হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর প্রবল সন্দেহ হওয়ার কারণ হলো, তিনি জানতেন যে, শহরের সমস্ত পুরুষ পরিখার নিকটবর্তী ঘাঁটিতে অবস্থান করছে কিংবা যুদ্ধ বিষয়ক কোন কাজে ব্যস্ত। সন্দেহভাজন ব্যক্তি যদি নিজেদের লোক হত এবং বিশেষ কোন প্রয়োজনে আসত তাহলে গোপন বা বিকল্প পথ না খুঁজে মেইন গেটে নক করত।
পুরো কেল্লায় শিশু ও নারীদের সাথে মাত্র একজন পুরুষ ছিলেন আরব-খ্যাত কবি হাসসান বিন সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু। হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা-ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে এখনই এর প্রতিবিধান করার জন্য হযরত হাসসান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ছুটে যান এবং তাকে বলেন, নিচে এক সন্দেহভাজন প্রাচীরের গা ঘেঁষে ঘেঁষে চলছে।
“আমার সন্দেহ, লোকটি ইহুদী।” হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা হযরত হাসসান রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন– “হাসসান! তুমি জান যে, বনু কুরাইযা মৈত্রীচুক্তি ভঙ্গ করেছে। এ ব্যক্তিকে ইহুদীদের গুপ্তচর বলে মনে হচ্ছে, বনু কুরাইযা পেছন হতে আমাদের উপর হামলা করতে চায়, যাতে পরিখার নিকটে অবস্থানরত পুরুষদের দৃষ্টি পরিখা হতে সরে যায় এবং তারা আমাদেরকে রক্ষা করতে পিছু হঁটে আসে। পুরুষদেরকে পরিখা হতে দূরে সরানোর এই পরিকল্পনা তখনই কার্যকর হতে পারে, যখন তারা নারী ও শিশু ভরপুর এই কেল্লায় হামলা করবে।… দ্রুত নিচে যাও হাসসান! আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। সন্দেহভাজনের গতিরোধ কর। সে যদি প্রকৃতই ইহুদী হয়ে থাকে তাহলে তাকে সেখানেই হত্যা করবে। মনে রেখ, তার হাতে বর্শা আছে। আলখেল্লার অভ্যন্তরে লুকানো তরবারিও থাকতে পারে।”
কবি হাসসান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “সম্মানিত ভদ্র মহিলা!” “আপনার কি জানা নেই যে, আমি একজন কবি আমি মানুষের রক্তে আগুন ধরিয়ে উজ্জীবিত করতে পারি; কিন্তু নিজের মাঝে আলোড়ন তুলতে পারি না। এমন একজন কবি থেকে এই আশা করবেন না যে, সে একাকী বাইরে গিয়ে এমন এক ব্যক্তির মোকাবিলা করবে, যে সাহস প্রদর্শন করে কেল্লা পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।”
১.৪ ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম এবং ইবনে কুতাইবা রাযিয়াল্লাহু আনহু লিখেন, আরবের এই বিখ্যাত কবির জবাব শুনে হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকান এবং এত উত্তেজিত হয়ে ওঠেন যে, নিজেই ঐ সন্দেহভাজনকে পাকড়াও কিংবা হত্যা করতে তৎক্ষণাৎ বের হয়ে পড়েন। তার এটা ভাবার ফুরসৎ ছিল না যে, এক সশস্ত্র পুরুষের মোকাবিলা করতে যাবার সময় একটি লাঠি কোনমতে হাতে পেয়েই তিনি শত্রুর উদ্দেশে ছুটে যান। পথ আবিষ্কার করতে সচেষ্ট সন্দেহভাজনকে আত্মগোপন কিংবা পলায়নের সুযোগ না দিয়ে সন্দেহভাজনের অবস্থান চিহ্নিত করে সরাসরি তার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ান।
“কে তুমি?” হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা রূঢ়কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন।
সন্দেহভাজন চমকে পিছনে তাকান। অসৎ উদ্দেশে না এসে থাকলে তার আচার-আচরণ অন্য রকম হত। সে চোখের পলকে বর্শা উঁচু করে নিক্ষেপের প্রস্তুতি নেয়। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজনের চেহারার উপর হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর চোখ পড়লে তার আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না যে, লোকটি একজন ইহুদী এবং সে বনু কুরাইযার লোকই হবে। সন্দেহভাজনও এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আগন্তক যেহেতু নারী এবং তার হাতে একটি সাধারণ লাঠি মাত্র, তাই সে তাকে বিশেষ কোন অনিষ্ঠ করতে পারবে না।
“তোর উপর আল্লাহর লা’নত পড়ুক।” হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা উত্তেজিত কণ্ঠে বলেন– “তুই বনু কুরাইযার গুপ্তচর না?”
ইহুদী গুপ্তচর বলে– “মুহাম্মাদের ফুফু! চলে যাও এখান থেকে বলছি!” “তুমি কি আমার হাতে নিহত হতে চাও?…হ্যাঁ, আমি বনূ কুরাইযার লোক।”
“তবে তুমি জীবন নিয়ে ফিরে যাবার আশা করো না।” হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা তার পরিচয় পেয়ে বলেন।
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, ইহুদীদের এই আচরণের খবর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পেরে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন। শহরে খাদ্য-সংকট চরম আকার ধারণ করে। প্রত্যেক ব্যক্তি তার মৌলিক চাহিদার এক-চতুর্থাংশ আহার পায়। তীব্র খাদ্য-সংকটে পড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে দ্রুত সাহায্য কামনা করেন। সাথে সাথে সমস্যা সমাধানের জন্য কার্যকরী বিকল্প কোন উপায় বের করার চেষ্টা করেন।
♣♣♣
এদিকে খন্দকের উভয় পাড় ছিল তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ। তখনকার অস্থিরতা ও চরম উত্তেজনার কথা খালিদের মনে ছিল। তিনি খন্দকের পাড় বেয়ে বার বার অশ্বে চড়ে প্রদক্ষিণ করেন। কোন স্থানে নাক গলিয়ে খন্দক পার হওয়া যায় কি-না এই ছিল তার মূল পরিকল্পনা। তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের বীর সৈনিক। যুদ্ধ না করে ফিরে যাওয়া তিনি নিজের জন্য অপমান জনক মনে করতেন। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় সম্মুখ যুদ্ধের কোন সুযোগ ছিল না। এখানে এই প্রক্রিয়ায় যুদ্ধ চলে যে, খন্দকের যে জায়গায় মুসলমানরা শিবির করে অবস্থান করছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কুরাইশ সৈন্য তার কাছে গিয়ে মুসলমানদের উপর তীর বৃষ্টি বর্ষণ করত। মুসলমানরা তীরের জবাব তীর দ্বারাই দিতেন। কুরাইশ কোন সৈন্য অপর স্থানে টহলরত সৈন্যের উপর তীর ছুঁড়লে সাথে সাথে একদল মুসলিম সৈন্য তার সাহায্যে চলে আসতেন। মুসলমানদের পক্ষ থেকে রাতে খন্দকে টহলরত সৈন্য সংখ্যা দ্বিগুণ করা হত। কুরাইশদের সকল পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় তারা পরিখা হতে পিছু হঁটে ক্যাম্পে গিয়ে অবস্থান নিত।
