ইহুদীদের ঐ গোত্রের নাম বনু কুরাইযা, যারা মুসলমানদের সাথে মিত্রতা ও একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করার চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। বনু কায়নুকা এবং বনু নযীরও চুক্তিবদ্ধ ছিল। কিন্তু ইতোপূর্বেই তারা মুসলমানদের সাথে গাদ্দারী করার কারণে মুসলমানরা তাদেরকে নির্বাসনে পাঠায়। সিরিয়া গিয়ে তারা আস্তানা গাড়ে। একমাত্র বনূ কুরাইজা সম্মানের সাথে চুক্তি বহাল রাখে। একনিষ্ঠভাবে সন্ধি ফলো করায় পরিখা যুদ্ধে বনূ কুরাইযার কাছ থেকে কোনরূপ ক্ষতির আশঙ্কা মুসলমানদের ছিল না। বনু কুরাইজার মনেও কোন দুরভিসন্ধি ছিল না। কিন্তু হুয়াই বিন আখতাব তাদের প্ররোচিত করে এবং চুক্তির উপর অটল থাকতে দেয়নি। হুয়াই বিন আখতাব ছিল ইহুদী। সে কা’ব বিন আসাদকে একই ধর্মানুসারী মনে করে তার কাছে যায়। উদ্দেশ্য, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাকে প্ররোচিত করা এবং চুক্তি ভঙ্গ করতে উৎসাহিত করা। তাই কা’বের গোলামের কথা শুনেও সে চলে যায়নি। যে কোন মূল্যে কা’বের সাথে দেখা করতে চায়। অবশেষে বাধ্য হয়ে কা’ব নাছোড়বান্দা হুয়াইকে ভেতরে আসার অনুমতি দেয়।
“এ অসময়ে তোমার আগমনের উদ্দেশ্য জানতে আমার বাকী নেই।” কা’ব বিন আসাদ হুয়াইকে বলে– “তুমি আবু সুফিয়ানের তরফ থেকে এলে তাকে গিয়ে বলবে, আমরা মুসলমানদের সাথে যে চুক্তিতে আবদ্ধ আছি, মুসলমানরা যথাযথভাবে তার উপর আছেন। তারা আমাদেরকে মূলতই মিত্র বলে জানে এবং চুক্তি অনুযায়ী প্রাপ্য অধিকার সবই দিচ্ছে।”
“কা’ব বিন আসাদ! ঠাণ্ডা মাথায় কথা বল।” হুয়াই বিন আখতাব বলে–“বনূ কায়নুকা এবং বনূ নযীরের পরিণতি দেখ। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় নিশ্চিত। ইহুদীদের খোদার শপথ! দশ হাজার সৈন্য মুসলমানদেরকে পিষ্ট করে ফেলবে। যুদ্ধে মুসলমানরা টিকতে না পেরে ইহুদীদেরকে এ পরাজয়ের কারণ মনে করে বদলা নিতে তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।”
“তোমার মনের ভাব খুলে বল হুয়াই।” কা’ব বিন আসাদ ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়।
পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে কুরাইশ সৈন্যদের একটি অংশ তোমাদের নিকট আসবে।” হুয়াই বলে যায়– “তোমাদের বর্তমানে এই গোপন বাহিনী পেছন দিক হতে মুসলমানদের উপর হামলা করতে পারে না। তুমি সগোত্র গিয়ে কুরাইশদের সাথে মিলে যাও। কৌশলে মুসলমানদের উপর এভাবে হামলা চালাও যে, শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে ঠিকই কিন্তু দীর্ঘক্ষণ ময়দানে টিকে থাকবে না; বরং সুযোগ বুঝে পিছু হঁটে আসবে। এতে কুরাইশদের এই উপকার হবে যে, মুসলমানদের দৃষ্টি পরিখা থেকে ঘুরে যাবে আর এই সুযোগে কুরাইশরা পরিখা পার হয়ে চলে আসবে।”
“তোমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার পর যদি আমরা ঘটনাক্রমে অকৃতকার্য হই, তখন আমাদের সাথে মুসলমানদের আচরণ কেমন হবে বলে তুমি মনে কর?” কা’ব বিন আসাদ বলে– “মুসলমানদের কঠোরতা ও ক্রোধ সম্বন্ধে তোমরা নিশ্চয় জান। বনু কায়নুকা এবং বনু নযীরের কাউকে তোমাদের চোখের সামনে দেখ কি?”
“আবু সুফিয়ান সবদিক ভেবেই তোমার দিকে চুক্তির হাত প্রসারিত করেছে।” হুয়াই বিন আখতাব বলে– “সত্যই যদি মুসলমানদের ক্রোধ ও কঠোরতা তোমাদের উপর নেমে আসে, তাহলে কুরাইশদের একটি বাহিনী তোমাদের রক্ষার জন্য শাইখাইনসহ পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে অবস্থান করবে। তারা গেরিলা আক্রমণে খুবই পারদর্শী। এই চৌকস বাহিনী ক্ষিপ্র গতিতে ‘যখন-তখন’, ‘এখানে-ওখানে’ আক্রমণ করে মুসলমানদের এমন অস্থির করে রাখবে যে, তারা তোমাদের দিকে চোখ তুলে তাকাবারও সময় পাবে না।”
“তুমি আমাকে এমন সঙ্কটে ফেলেছ, যা আমার পুরো গোত্রকে ধ্বংস করে দিবে।” কা’ব বিন আসাদ বলে।
“তোমার গোত্র ধ্বংস হোক বা না হোক কুরাইশরা এই চুক্তির পরিবর্তে এত মূল্য দেবে যা তোমরা কল্পনাও করনি।” হুয়াই বলে– “অথবা সহযোগিতার মূল্য নিজেই বল… যা বলবে, যেভাবেই চাবে তা পেয়ে যাবে। এছাড়া তোমার গোত্র পাবে পূর্ণ নিরাপত্তা। মুসলমানরা অল্পদিনের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাদের সাথে সখ্যতা গড়, যারা জীবিত থাকবে এবং যাদের হাতে থাকবে অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা ও শক্তি।”
কা’ব বিন আসাদ সৎ থাকলেও ধর্মীয়ভাবে সে ছিল ইহুদী ধর্মীয়। স্বর্ণ-রৌপ্য এবং মণি-মাণিক্যের টোপে সে শেষ পর্যন্ত হুয়াই বিন আখতাবের সাথে হাত মিলায়।
কা’ব বিন আসাদ বলে– “কোন কুরাইশ সৈন্যের আমাদের এলাকায় আসার দরকার নেই।” “আমার লোকেরাই মুসলমানদের উপর গেরিলা হামলা করবে। রাতের আঁধারেই এ পরিকল্পিত হামলা হবে। যাতে মুসলমানরা মোটেও টের না পায় যে, গেরিলারা বনু কুরাইযা … আর হুয়াই!” কা’ব মুচকি হেসে বলে– “তুমি নিজেই দেখেছ, আমি এখানে একাকী পড়ে থাকি এভাবে আমার রাত একাকী কেটে যায়।”
“আজকের রাতটি একাকী কাটাও।” হুয়াই বলে– “কাল থেকে আর নিঃসঙ্গ রাত কাটাতে হবে না।”
“আমি দশ দিন সময় চাই।” কা’ব বলে– “গোত্রকে তৈরি করতে হবে আমার।”
এভাবে হুয়াই বিন আখতাবের প্রচেষ্টার কালে কুরাইশ এবং বনু কুরাইযার মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি হয়।
হযরত সা’দ বিন আতীক ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। মদীনায় তার তেমন কোন প্রভাব ছিল না। খঞ্জর এবং তলোয়ার শান দেয়াই ছিল তার পেশা। তার কণ্ঠস্বর ছিল খুবই আকর্ষণীয়। রাতে কোন অনুষ্ঠানে সে গান গাইলে মানুষ ঘরে বসে থাকতে পারত না। বাইরে এসে বাতাসে কান পেতে থাকত। কখনো তিনি শহরের বাইরে গিয়ে নিরিবিলি গান গাইতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করে আসার পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
