“ইকরামা! অগ্র গিয়ে দাড়াও।”
ইকরামা পলকে ফিরে তাকায়। আমর বিন আবদূদের ঘোড়াকে বাতাসে উড়ে আসতে দেখে। আমর রেকাবে ভর দিয়ে সম্মুখের দিকে ঝুঁকে ছিল। কারো আশা ছিল না যে, বহু ওজনের আরোহীর ঘোড়াটি পরিখা পার হতে পারবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমরের অশ্বটিও ঐ স্থানে গিয়ে পড়ে যেখানে ইকরামার ঘোড়া পৌঁছেছিল। আমরের ঘোড়ার পাগুলো এমনভাবে ভাঁজ হয়ে পড়ে যে, ঘোড়া ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং একদিকে কাত হয়ে পড়ে যায়। আমর ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গড়াগড়ি খাওয়ার উপক্রম হয়। পরক্ষণেই ঘোড়া উঠে দাঁড়ায়। আমরও সোজা হয়ে দাঁড়ায় এবং চোখের পলকে ঘোড়ায় চেপে বসে।
আমরের পিছনে পিছনে ইকরামার আরো দু’অশ্বারোহী ঘোড়া নিয়ে উড়ে চলে। পরিখার কিনারায় এসে উভয় আরোহী নিজ নিজ ঘোড়ার পিঠ শূন্য করে দেয় এবং গর্দানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। উভয় ঘোড়া নিরাপদে পরিখা অতিক্রম করে।
কুরাইশ সৈন্যরা প্রাথমিক প্রচেষ্টার সফলতায় খুশিতে গগনবিদারী শ্লোগান দিতে থাকে। হঠাৎ শ্লোগান শুনে মুসলিম পাহারাদারগণ দৌড়ে আসেন। এরই মধ্যে ইকরামার আরো দু’টি আরোহী পরিখার পাড়ে এসে বাতাসের ভেলায় নিজেদেরকে ভাসিয়ে দেয়। এদের দেখাদেখি অবশিষ্ট সাত অশ্বারোহীর বাকীরাও নিজ নিজ ঘোড়া ছেড়ে দেয়। সকলে নিরাপদে পরিখা অতিক্রম করে।
ইকরামা মুসলিম প্রহরীকে ধমকের সুরে বলে– “থামো!” “আর কোন ঘোড়া পরিখা অতিক্রম করবে না। মুহাম্মাদকে ডাকো। তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বাহাদুরকে আসতে বল সে আমাদের কোন একজনকেও যদি পরাস্ত করতে পারে তাহলে বিনা যুদ্ধে আমাদেরকে হত্যা করার অধিকার তোমাদের থাকবে।… খোদার কসম! আমরা তোমাদের রক্ত এই তৃষ্ণার্ত বালুরাশিকে পান করিয়েই ফিরে যাব।”
♣♣♣
মুসলিম ক্যাম্পে হৈ চৈ পড়ে যায়। একটি কথা চারদিকে গুঞ্জন করে ফেরে– “কুরাইশ এবং গাতফানরা পরিখা অতিক্রম করে ফেলেছে।… মুসলমানগণ! তোমাদের পরীক্ষার সময় এসে গেছে।… হুশিয়ার… সাবধান… দুশমন চলে এসেছে।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে উৎকণ্ঠিত হতে দেন না। তিনি দেখেন যে, কুরাইশরা পরিখার ওপারে দাঁড়িয়ে অট্টহাসি হাসছে আর চটকদার উক্তি এবং কৌতুক করছে। ইকরামা ও তার সৈন্যদের দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে যান। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুও তার সাথে ছিলেন। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারেন যে, ইকরামা মল্লযুদ্ধ করতে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আসতে দেখে আমর বিন আবদুদ ঘোড়া সম্মুখে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আমর চিৎকার করে বলে– “হুবল এবং উযযার কসম! তোমাদের মধ্যে এমন একজনও দেখছি না যে আমার সাথে লড়তে সক্ষম।”
ঐতিহাসিক আইনী রাহিমাহুল্লাহ প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে লিখেন, মুসলমানদের নীরবতা সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে, তারা আমর-ভীতিতে কম্পমান। কারণ, আমরের বিশাল দেহ এবং প্রচুর শক্তির এমন এমন ঘটনা আরবের সকলের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিল যে কারণে সবাই তাকে মানুষ নয়, অসুর শক্তির অধিকারী বলে বিশ্বাস করত। এ কথা সবাইকে বলতে শুনা যায় যে, আমর শক্তিশালী ঘোড়াকে পর্যন্ত অতি সহজভাবে কাঁধে তুলতে পারে এবং পাঁচশ অশ্বারোহীকে সে একাই পরাজিত করতে পারে। তার ব্যাপারে সকলেরই এই বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, অদ্যাবধি তাকে কেউ পরাস্ত করতে পারেনি আর অদূর ভবিষ্যতেও পারবে না।
আবু সুফিয়ান ভগ্নহৃদয়ে পরিখার কিনারে দাঁড়িয়ে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিল। খালিদ এবং সফওয়ানও অপলক নেত্রে তাকিয়েছিল। গাতফান, আইনিয়া এবং তার অধীনস্থ সমস্ত সৈন্য ওপারের প্রতিটি দৃশ্য অবলোকন করতে থাকে। সকলের মাঝে শুনশান নীরবতা। এপারে যেন কবরের নিস্তব্ধতা। গভীর উৎকণ্ঠার ছাপ ছিল কেবল হযরত নু’আইম বিন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চেহারাতে। ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি ছিলেন বোবা, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে অসহায় ভঙ্গিতে অমুসলিম সৈন্যদের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনিও সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলেন ওপারের শাসরুদ্ধকর প্রতিটি দৃশ্যের প্রতি।
“আমি জানি, তোমাদের কেউ আমার মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে সাহস করবে না।” আমরের আহ্বানে কেউ সাড়া না দেয়ায় সে নিজে বুক চাপড়িয়ে গর্ব করে বলতে থাকে।
পরিখার ওপারে হাসির রোল পড়ে যায়।
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু অনুমতি পাবার আশায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে চান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মনোভাব বুঝতে পেরে স্বীয় পাগড়ী মাথা হতে খুলে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাথায় স্বহস্তে বেঁধে দেন। নিজের তরবারিটিও হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে তুলে দেন। ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ লিখেন, এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জবান মুবারক থেকে বের হয়– “আলীর সাহায্যকারী একমাত্র তুমিই হে আল্লাহ।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে প্রদত্ত তরবারি সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ লিখেন, কুরাইশের বিখ্যাত যোদ্ধা মুনাব্বেহ বিন হাজ্জাজের তরবারি ছিল এটি। বদর যুদ্ধে সে নিহত হয়। বিজয়ী মুজাহিদগণ তরবারিটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রদান করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর থেকে সর্বদা নিজের সাথে এই তরবারিটিই রাখতেন। এখন সে তরবারিটি হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দিয়ে আরবের এক দৈত্যের মোকাবিলায় প্রেরণ করেন। ইতিহাসে এ তরবারিটি ‘জুলফিকার’ নামে প্রসিদ্ধ।
