এক রাতে তিনি শহরের বাইরে কোথাও আকর্ষণীয় কণ্ঠে গান শুরু করেন। তার সুরের মূর্ছনায় অভিভূত হয়ে এক রূপসী যুবতী তাঁর সামনে এমনভাবে এসে দাঁড়ায়, যেন কোন জান্নাতী হুর আসমান থেকে মাটির পৃথিবীতে নেমে এসেছে। ভয়ে সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কন্ঠ বন্ধ হয়ে আসে। থেমে যায় সুরের লহর।
“যে মায়াবিনী কণ্ঠ আমাকে ঘর থেকে টেনে এখানে এনেছে তা থেকে বঞ্চিত করো না। মেয়েটি আবেদনের ভঙ্গিতে বলে– “আমাকে দেখার কারণে যদি গান গাওয়া বন্ধ করে থাক, তাহলে আমি তোমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছি। তোমার গানকে হত্যা কর না।… তোমার কণ্ঠে বিরহ ঝড়ে পড়ছে, যেন কারো বিচ্ছেদে তুমি এ গান গাইছ।”
সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “তুমি কে? “তুমি পরী কি-না সত্য বল।”
এ কথায় জলতরঙ্গের ন্যায় মেয়েটির হাসি আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে। মরুভূমির নিষ্কলংক পূর্ণিমা তার যুগলনয়ন হীরার মত চমকাতে থাকে।
মেয়েটি তাকে জানায়– “আমি বনূ কুরাইযার এক ইহুদীর মেয়ে।”
“আর আমি মুসলমান। সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন।
‘মাঝখানে ধর্মকে টেনে এনো না।” ইহুদী কন্যা বলে – সঙ্গীতের কোন ধর্ম নেই। আমি তোমার জন্য নয়; তোমার কণ্ঠে অভিভূত হয়ে এসেছি।”
হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু মেয়েটির রূপে বিমুগ্ধ আর ইহুদী মেয়েটি তার কণ্ঠে মোহিত হয়। সুরের জাদু মেয়েটিকে এমন বন্ধনে আবদ্ধ করেছে, মৃত্যুও যে বন্ধন মুক্ত করতে পারে না। এ রজনীর পরেও তারা পরস্পরে প্রেমালাপে মিলিত হয়। একে অপরের মাঝে বন্দি হয়ে যায়। একদিন ইহুদী মেয়েটি তাকে জানায়, হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু চাইলে সে তার নিকট চলে আসবে এবং ইসলাম গ্রহণ করবে।
মাত্র দু-তিন দিন হয় কুরাইশরা মদীনা ঘেরাও করেছে। যুদ্ধের সাজসাজ রব পড়ে যাওয়ায় হযরত সা’দ বিন আতীকের কাজও বেড়ে যায়। তার কাছে মানুষ দলে দলে এসে তলোয়ার, খঞ্জর এবং বর্শার মাথা সূতীক্ষ্ণ করতে ভীর জমাতে থাকে। কাজের চাপে রাতেও তাকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়।
একদিন ইহুদী মেয়েটি তার পিতার তরবারিটি নিয়ে হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট আসে।
“তরবারি সান দেয়ার বাহানায় এসেছি।” মেয়েটি বলে– “আজ রাতেই পালিয়ে কোথাও চলে যাও, নতুবা আর কখনো আমাদের সাক্ষাৎ হবে না।”
‘ব্যাপার কি?” উৎকণ্ঠা নিয়ে হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান।
“গত পরশু রাতে পিতা আমাকে বলেন, গোত্রপ্রধান কা’ব বিন আসাদ তাকে চায়” ইহুদী কন্যা বলে– “পিতা হুয়াই বিন আখতাবের কথাও বলে। আমি কা’বের বাসায় যাই। সেখানে হুয়াই বিন আখতাব ছাড়াও আরো দু’জন ছিল। তাদের আলোচনা হতে যতদূর বুঝলাম তাতে মনে হল, মুসলমানদের অন্তিম মুহুর্ত চলে এসেছে।
কা’ব বিন আসাদ, হুয়াই বিন আখতাব এবং কুরাইশদের মাঝে এই কন্যার উপস্থিতিতেই চুক্তি সম্পন্ন হয়। এবং পেছন দিক থেকে মুসলমানদের উপর আক্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ইহুদী কন্যা রাতভর কা’বের কাছে কাটায় সকালে সে স্বগৃহে ফিরে আসে। মুসলমানদের ব্যাপারে মেয়েটির কোনই আগ্রহ ছিল না। তার ভালবাসা ছিল শুধু সা’দকে নিয়ে। তার কানে এ খবরও আসে যে, কা’ব তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে নিজের ঘরে চিরদিনের জন্য রেখে দিবে।
হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধ-ব্যস্ততা হেতু ইহুদী মেয়েটির কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। মেয়েটি কিন্তু তাকে ভুলেনি। অস্ত্র ধারের বাহানা দিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসে। কিন্তু সা’দ তাকে পূর্বের ন্যায় পাত্তা দেন না। তাকে ফিরে যেতে বলেন। এক ইহুদী কন্যাসূত্রে প্রাপ্ত সংবাদ তিনি বিশিষ্ট এক মুসলমানকে জানিয়ে দেন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ এ সংবাদ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দেন। সেখান থেকে সদর দফতরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কানে এ খবর পৌঁছে যে, বনূ কুরায়যা অপর ইহুদী গোত্রদ্বয় বনু কায়নুকা ও বনু নাযীরের মত চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলিয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরায়যা গোত্রপ্রধান কা’ব বিন আসাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের পূর্বে খবরটির সত্যতা যাচাই করা জরুরী বলে মনে করেন। বনু কুরাইযা যে বাস্তবেই কুরাইশদের সাথে নতুন গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ নিয়েই তিনি তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চান।
আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় বান্দাদের সাহায্য করতে থাকেন। এরই মাঝে এমন এক ঘটনা ঘটে যায় যাতে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, বনূ কুরাইযা এবং কুরাইশদের মাঝে প্রকৃতই এক ভয়ানক চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে নিঃসন্দেহে।
ঘটনা এই ঘটে যে, খন্দকের একটু দূরে অবস্থিত বিভিন্ন ছোট ছোট কেল্লায় মহিলা ও শিশুদের স্থানান্তর করা হয়। একটি কেল্লায় কিছুসংখ্যক নারী ও শিশুদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফুফু হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহাও ছিলেন। একদিন তিনি কেল্লার ছাদের উপর পায়চারি করতে করতে কি মনে করে হঠাৎ নিচের দিকে তাকাতেই প্রাচীরের সাথে সেঁটে থাকা এক ব্যক্তির প্রতি তার দৃষ্টি পড়ে। তার চলার গতি ছিল সন্দেহপূর্ণ। একটু থেমে আবার কিছুদূর চলতে চলতে সে কেল্লার প্রাচীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিল। হযরত সাফিয়্যাহ রাযিয়াল্লাহু আনহা অলক্ষ্যে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। পরক্ষণেই তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আগন্তক কেল্লার ভিতরে প্রবেশের কোন বিকল্প পথ কিংবা উপায় বের করা যায় কি-না তা যাচাই করে দেখছে।
