ইকরামা বলে– “বড় কষ্টে হস্ত সংবরণ করেছি, তার সাথে আমাদের যে চুক্তি হয়েছিল তা ভেঙ্গে দিয়ে এসেছি।”
আবু সুফিয়ান অনেকটা ধরা গলায় বলে– “তুমি ঠিকই করেছ, তুমি ঠিক কাজই করেছ।” তারপর সে দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়।
এ ঘটনা বেশি দিনের নয়। আনুমানিক দেড়-দুই বছর আগের ঘটনা। তার পরও আজ মদীনায় যাবার কালে তার নিকট চির চেনা পথ-ঘাটগুলো কেমন যেন অচেনা মনে হয়। এমনকি মাঝে মধ্যে তার নিজেকেও নিজের কাছে অচেনা মনে হয়। আনমনা হয়ে পথ চলতে থাকেন। আবু সুফিয়ানের সেদিনের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ চেহারা এ সময় তাঁর নয়ন তারায় ভেসে ওঠে। খালিদ সেদিন আবু সুফিয়ানের প্রস্থানের অবস্থা দেখে অনুধাবন করেন যে, আবু সুফিয়ান মদীনায় আক্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সে চলে যাবার পর খালিদ এবং ইকরামা সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
মাথা উঁচিয়ে ইকরামা এক সময় জানতে চায় কি চিন্তা করছ খালিদ? এ কথা বললে আমাকে দোষারোপ করবে যে, আবু সুফিয়ান গোত্রপ্রধান বলেই তার উপস্থিতি ও নির্দেশ এখনও আমি মেনে চলছি?” খালিদ সায় পাওয়ার জন্য ইকরামার দিকে চেয়ে বলেন– “আবু সুফিয়ান থেকে অধিক ভীরু ও কাপুরুষ নেতা কুরাইশরা কখনো পায়নি আর পাবেও না। কখনো তুমি জানতে চেয়েছ আমি কি ভাবছি। আমি আর বেশি বিলম্ব করতে পারছি না। আমি পরিখার এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত ঘুরে ঘুরে দেখেছি। পরিখার এক স্থান যেমনি সংকীর্ণ তেমনি অগভীর। এ স্থান দিয়ে পরিখা পার হওয়া যাবে বলে মনে হয়। তুমি আমার সাথে থাকলে এখনই ঐ স্থান দিয়ে কয়েকজন অশ্বারোহীকে পরিখা অতিক্রম করাতে চাই। আবু সুফিয়ান কোন গায়েবী সহযোগিতার অপেক্ষা করতে চাইলে থাকুক।”
ইকরামা উৎসাহিত কণ্ঠে বলে– “আমি তোমার পাশে কেন থাকব না খালিদ? আমার দ্বারা মুসলমানদের ঐ অট্টহাসি সহ্য করা সম্ভব হবে না, যা তারা যুদ্ধ ছাড়াই আমাদের পিছপা হবার কালে দিতে থাকবে। চল, আমি তোমার সাথে আছি।”
জুবাব পাহাড়ের পশ্চিমে এবং সালা পাহাড়ের পূর্বে ছিল ঐ সংকীর্ণ জায়গাটি। এখানে পরিখার প্রস্থ এতটুকু ছিল যে, তাজি ঘোড়ার পক্ষে তা লাফিয়ে অতিক্রম করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন কেবল বীর-যোদ্ধা বাছাই করা। পদাতিক সৈন্য পরিখা নেমে ওপারে যাওয়া অসম্ভব। তবে এর আশে পাশেই মুসলমানরা তাঁবু ফেলে আছে।
খালিদ দুর থেকে আলোচিত জায়গাটি ইকরামাকে দেখান।
“সর্বপ্রথম আমার অশ্বারোহী বাহিনী পরিখা পার হবে।” ইকরামা বলে– “তবে এখনই আমি পুরো বাহিনীকে অতিক্রম করাব না। ওপারে গিয়ে মুসলমানদের একজনের মোকাবিলায় একজনকে আহ্বান করব। তারা এ পন্থার ব্যতিক্রম করবে না। আমার সাথে এসো খালিদ! আমি বাছাই করা অশ্বারোহী নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হব। তুমি এখনই পরিখা অতিক্রম করবে না। আমরা উভয়ে নিহত হলে কুরাইশদের ভাগ্যে পরাজয়ের তিলক ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। আবু সুফিয়ান বলতে গেলে অবরোধ তুলেই নিয়েছে। এখন শুধু ঘোষণা দেয়াটা বাকী। যুদ্ধের প্রেরণা তার সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে গেছে।
যে স্থান দিয়ে ঘোড়া লাফ দিয়ে কোন মতে ওপারে যাবার সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা চলছিল, তা এমন স্থানে অবস্থিত ছিল যে, টহলদার রক্ষী অতি নিকটে এসে স্থানটি দেখে যেতে পারত। ইকরামা দেখে শুনে সাত অশ্বারোহী বাছাই করে। এর মধ্যে বিশাল বপুধারী এবং দৈত্য সমতুল্য আমর বিন আবদূদও ছিল। বিশালকায় দেহের কারণে তার নাম যশ দূর-দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। ইকরামা বাছাইকৃত সাত অশ্বারোহীকে নির্ধারিত স্থানের অনতি দূরে নিয়ে গিয়ে এমনভাবে স্থানটি পর্যবেক্ষণ করায়, যেন তারা টহলে কোনরূপ সন্দেহের সৃষ্টি করেনি।
“প্রথমে পরিখা অতিক্রম করব আমি।” ইকরামা হাঁটতে হাঁটতে সাত অশ্বারোহীকে তার পরিকল্পনা জানায়।
“সর্বপ্রথম আমার ঘোড়া অতিক্রম করাই কি উচিত হবে না?” আমর বিন আবদুদ আবেগের সাথে বলে।
“না, আমরা ইকরামা তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলে– “প্রথমে আমি যাব। আমার ঘোড়া যদি পরিখার ভিতর পড়ে যায়, তাহলে তোমাদের কেউ পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা করবে না। প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় তো তোমাদের সেনাপতিই দিবে।”
এ কথা বলেই ইকরামা ঘোড়ার লাগামে একটা ঝটকা টান মারে। ঘোড়া পরিখামুখী হওয়া মাত্রই ইকরামা ঘোড়ায় জোরে পদাঘাত করে। আরবি জাতের উন্নত ঘোড়া বাতাসের গতিতে চলতে থাকে। ইকরামা লাগাম আরো ঢিল করে দেয় এবং চলতি ঘোড়ায় আবার পদাঘাত করে কষে। ঘোড়ার গতি অস্বাভাবিক দ্রুততর হয়। পরিখার কিনারে গিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে ইকরামা উচু হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ঘোড়া নিজেকে হাওয়ায় ছুঁড়ে দেয়। ওপারের উদ্দেশে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। খালিদ দূরে দাঁড়িয়ে ইকরামার পরিখা অতিক্রম করার দৃশ্য দেখছিলেন। কুরাইশদের বহু সৈন্যও দর্শকের কাতারে এসে দাঁড়ায়। ইতিহাসও বিস্ময় নেত্রে চেয়ে থাকে।
ঘোড়ার সম্মুখের পা পরিখার ওপার কিনারার সামান্য আগে এবং পিছনের পা ঠিক কিনারায় গিয়ে পড়ে। ঘোড়া অতি দ্রুত গতিতে জোরে সম্মুখে এগিয়ে যায়। ঘোড়ার সম্মুখের দুই পা ভাঁজ হয়ে ডবল হয়ে যায়। তার মুখ মাটিতে আছড়ে পড়ে ইকরামা পড়তে পড়তে বেঁচে যায়। ঘোড়া দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়। ইকরামাও নিজেকে সামলে নেয়। এ মুহূর্তে পেছন দিক হতে একটি দ্রুততম কণ্ঠ তার কানে ভেসে আসে।
