“আমি নিজেই যাব।” ইকরামা বলে– “আমি এটাও বলে যাচ্ছি যে, কা’ব যদি আমার নিকটও জামিনের শর্ত করে, তাহলে আমি আপনার কাছে দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা না করেই চুক্তি বাতিল করে দিব।”
ইকরামার সাথে কি আমিও যাব?” খালিদ অনুমতি প্রার্থনার সুরে আবু সুফিয়ানের কাছে জানতে চান এবং বলেন– “তার একাকী যাওয়া ঠিক হবে না।”
“না।” আবু সুফিয়ান দৃঢ়তার সাথে জানান– “বিপদের মুখে একই সাথে দুই সেনাপতিকে আমি পাঠাতে পারি না। ইকরামা আত্মরক্ষার যত সৈন্য চায় নিয়ে যেতে পারে।”
তৎক্ষণাৎ ইকরামা রওনা হয়ে যায়। সাথে ছিল চার হাজার বডিগার্ড। অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে তাকে বনু কুরাইযার পল্লীতে পৌঁছতে হয়। ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ মার্চ জুমাবার। অনেক কষ্টে পাহাড়ের পর পাহাড় মাড়িয়ে ইকরামা কা’ব বিন আসাদের বাড়ীতে পৌঁছে। ইকরামাকে দেখেই কা’ব তার আগমনের কারণ বুঝে ফেলে।
“এস ইকরামা!” কা’ব বিন আসাদ বলে– “তোমার আগমনের কারণ আমি জানি, কষ্ট করে তোমার আসার প্রয়োজন ছিল না। আমি তো দশ দিনের সময় চেয়ে নিয়েছি।”
কা’ব এক গোলামকে ডাক দেয়। গোলাম এলে তাকে মদ এবং মদের ভাণ্ড আনতে বলে।
“আগে আমার কথা শোন কাব।” ইকরামা সিদ্ধান্ত জানানোর ভাষায় বলে– আমি মদ পান করতে আসিনি। অতি সত্বর আমাকে ফিরে যেতে হবে। অবরোধ দীর্ঘায়িত করা আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা আগামী কালই মদীনা আক্রমণ করব। তুমি আমাদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট স্থানে বিশেষ সৈন্যদের উপর কাল থেকেই হামলা শুরু কর। আমাদের এ কথাও জানা আছে যে, তুমি বাহ্যিকভাবে আমাদের চুক্তি করেছ কিন্তু মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তি গোপনে ঠিকই রেখেছ।”
এরই মধ্যে ডানাকাটা পরীরমত এক রূপসী ললনা শরাবের বোতল এবং পানপাত্র নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। ইকরামাকে দেখে মেয়েটি মুচকি হাসে। ইকরামা তাকে দেখলে তার চেহারায় গাম্ভীর্যের ছাপ আরো গাঢ়ভাবে পড়ে।
ইকরামা চড়া গলায় বলে– “কা’ব” “ভিত্তিহীন ও দু’দিনের এ সমস্ত বস্তুর বিনিময়ে তুমি নিজ ধর্ম ও জবান বিক্রি করে দিয়েছ?”
এ সময়ে কা’ব বিন আসাদের ইঙ্গিতে মেয়েটি ভিতরে চলে যায়।
“ইকরামা!” কা’ব বলে– “আমি তোমার চেহারাতে মনিবসুলভ ভাব দেখছি। মনে হচ্ছে, গোলাম ভেবে তুমি আমাকে নির্দেশ দিতে এসেছ। মুসলমানদের সাথে আমাদের চুক্তি হয়েছিল বনু কুরাইযার নিরাপত্তার স্বার্থেই। আর তোমাদের সাথে আমার চুক্তি হয়েছে তোমাদের বিজয় আর মুসলমানদের পরাজয়ের জন্য। মুসলমানদের নিপাত করা আমার ধর্মীয় নির্দেশ। তোমাদের সাথে চুক্তি করা এ ধারাবাহিকতারই একটি চেষ্টা মাত্র। নিজের ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে আমি তোমাদের ব্যবহার করব। হুয়াই বিন আখতাবকে আমি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি, গাতফান এবং কুরাইশরা যেন বনু কুরাইযার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। যাতে এমন পরিস্থিতি না হয় যে, তোমরা ব্যর্থ হয়ে চলে যাবে আর মুসলমানরা আমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবে।
হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু দু’পক্ষের মধ্যে যে অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেন, তা ইকরামার হৃদয়ে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক আবু সুফিয়ানের মাধ্যমে আগেই ইকরামাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, কা’ব জামানত পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই কা’বের মুখ থেকে ‘জামানত’ শব্দ বের হওয়া মাত্রই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
“আমাদেরকে বিশ্বাস কর না?” ইকরামা গর্জে উঠে বলে– “তুমি কি মনে করছ যে, আমরা হয়ত ভুলে গেছি যে, মুহাম্মাদ আমাদের এবং তোমাদের দুশমন?”
কা’ব বলে– “আসলে তুমি যেটা বলছ তা আমার কথা নয়, তবে একথা অবশ্যই সত্য যে, আমাদের সম্মিলিত দুশমনকে যতটুকু আমরা জানি তোমরা ততটুকু জান না। আমি মেনে নিতে বাধ্য যে, আল্লাহ মুহাম্মাদকে যে অসাধারণ মেধা দান করেছেন, তা আমাদের কারো নেই।… আমার স্পষ্ট কথা, আমি জামানত চাই।”
“বল, কোন ধরনের জামানত তোমার চাই?” ইকরামা রাগতকণ্ঠে জিজ্ঞেস করে।
“কুরাইশ এবং গাতফান গোত্রের কয়েকজন নেতা আমাদের এখানে পাঠিয়ে দাও।” কা’ব জামানতের ব্যাখ্যা দিয়ে বলে “ইকরামা! এটা কোন নতুন কথা নয়। এটা তো পূর্ব নিয়ম। এ রীতি এবং শর্ত সম্পর্কে তোমরা ভাল করে জান। আমি জামানতের জন্য দাবিকৃত লোকের সংখ্যা বলিনি। সংখ্যা নির্ণয় করা তোমাদের উপরেই রইল। তোমরা ভাল করেই জানো যে, চুক্তির বিপরীত কোন কিছু করলে আমরা তোমাদের এ নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে হত্যা করে ফেলব।”
ইকরামা উত্তেজনা মিশ্রিত কণ্ঠে বলল–“তাদেরকে তোমরা হত্যা করবে না, তুমি তাদেরকে মুসলমানদের হাতে দিয়ে দিবে।”
ইকরামা একি বলছ।” কা’ব গভীর উৎকণ্ঠা আর বিস্ময় নিয়ে বলে– “তুমি আমাকে এতই হীন ভেবেছ যে, প্রতারণা করে আমি তোমাদের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে মুসলমানদের হাতে হত্যা করাব? আমার উপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পার।”
“ইহুদীদের উপর আস্থা রাখা আর সাপের উপর আস্থা রাখা একই কথা।” ইকরামা চাপা ক্ষোভের সাথে বলে– “নিজেকে এত বিশ্বস্ত মনে করলে কালই মদীনার ঐ ছোট কেল্লায় হামলা করে দেখাও তো, যেখানে মুসলমানদের মহিলা ও শিশুরা অবস্থান করছে?”
“কাল!” কা’ব কপালে চোখ তুলে বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে– “কাল সাপ্তাহিক সুনির্দিষ্ট দিন। এটি ইহুদীদের নিকট অত্যন্ত পবিত্র দিন। ইবাদত করা ছাড়া দ্বিতীয় কোন কাজ আমরা এ দিনে করি না। কোন ইহুদী সাবতের দিন কোন কাজ অথবা কারবার করলে কিংবা কারো উপর চড়াও হলে ইহুদীদের খোদা ঐ ব্যক্তিকে শূকর বা বানরে পরিবর্তন করে দেন।”
