হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করেন– “তুমি আমাকে চেন কা’ব?”
“নু’আইম বিন মাসউদকে কে না চেনে?” কা’ব বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বলে– “আমি যতদূর জানি গাতফান গোত্র তোমার মতো নেতা পেয়ে সত্যই গর্বিত… বল নু’আইম! এই নিশীথ রাতে আমি তোমার কি কাজে আসতে পারি?… আমি দশ দিনের সময় চেয়েছি। কেবল ৬/৭ দিন হয়েছে। মুসলমানদের উপর গেরিলা আক্রমণ চালাতে আমার লোক সম্পূর্ণ প্রস্তুত।… তুমি কি এ ব্যাপারটি নিশ্চিত হতে এসেছ?”
হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “এ জাতীয় বিষয়ে আলোচনা করতেই আমি এসেছি, কা’ব তুমি একজন আস্ত গাধা! কোন ভরসায় তুমি কুরাইশদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছ?…এ প্রশ্ন তোল না যে, তোমার প্রতি কেন আমার এই সহমর্মিতা? আমি মুসলমানদেরও হিতাকাঙ্ক্ষী নই। তুমিতো ভাল করেই জান, আমি একজন নিরপেক্ষ জনদরদী। আমার হৃদয় তোমার গোত্রীয় যুবতী-রূপসী নারী, কন্যা, বধূ এবং বোনদের ভবিষ্যত চিন্তায় ব্যথিত, যারা তোমার আত্মঘাতী চুক্তির কারণে দু’দিন পরেই মুসলমানদের দাসী বাঁদীতে পরিণত হবে। এ চুক্তির মাধ্যমে তুমি নিজেদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছ। মুসলমানরা আক্রমণ করলে কুরাইশরা তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ; কিন্তু তার জন্য নিরাপত্তার গ্যারান্টিও তাদের থেকে আদায় করে নিয়েছি।”
“তাহলে কি কুরাইশদের পরাজয় নিশ্চিত?” কা’ব বিন আসাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে।
তারা যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে বসে আছে।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– পরিখা তাদেরকে শহরে আক্রমণ করার সুযোগ দেবে বলে মনে কর?… ক্ষুধা-তৃষ্ণা কুরাইশ সৈন্যদেরকে ভীষণ উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আমার গোত্র ক্ষুধায় অস্থির। আমি চাই না যে, আগামীকাল তুমি এই বলে আমার গোত্রের বদনাম করবে যে, গাতফান তোমাদেরকে মুসলমানদের করুণার উপরে ছেড়ে চলে গেছে। আমি চাই যেন এমনটি না হোক যে, ওদিকে যখন বাধ্য হয়ে আমরা ও কুরাইশরা অবরোধ তুলে চলে যাব তখন তুমি এদিকে মুসলমানদের উপর হামলা করে নিজেদেরকে তাদের দুশমন হিসেবে পরিচিত করাবে। বনূ কায়নূকা এবং বনু নযীরের পরিণতি অবশ্যই তোমার স্মরণ আছে। চুক্তিভঙ্গের দরুন মুসলমানরা তাদেরকে কেমন শাস্তি দিয়েছে তাও তোমার অজানা নয়।”
হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর যুক্তিপূর্ণ কথায় কা’ব বিন আসাদ একদম চুপসে যায়। তৎক্ষণাৎ সে কিছু বলতে পারল না। নিজ হাতে সে সর্বনাশা চুক্তি করেছে, হয়ত মনের গহীনে তারই জল্পনা-কল্পনা হতে থাকে। চিন্তার কালো মেঘ ছেয়ে যায় তার চেহারায়। ভবিষ্যৎ চিন্তায় নীরব হয়ে যায় সে।
“আমি জানি, কুরাইশদের থেকে তুমি এর বিনিময় কত লাভ করেছ।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– কিন্তু কথা হলো, এ সকল ধন-সম্পদ এবং সুন্দরী নারী, যা কুরাইশ ও হুয়াই বিন আখতাব সরবরাহ করেছে, তার মালিক অবশেষে মুসলমানরাই হবে। শুধু তাই নয়, মৈত্রীচুক্তি ভঙ্গের অপরাধে তোমাদের মাথা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হবে।”
“তবে কি কুরাইশদের সাথে কৃত চুক্তি প্রত্যাহার করব?” কা’ব উদ্বেগের সাথে জানতে চায়।
“এখনই চুক্তি প্রত্যাহার করার প্রয়োজন নেই।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু কৃত্রিম বিজ্ঞতাভাব ফুটিয়ে বলেন– “এতে তারা ক্ষুদ্ধ হতে পারে। তবে নিরাপত্তার জামানত অবশ্যই নেয়া চাই। আরবের রীতি অনুযায়ী কুরাইশদের গিয়ে বল, তাদের উচ্চপদস্থ কিছু লোক যেন জামিন হিসেবে দেয়। যদি তারা দাবি অনুযায়ী সম্মানিত ও নেতৃস্থানীয় লোক জামানত হিসেবে রাখে তাহলে বুঝবে তারা চুক্তির ব্যাপারে ন্যায়-নিষ্ঠ ও আন্তরিক।”
কাব বিন আসাদ বলে– “হ্যাঁ, নু’আইম। আমি জামিন হিসেবে তাদের লোক চাইব।”
♣♣♣
হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু কা’ব বিন আসাদের নিকট থেকে সফল মিশন শেষে রাতের আঁধার ভেদ করে পাহাড় অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছেন। কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত কুরাইশদের তাঁবুই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য। সোজা রাস্তা নিকটবর্তী হলেও পথিমধ্যে ছিল পরিখা। তিনি দূরের রাস্তা দিয়ে অনেক ঘুরে ঘুরে চলতে থাকেন। তিনি গতরাত থেকে বিরামহীন চলছেন কিন্তু গোপনে চলায় এবং সাধারণ রাস্তা পরিহার করে চলায় দ্বিগুণ সময় ব্যায় হয়। হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন আবু সুফিয়ানের নিকট পৌঁছেন তখন আরেকটি রজনী শুরু হয়ে যায়। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তার সমস্ত শরীর তীব্র ব্যথায় টনটন করছিল এবং প্রবল তৃষ্ণায় জিহ্বাও শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে বহু পানি পান করার পরেই তবে তিনি কথা বলার উপযোগী হন। আবু সুফিয়ান হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
“তোমার অবস্থাই বলে দিচ্ছে তুমি স্বগোত্রীয় সৈন্যদের নিকট থেকে আসনি।” আবু সুফিয়ান হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আরো জিজ্ঞাসা করে– “কোত্থেকে আসছ?”
‘বহু দূর থেকে।” হযরত নু’আইম রাযিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন– “একটি গুপ্তচর দলের সাথে সাক্ষাৎ করে আসছি। তোমরা বনূ কুরাইযার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছ ঠিকই কিন্তু একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের সাথে তাদের সম্পর্ক শুধু এই স্বার্থে যে, তারা আমাদের দ্বারা ইসলামের নিশ্চিহ্ন চায়।… বনু কুরাইযার দুই বন্ধুর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। ভাগ্যক্রমে মদীনায় এক পুরাতন বন্ধুর সাথেও দেখা হয়ে যায়। তাদের কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছি তাতে স্পষ্ট যে, কা’ব বিন আসাদ মুহাম্মাদের সঙ্গ ত্যাগ করেনি। উপরন্তু সে মুসলমানদের খুশী করতে এক নতুন ফন্দিও এটেছে। তোমরা তাকে মদীনা আক্রমণের অনুরোধ করেছ। কিন্তু সে কুরাইশ নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে জামিন হিসেবে পেতে চায়। যাদেরকে সে মুসলমানদের হাতে তুলে দিবে আর মুসলমানরা তাদেরকে ঠাণ্ডা মাথায় কতল করবে। এরপর ইহুদীরা ঘোষণা দিয়ে মুসলমানদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিত শক্তি নিয়ে আমাদের উপর হামলা চালাবে।… আমি তোমাদেরকে এই মর্মে সাবধান করতে এসেছি, যেন ইহুদীদের কথা শুনে জামিনস্বরূপ একজন লোকও না পাঠাও।”
