আবু সুফিয়ান উত্তেজিত কণ্ঠে বলে– “খোদার কসম নু’আইম! তোমার তথ্য সত্য প্রমাণিত হলে বনু কুরাইযার বস্তি সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করে দেব। কা’ব বিন আসাদের লাশ আমার ঘোড়ার পেছনে বেঁধে ছেঁচরিয়ে ছেঁচরিয়ে মক্কায় নিয়ে যাব। কোন দিবাস্বপ্নে সে আমাদেরকে ধোঁকা দেয়ার দুঃসাহস করল?
“মদ এবং রূপসী রমনীর জাদুতে আপনিই তার চিন্তাজগৎ ঢেকে দিয়েছেন।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু একটু শ্লেষের সাথে বলেন– “মদ এবং নারী কাউকে কখনো আন্তরিকতা ও সততার উপর অটল থাকতে দেয়?”
“মদ এবং নারী কে তাকে দিয়েছে?” আবু সুফিয়ান অবাক হয়ে জানতে চায়– “হতভাগা কা’বের কি এতটুকু বোধ শক্তি নেই যে, আমি তার সাথে যে চুক্তি করেছি এতে তার জাতি ও ধর্মের নিরাপত্তা নিহিত? যদি মুহাম্মাদের ধর্ম বর্তমান গতিতে ছড়াতে থাকে তাহলে ইহুদীবাদ খতম হতে বাধ্য।”
হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু মুখে গাম্ভীর্য টেনে বলেন– “ইহুদীদেরকে তোমরা এখনও চেননি, দুশমনদের কাছেও তারা তাদের দুশমনি প্রকাশ হতে দেয় না।… হুয়াই বিন আখতাবও একজন ইহুদী। সেই তোমাদের পক্ষ থেকে কা’বকে মদের সুরাহী এবং দুই রূপসী যুবতী সরবরাহ করেছে। আমি যখন কা’বের সাথে দেখা করতে যাই, তখন সে পূর্ণ মাতাল এবং তার দুই পাশে দুই নারী বিবস্ত্র অবস্থায় ছিল। সে নেশার ঘোরে আমাকে বলে, সে নাকি কুরাইশদেরকে আঙ্গুলের মাথায় নিয়ে নাচাচ্ছে।”
আবু সুফিয়ান তরবারির বাটে হাত রেখে বলে– “নু’আইম।” “আমি মদীনা থেকে অবরোধ তুলে নিয়ে বনু কুরাইযার মূলোৎপাটন করব। তার এ সাহস কিভাবে হল যে, সে কুরাইশ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে জামিন হিসেবে পেতে চায়!”
হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “আবু সুফিয়ান! এভাবে উত্তেজিত হয়ো না, ধীর-স্থির ও সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা কর এবং এ দৃঢ় সিদ্ধান্ত নাও যে, জামিন হিসেবে এক ব্যক্তিকেও কা’বের নিকট পাঠাবে না।”
আবু সুফিয়ান দৃঢ়তার সাথে বলে– “আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, মদীনাবাসী সম্পর্কে কোন তথ্য দিতে পার? তারা কোন অবস্থায় দিন অতিবাহিত করছে? আর কতদিন তাদের পক্ষে ক্ষুধা-তৃষ্ণার যাতনা সহ্য করা সম্ভব?”
আবু সুফিয়ানের দুর্বল পয়েন্টে আঘাত হানার উপযুক্ত সুযোগ হাতে এসে যায় হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর।
“আমি সত্যিই হতবাক আবু সুফিয়ান!” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু কপালে কৃত্রিম ভাঁজ সৃষ্টি করে বলেন– “দীর্ঘ অবরোধ সত্ত্বেও মদীনাবাসী হাস্যোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত তাদের মধ্যে ক্ষুধার কোন নিদর্শন নেই। খাদ্যের স্বল্পতা অবশ্যই আছে, তবে মদীনাবাসীর প্রেরণা ও জযবা এত তীব্র যে, এটা কোন ব্যাপারই নয় এবং খাদ্যের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই তাদের।”
“এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আমাদের অবরোধ তাদের মধ্যে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি।” আবু সুফিয়ান হতাশার সুরে বলে।
“একদম না।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু হতাশার পরিধি বৃদ্ধি করতে আরো সংযোগ করে বলেন– অবরোধের ফলে তাদের উপর এই লাভ হয়েছে যে, তাদের প্রত্যেকেই এখন জযবা ও প্রেরণায় সমৃদ্ধ এবং ভরপুর।
“অথচ আমাদের ইহুদী গুপ্তচরদের রিপোর্ট হলো, মদীনার খাদ্যশস্য প্রায় নিঃশেষের পথে।” আবু সুফিয়ান হাল্কা উদ্বেগের সাথে বলে।
“তারা মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে আরো উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দিয়ে বলেন– আমি আবারও সতর্ক করছি যে, ইহুদীদের উপর বিশ্বাস করা মোটেও ঠিক হবে না। মুসলমানদের অবস্থা ভাল নয়’– এই তথ্য প্রচার করে তারা তোমাদের উত্তেজিত করতে চায়। যেন মুসলমানদেরকে দুর্বল ভেবে তোমরা পরিখা পার হয়ে মদীনা আক্রমণ কর। তারা মূলত সুকৌশলে এক ঢিলে দুই পাখী শিকার করতে চায়। কুরাইশ এবং আমার গোত্র গাতফানকে মুসলমানদের হাতে ধ্বংস করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।”
“আমি তাদের উদ্দেশ্য পুনরায় যাচাই করে দেখছি।” আবু সুফিয়ান এ কথা বলে এক গোলামকে আসতে বলে।
আগত গোলামের উদ্দেশে আবু সুফিয়ান নির্দেশের সুরে বলে– “ইকরামা এবং খালিদকে ডেকে আন।”
“যাই, গাতফান গোত্রপ্রধানকে খবরটা জানিয়ে আসি।” একথা বলে হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখান থেকে প্রস্থান করেন।
খালিদ এবং ইকরামা আসার পর আবু সুফিয়ান হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত কা’ব বিন আসাদ সংশ্লিষ্ট সকল ঘটনা খুলে বলে।
খালিদ বলেন– আবু সুফিয়ান! অন্যের ভরসায় আর যা কিছু হোক যুদ্ধ করা যায় না।” “আপনি এ দিকটি কখনো ভাবেন নি যে, বনু কুরাইযা মুসলমানদের ছায়াতে আছে। তারা আন্ডারগ্রাউন্ড দিয়ে মুসলমানদের উপর হামলা করতে পারে। কিন্তু মুসলমানদের করুণার উপরই যে তারা বেঁচে আছে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। আপনি যুদ্ধ করতে এসে থাকলে একজন যোদ্ধার মতই যুদ্ধ চালিয়ে যান।”
“এ মুহুর্তে তোমাদের যে কোন একজন কা’ব বিন আসাদের কাছে যাওয়া কি সঙ্গত নয়?” আবু সুফিয়ান জানতে চায়– নু’আইমের নিকট জামিনের কথা বললেও তোমরা গেলে হয়ত তা বলবে না।… সৈন্যদের ক্ষুধার্ত অবস্থা দেখছ না? এমতাবস্থায় তাদের পক্ষে পরিখা অতিক্রম করা কি সম্ভব? এখন সঙ্কট নিরসনের এটাই একমাত্র উপায় যে, কা’ব মদীনার অভ্যন্তরে মুসলমানদের উপর গেরিলা আক্রমণ করবে।”
