ইতোমধ্যে ইকরামা কা’বের মনোভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যায়। কা’ব শরাব গিলে চলছিল। ইকরামা শরাব স্পর্শ করতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। সে আবু সুফিয়ানকে বলে গিয়েছিল যে, চুড়ান্ত ফায়সালা করেই সে ফিরবে।”
“তুমি কাল আক্রমণ কর অথবা একদিন পর কর সর্বাবস্থায় তোমাদের ইচ্ছার বাস্তব প্রতিফলন দেখার পরেই আমরা চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিব যে জামিন হিসেবে আমাদের লোক তোমাদেরকে দেয়া যায় কি-না!” ইকরামা বলে।
আমার কথাও বলে দিয়েছি যে, জামিন না পেলে আমি কিছুই করব না।” কা’ব পাল্টা হুমকির সুরে বলে– “তোমাদের লোক আমাদের হাতে এলেই আমরা তোমাদের কথায় মদীনার অভ্যন্তরে গণ্ডগোল সৃষ্টি করব। তোমরা দেখবে, মুহাম্মাদের পিঠে কিভাবে একটার পর একটা ছুরি বিদ্ধ হয়।”
ইকরামা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং রাগতস্বরে বলে– “তোমার মনে দুরভিসন্ধি আছে। তা না হলে বলতে, আমার কোন জামানতের দরকার নেই। এসো, সবাই মিলে মদীনাতেই মুসলমানদের কবর রচনা করি।”
কারো নির্দেশই যদি আমাকে মেনে চলতে হয় তাহলে মুহাম্মাদের নির্দেশ মেনে চলাকেই আমি ভালো মনে করি।” কা’ব ইকরামার রাগকে আমলে না এনে পাল্টা ঘোষণা করে বলে– “মুসলমানদের সাথেই আমাদের চলাফেরা। তারা আমাদের নিরাপত্তা দিতে যতটুকু সক্ষম, তোমাদের পক্ষে তা দেয়া সম্ভব নয়।”
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম এবং ইবনে সা’দ লিখেন, হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিক্ষিপ্ত তীর অভিষ্ঠ লক্ষ্যে গিয়ে আঘাত হানে। আর এ সবই ছিল তার কার্যকর প্রতিক্রিয়া। ইকরামা রাগান্বিতভাবেই কা’বের ঘর থেকে বের হয়। এভাবে কা’বের ঘরের ভিতরেই ঐ চুক্তির মৃত্যু ঘটে, ইহুদীবাদ ও কুরাইশদের মধ্যে যা বাস্তবরূপ পেলে মুসলমানদের কোমর ভেঙ্গে দিত। ইহুদীদের গুপ্ত হামলা যে অবস্থার সৃষ্টি করত, তা সামাল দেয়া মুসলমানদের পক্ষে সম্ভব ছিল কি-না তা আল্লাহই ভাল জানেন। কূটনৈতিকভাবে তারা এক মহাবিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়।
♣♣♣
এদিকে ইকরামা যখন কা’ব বিন আসাদের বাসভবনের উদ্দেশে চলছে ওদিকে হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন গাতফান গোত্রের সর্দারের নিকট বসা। কা’ব সংশ্লিষ্ট যে তথ্যের মাধ্যমে আবু সুফিয়ানকে উত্তেজিত করেন, গাতফান সর্দারের কানেও সে তথ্যগুলো পৌঁছেছে। গাতফান সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে সঙ্গে সঙ্গে সেনাপতি আইনিয়াকে ডেকে পাঠায়।
“শুনেছ, কা’ব আমাদের কিভাবে প্রতারণা করছে?” গাতফান আইনিয়াকে বলে– “সে জামানত হিসেবে আমাদের নেতৃত্বস্থানীয় লোক চায়। এটা আমাদের অপমান নয়?”
সেনাপতি আইনিয়া বলে– “শ্রদ্ধাভাজন নেতা!” “আমি আপনাকে আগেও বলেছি, যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়েই শুধু আমার সাথে আলোচনা করবেন। আমি শুধু সামনা-সামনি যুদ্ধ করতে জানি। আমি তাকে ঘৃণা করি, যে পেছন দিকে হতে আক্রমণ করে। তার প্রতিও আমার ঘৃণা, যে এভাবে পিঠে আক্রমণের সুযোগ করে দেয়। এত কিছুর পরও আপনি ইহুদীদের উপর আস্থা রাখতে চান? যদি কা’ব বিন আসাদ দাবি করে বসে যে, জামানত হিসেবে গাতফান গোত্রপ্রধানকে দিতে হবে, তবে কি আমি আপনাকে তার হাতে তুলে দিব?”
“কেউ এ রকম দাবি করলে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে এরূপ বলেন– “আমি ইহুদীদেরকে জামানত হিসেবে মানুষ তো দূরের কথা একটি ভেড়া-বকরীও দিব না। খোদার কসম! কা’ব অবশ্যই আমাদেরকে অপমান করেছে।”
“আবু সুফিয়ানের মনোভাব কী?” গাতফান হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে প্রশ্ন করে।
“ঘটনা শুনে আবু সুফিয়ান তো রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে কাঁপতে থাকে।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “আবু সুফিয়ান কা’ব এর নিকট থেকে এই অপমানের প্রতিশোধ লওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।”
“তাকে প্রতিশোধ লওয়াই উচিত।” সেনাপতি আইনিয়া বলে– “বনু কুরাইযার অবস্থান এমন আর কি! আমাদের এবং মুসলমানদের মাঝখানে চাপা পড়ে এমনভাবে পিষ্ট হয়ে যাবে যে, আরব ভূমি হতে তাদের নাম-নিশানা সম্পূর্ণ মুছে যাবে। পাওয়া যাবে না তাদের অস্তিত্ব খুঁজে।”
মদীনায় চলতি পথে খালিদের সুস্পষ্ট মনে পড়ে ঐ সময়ের কথা যখন ইকরামা বনু কুরাইযা হতে ফিরে এসেছিল। তিনি খুব দ্রুত তার কাছে যান।
এদিকে আবু সুফিয়ানও ঘোড়া ছুটিয়ে ইকরামার কাছে আসে। ইকরামার চেহারায় ছিল ক্রোধ এবং বিষন্নতার গভীর ছাপ।”
“বল কি খবর।” আবু সুফিয়ান দূর থেকেই তার কাছে জানতে চায়।
“খোদার কসম!” ইকরামা অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নামতে নামতে বলে– “কা’বের চেয়ে জঘন্য কোন মানুষ ইতোপূর্বে আমি দেখিনি। নু’আইমের রিপোর্ট সর্বাংশে সত্য।”
“জামানত হিসেবে আমাদের লোকের দাবি কি পুনরায় সে উত্থাপন করেছে?” কথার ফাকে খালিদ জিজ্ঞাসা করেন।
“হ্যাঁ, খালিদ!” মাথা নেড়ে ইকরামা বলে– “সে আমার সম্মুখে মদ পেশ করে এবং এমনভাবে কথাবার্তা বলে আমরা যেন তার কাছে ঋণী। সে স্পষ্টভাবে বলে যে, আগে জামানত হিসেবে লোক পাঠাও তারপরে আমি মদিনাতে গুপ্ত হামলা করব।”
“তাকে বলে এলে না কেন যে, কুরাইশদের তুলনায় বনু কুরাইযার অবস্থান উটের সাথে ইদুর যেমন।” খালিদ বলেন– “তার মাথা দেহ থেকে কেন বিচ্ছিন্ন করে দিলে না?”
