মদীনায় গমনকালে এ কথা ভেবে খালিদের নিজের কাছে নিজেকে খুব হাল্কা মনে হয় যে, মক্কা থেকে রওনা হওয়ার পর দশ হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনীর চলার দৃশ্য দেখে তার গর্দান উঁচু এবং গর্বে বুক ফুলে গিয়েছিল। কিন্তু মদীনার কাছাকাছি এসে সেই বাহিনীকেই বালুর টিলার ন্যায় নিষ্প্রাণ ও জড় পদার্থ বলে মনে হয়। অবরোধের চিত্রও তার মনে পড়ে। সৈন্যদের যে অংশটি তার নেতৃত্বাধীন ছিল, তাদেরকে তিনি অতীব নৈপুণ্যের সাথে অবরোধ কর্মে বিন্যস্ত করে রেখেছিলেন।
দীর্ঘ বাইশ দিন অবরোধ অব্যাহত থাকে। দশদিন যেতে না যেতেই মদীনার মুসলমানরা খাদ্য-সংকটে পড়ে। কিন্তু এতে কুরাইশরা তেমন লাভবান হল না। কেননা, তাদেরও রসদ-সামগ্রী পরিমাণে কম ছিল। তারা ভাবতে পারেনি যে, মুসলমানদের অবরোধে তাদেরকে এক দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হবে। খাদ্য-সংকট মদীনার মুসলমানরা যেমনিভাবে অনুভব করে তার থেকে কোন অংশেই কুরাইশদের খাদ্য-সংকট কম ছিল না। তীব্র খাদ্য-সংকটে সৈন্যদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে থাকে।
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম লিখেন, মদীনায় যখন খাদ্যের পর্যাপ্ত মজুদ ছিল না এবং জনগণকে দৈনিক প্রয়োজনের খাদ্য আহার দেয়া হচ্ছিল, ঠিক সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে মুনাফিক ও ইহুদীরা চক্রান্তে মেতে ওঠে। সর্ব প্রথম এ কথা আবিষ্কার করে তার খোঁজ পাওয়া না গেলেও শহরের সর্বত্র গুঞ্জরিত হতে থাকে যে, মুহাম্মাদ আমাদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ব্যবস্থা করেছে। কারণ, সে মুখে এ কথা বললেও অচিরেই কায়সার ও কিসরার ধনাগার যে আমাদের করতলগত হবে’; এখনও পর্যন্ত তার নবুওয়াতের স্বপক্ষে এ প্রমাণটুকু পেশ করতে পারেনি যে, খাদ্য-সংকটের এ মুহুর্তে আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্য সামগ্রী আসবে।”
ইসলাম গ্রহণ করলেও মানুষ তো রক্ত-মাংসেরই গড়া ছিল। উদরপূর্তির প্রশ্নটি ছিল তাদের দুর্বল পয়েন্ট। এ পয়েন্টে এসে তাদের মধ্যে শহরের ঐ গুঞ্জনটি প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। অনেকের চেহারায় হতাশার চিহ্ন ফুটে ওঠে। এমতাবস্থায় আরেকটি আহ্বান তাদেরকে পেটের ভূতের হাত থেকে রক্ষা করে।
“তোমরা কি আল্লাহর সম্মুখে এ কথা বলতে চাও যে, আমরা আল্লাহ পূজার চেয়ে অধিক পেটপূজারী ছিলাম। এটা ছিল এক বজ্রধ্বনি, যা শহরের অলি-গলিতে প্রতিধ্বনি তোলে– “আজ আল্লাহর প্রিয়পাত্র তারাই গণ্য হবে, যারা আল্লাহর রাসূলের সাথে ক্ষুধা-তৃষ্ণার্ত অবস্থায় জীবনবাজি রাখবে।… আল্লাহর কসম! এর থেকে বড় কাপুরুষতা এবং বেইজ্জতি মদীনাবাসীদের জন্য আর কি হতে পারে যে, আমরা মক্কাবাসীদের পদতলে লুটিয়ে পড়ব এবং দু’হাত জোড় করে বলব, আমরা তোমাদের গোলাম, আমাদেরকে কিছু খেতে দাও।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহর রক্ষায় এমন ব্যস্ত ছিলেন যে, তার দিন রাত সব একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রিয়নবী। তিনি ইচ্ছা করলে মোজেযাস্বরূপ কিছু দেখাতে পারতেন। কিন্তু তার এই সতর্ক অনুভূতি ছিল যে, আমি নবী হলেও অন্য মানুষ তো আর নবী নয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নতুন নবী আসবেনা, তাই মানুষের নিকট এমন দৃষ্টান্ত রেখে যেতে হবে যে, মানুষ তার আল্লাহ প্রদত্ত নশ্বর দেহ এবং আত্মিক শক্তি দৃঢ়তার সাথে পূর্ণ কাজে লাগালে মোজেযার মত চমক দেখাতে পারে। অবরোধকালীন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মতৎপরতা এবং তার অবস্থা একজন সেনাপতির পাশাপাশি একজন সৈনিকের মতও ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এহেন তৎপরতা দেখে মুসলমানরা তাদের ক্ষুধা-পিপাসার কথা একদম ভুলে যায়। তাদের মধ্যে এমন জোঁশ ও প্রেরণা সৃষ্টি হয় যে, অনেকে আবেগতাড়িত হয়ে পরিখার একদম কাছে চলে আসত এবং কুরাইশদেরকে কাপুরুষ বলে বিদ্রুপ করত।
♣♣♣
৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই মার্চ। আবু সুফিয়ান বিষন্ন মনে হুয়াই বিন আখতাবকে ডেকে আনার নির্দেশ দেয়। তার বিষন্নতার কারণ, দশদিনেই তার সৈন্যদের খাদ্য রসদ বহু কমে যায়। সৈন্যরা আশেপাশের বস্তিগুলো থেকে লুটপাট করে কিছু খাদ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু মরুভূমির বস্তিগুলোতেও বিশেষ কোন খাদ্য সঞ্চিত ছিল না। খাদ্য-সংকটে যৌথবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ ফুঁসে উঠতে থাকে। সৈন্যদের নাজুক অবস্থা দেখে আবু সুফিয়ান এক ইহুদী গোত্রপ্রধান হুয়াই বিন আখতারকে জরুরী ভিত্তিতে ডেকে পাঠায়। হুয়াই পূর্ব থেকেই কুরাইশদের সাহায্যের উদ্দেশে নিকটে কোথাও অবস্থান করেছিল। সে কুরাইশদের আহ্বান ও তার কাছে সাহায্যের অপেক্ষায় ছিল।
মদীনার অনতিদূরে বনূ কুরাইযা ইহুদী গোত্রের বস্তি ছিল। এই গোত্রের নেতা কা’ব বিন আসাদ এ বস্তিতেই অবস্থান করছিল। রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ করে দরজায় জোরে জোরে নক হওয়ায় তার মিলানো চোখের পাতা দু’টো এদিক-ওদিক সরে যায়। গোলামকে ডেকে বলে– “দেখতো বাইরে কে?”
গোলাম দরজার ছিদ্র দিয়ে দেখে বলে– “হুয়াই বিন আখতাব এসেছেন।”
“এই গভীর রজনীতে ব্যক্তিগত কোন স্বার্থের জন্যই সে এসেছে।” একটু রাগত স্বরে কা’ব বিন আসাদ বলে– “তাকে বলে দাও, আমার পক্ষ থেকে এখন আমি তার কোন উপকার করতে পারব না। দিনে আসলে চেষ্টা করা যেতে পারে।”
