মদীনায় খাদ্য-সংকট দুর্ভিক্ষের রূপ নেয়ায় বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যেমনি জানা ছিল, তেমনি তার নিকট এ তথ্যও ছিল যে, কুরাইশ সৈন্যের অধিকাংশই অভুক্ত। এক প্রকার না খেয়েই তাদের দিন কাটছে। এটা এমন এক নাজুক পরিস্থিতি যা মানুষকে পরস্পরের শর্ত মেনে নেয়া এবং চুক্তি মেনে সমঝোতায় পৌঁছতে বাধ্য করে।
ইতিহাস সে ব্যক্তির নাম লিখেনি, যাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনভাবে কুরাইশের মিত্রগোত্র ‘গাতফানের’ সেনাপ্রধান ‘আইনিয়া’-এর নিকট এই উদ্দেশে প্রেরণ করেন যে, সে তাকে কুরাইশদের বন্ধুত্ব ত্যাগ করতে অনুপ্রাণিত করবে। তাকে মুসলমানদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্য শুধু এটুকুই ছিল যে, প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে গাতফান এবং আইনিয়া সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে বহুজাতিক বাহিনী দু’হাজার সৈন্য হারাবে। এ আশাও ছিল যে, গাতফানের অনুকরণ করে অন্যান্য গোত্রও কুরাইশদের বিদায় জানাবে এবং বহুজাতিক বাহিনী হতে বেরিয়ে যাবে।
“মুহাম্মাদ কি আমাদেরকে কেবল মৌলিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে আহ্বান জানাচ্ছে?” সেনাপতি আইনিয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূতের নিকট জানতে চায়– “এ পর্যন্ত আমাদের যে অর্থ সম্পদ ব্যয় হয়েছে তা বহন কে করবে?”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূত বলে– “আমরা বহন করব, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা তোমাদের গোত্র নিয়ে এলাকায় ফিরে গেলে এ বছর মদীনায় যত খেজুর হবে তার এক তৃতীয়াংশ তোমরা পাবে। তোমরা নিজেরাই মদীনা এসে খেজুর বাগানগুলো স্বচক্ষে দেখে যাবে এবং চুক্তিবদ্ধ খেজুর নিজেরাই সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে।”
সেনাপতি আইনিয়া রণাঙ্গনে নিজে যুদ্ধ করা ও করানোতে বেশ পটু ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে খুবই অনভিজ্ঞ ছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে কুতাইবা লিখেন, এ ঘটনার কিছুদিন পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটা নিরেট গর্দভ আখ্যা দেন। বলিষ্ট দেহ এবং শারীরিক শক্তিসম্পন্ন এক সদা হাস্যোজ্জল সুপুরুষ ছিল আইনিয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দূতের সাথে সাক্ষাতের পর সে গাতফান সর্দারের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে।
“খোদার কসম! মুহাম্মাদ আমাদের দুর্বল মনে করে এই বার্তা প্রেরণ করেছে গাতফান বলে– তার দূতের কাছে জিজ্ঞেস কর, মদীনায় যারা আছে তারা কি প্রায় না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে না? আমরা তাদেরকে এভাবে ক্ষুধার্ত রেখে তিলে তিলে মারব।”
‘ক্ষুধার তাড়নায় আমাদের সৈন্যদের দুর্বল অবস্থার কথা কি আপনি জানেন না।” সেনাপতি আইনিয়া বলে– “মদীনাবাসী ক্ষুধার্ত থাকলেও নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছে। আর আমরা এলাকা ত্যাগ করে মরুভূমিতে পড়ে আছি। সৈন্যদের হতাশা ও উদ্বেগ আপনি লক্ষ্য করেন নি? আপনি কি এটাও লক্ষ্য করেন নি যে, আমাদের ধনুক থেকে বেরিয়ে যাওয়া বাণ এখন আর ততদূরে যায় না, তীরন্দাজদের উদরপূর্তি থাকলে যতদূর যেত? ধীরে ধীরে তাদের বাহুবল দুর্বল ও নিস্তেজ হয়ে আসছে।”
“মুহাম্মাদের প্রস্তাবের জবাব কি তুমি দিবে?” গাতফান উত্তেজিত কণ্ঠে জানতে চায়– “না-কি গোত্রপ্রধান হিসেবে আমিই এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিব?”
সেনাপতি আইনিয়া বলে– “খোদার শপথ! রণাঙ্গনের জন্য আমি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারব আপনি তা নিতে পারেন না। অপরদিকে লড়াই ছাড়া অন্য বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত আপনি নিতে সক্ষম, তা আমার দ্বারা কখনও সম্ভব নয়। আমার জ্ঞান তরবারি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এত জটিল যে, এখানে আমার সৈন্যদের তরবারি, বর্শা এবং তীর অকেজো হয়ে গেছে। পরিখার ধারে কাছে যেতেও আমরা অক্ষম। অতএব, এ মুহূর্তে মুহাম্মাদের প্রস্তাবকে স্বাগত জানানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
গোত্রপ্রধান ও সেনাপ্রধানের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর মুহাম্মাদের প্রস্তাবে সাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। দূত অনুকূল জবাব নিয়ে ফিরে আসে। মুসলমানদের কূটনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়। সতর্ক দূত অতিগোপনে যায়। এবং কার্যোদ্ধার শেষে নিরাপদেই ফিরে আসে। কুরাইশদের কেউ তাকে দেখতে পায় নি। কারণ, গাতফানের সৈন্যরা আলাদা এক স্থানে অবরোধে অংশগ্রহণ করছিল।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরোধিতা কিংবা সিদ্ধান্ত অমান্য করা কারো শক্তি ছিল না। তথাপি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীয়তের শিক্ষা অনুযায়ী সকল সাহাবাকে একত্র করে সকলের মতামত গ্রহণ করেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, মত প্রকাশে সকলেই স্বাধীন। তিনি এখন যে বিষয়ে আলোচনা করতে চান, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত থাকলে সে খোলা মনে নিজস্ব মতামত তুলে ধরতে পারে। প্রকৃতপক্ষে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলের অবিসংবাদিত নেতা হলেও তিনি একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। ফলে তিনি সকলের সম্মুখে তার পরিকল্পনা ও গৃহীত পদক্ষেপ বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে শুনান। গাতফানের সাথে এ পর্যন্ত যে আলোচনা হয় তাও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ব্যাখ্যা করেন। যাতে করে কোনরূপ ভুল বুঝাবুঝির সুযোগ না থাকে।
