দলটির জন্য লেজ খাড়া করে পালানো ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায় ছিল না। তারা প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে যুদ্ধ করতে থাকে। এই সংঘর্ষে কুরাইশদের একজন মারা যায়। ইকরামা পলায়নের জন্য পরিখা অভিমুখে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। পরিখা অতিক্রমের সুবিধার্থে ইকরামা বর্শা ফেলে দেয়। খালিদ বিন আব্দুল্লাহ নামক এক অশ্বারোহী পরিখা পার হতে পারে না। তার অশ্বটি পরিখার ওপারের কিনারার সাথে বড় ধরনের ধাক্কা খায়। অশ্ব তার আরোহীকে নিয়ে নিচে পতিত হয়। অশ্বারোহী নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে উপরে উঠার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিন্তু মুসলমানরা পাথর বর্ষণ করে তার জীবনলীলা সাঙ্গ করে দেয়। প্রস্তরাঘাতে জর্জরিত হয়ে সেখানেই সে মৃত্যুবরণ করে।
♣♣♣
যে স্থান দিয়ে পরিখা পার হওয়ার ঘটনা ঘটে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে জোরদার প্রহরার নির্দেশ দেন।
পরের দিন খালিদ অধীনস্থ বাহিনী হতে বাছাই করা কয়েকজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা নিয়ে পুনরায় পরিখা অতিক্রম করতে যাত্রা করে।
