উহুদের যুদ্ধেও মুসলমানদের নিশ্চিত পরাজয় ছিল। কিন্তু এরপরেও মুসলমানদের মেধা ও বিচক্ষণতার দরুন অবশেষে জয়-পরাজয় ছাড়াই যুদ্ধ শেষ হয়।
“আরো ব্যাপার ছিল খালিদ!” খালিদ নিজেই নিজের জবাবে বলেন– “যা কিছু থাকুক না কেন, আমি এটা মানতে পারব না যে, মুহাম্মাদের জাদু বলেই এমনটি সম্ভব হয়েছে কিংবা তার হাতে কোন যাদু আছে। আমাদের জ্ঞান-বিবেক যে কোন কিছু বুঝতে পারে না তাকে জাদু বলে চালিয়ে দেই। কুরাইশদের মাঝে এমন বিচক্ষণ লোক একজনও নেই, যে মুসলমানদের মত দৃঢ়তা নিয়ে কুরাইশদেরকে উদ্বুদ্ধ করবে এবং এমন যুদ্ধ পরিকল্পনা উদ্ভাবন করবে, যা মুসলমানদের চূড়ান্ত বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিবে।”
“আল্লাহর কসম! মুসলমানরা আমাদের পথে খন্দক খনন করায় আমরা ফিরে যাব না।” আবু সুফিয়ান, খালিদ, ইকরামা ও সফওয়ানকে বলে। কিছুক্ষণ পর সে আবার তাদেরকে জিজ্ঞেস করে– “খন্দক অতিক্রমের কোন উপায় উদ্ভাবন করা যায় কি?”
খালিদ উপায় উদ্ভাবনে গভীর চিন্তায় ডুবে যান। কিন্তু হঠাৎ তার মনে এ সন্দেহও সৃষ্টি হয় যে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সৈন্যরা পরিখা অতিক্রম করলেও মুসলমানদেরকে পরাজিত করা তত সহজ হবে না। তাদের সংখ্যা যতই কম হোক না কেন। যারা অল্প সময়ে পাথুরে জমীনের বুক চিরে গভীর পরিখার সৃষ্টি করতে পারে, অনেক কষ্টের পরেই কেবল কোন বিশাল বাহিনী তাদের পরাস্ত করতে পারে।
“কি ভাবছ? ওলীদের বেটা!” আবু সুফিয়ান খালিদকে গভীর চিন্তামগ্ন দেখে জিজ্ঞেস করে– “আমাদের চিন্তা করারও সময় নেই। আমাদের বিলম্ব দেখে মুসলমানরা এমনটি যেন মনে করার সুযোগ না পায় যে, আমরা স্তম্ভিত।”
“পরিখা পুরোটাই নিরীক্ষা করা দরকার।” ইকরামা বলল। “এমন কোন জায়গা অবশ্যই আবিষ্কৃত হবে, যেখান দিয়ে আমরা খন্দক অতিক্রম করতে পারব।” সফওয়ান বলে।
“অবরোধ।” খালিদ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন– মুসলমানরা পরিখা খনন করে ভিতরে অবস্থান করছে। আমরাও অবরোধ করে বাইরে অবস্থান করব। ক্ষুধা-পিপাসায় অস্থির হয়ে একদিন অবশ্যই তাদের পরিখার এপার আসতে হবে।
“ঠিক আছে।” আবু সুফিয়ান সমর্থনের ভঙ্গিতে বলে– “এ ছাড়া অন্য কোন উপায় দেখি না, যা পরিখা অতিক্রম করে এ পারে এসে মুসলমানদেরকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে।”
আবু সুফিয়ান তিন উপসেনাপতিকে নিয়ে পরিখার কিনার দিয়ে পুরো পরিখা পর্যবেক্ষণ করতে বনূ উবাইদ পর্বতের দিকে রওনা হয়। মদীনা ও বনু উবাইদ পর্বতের মধ্যবর্তী স্থলে ‘সালা’ নামক একটি পাহাড় ছিল। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে এখানেই ছিল মুসলমানদের মূল ক্যাম্প। মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা কম দেখে আবু সুফিয়ানের ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি দেখা যায়। সে এখান থেকে সম্মুখে অগ্রসর হলে দ্রুত ধাবমান একটি ঘোড়া তার কাছে এসে ব্রেক কষে। অশ্বারোহী আবু সুফিয়ানের পরিচিত। লোকটি একজন ইহুদী। বণিকবেশে সে মদীনায় গিয়েছিল। পাহাড়ের দীর্ঘ সারি অতিক্রম করে করে সে মদীনা থেকে পরিখার এ পারে এসে কুরাইশ সৈন্যদের মাঝে পৌছে।
“ওপার থেকে এমন কোন সংবাদ নিয়ে আসতে পেরেছ, যা আমাদের কাজে আসতে পারে?” আবু সুফিয়ান ইহুদীকে জিজ্ঞেস করে এবং বলে– “আমাদের সাথে যেতে থাক এবং সংবাদ একটু জোরে বল, যাতে আমার এই তিন কমান্ডারও শুনতে পারে।”
ইহুদী বলতে থাকে– “শহর রক্ষা ও আবাসিক এলাকা রক্ষার জন্য মুসলমানদের গৃহীত পদক্ষেপ হল এই, আপনারা সকলেই জানেন যে, মদীনা ছোট কেল্লাবিশিষ্ট এবং পরস্পর লাগোয়া কতক পল্লী ও আবাসিক এলাকার নাম। মহিলা, শিশু ও দুর্বলদেরকে মুসলমানরা সর্বপশ্চাৎ কেল্লায় পাঠিয়েছে। পরিখার উপর সতর্ক নজর রাখতে একটি দল গঠন করা হয়েছে। এ দলের সদস্য ২০০ থেকে ২৫০ এর মত হবে। তাদের প্রত্যেকেই তলোয়ার, বর্শা এবং তীর-ধনুকে সজ্জিত। পরিখাকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রহরী দলটি সারাদিন সারা রাত পুরো পরিখা টহল দিয়ে ফিরছে। যেখান দিয়েই আপনারা পরিখা অতিক্রম করতে চাইবেন মুহূর্তেই সেখানে পর্যাপ্ত মুসলমান পৌছে যাবে এবং ঝাঁকে ঝাঁকে তীর বর্ষণ করে আপনাদের পিছু হটতে বাধ্য করবে। শুধু তাই নয়, এ সম্ভাবনাও রয়েছে যে, রাতের অন্ধকারে মুসলমানরা পরিখার এ পার এসে গেরিলা হামলা করে আবার ফিরে যাবে।”
“তাহলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই কি করেছে?” আবু সুফিয়ান উৎকণ্ঠার সাথে জিজ্ঞেস করে।
ইহুদী গুপ্তচর বলে– “হে কুরাইশ নেতা!” “জীবনের অনেক বছর অতিবাহিত হলেও মানুষ চেনার যোগ্যতা এখনও আপনার হয়নি। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই একজন কপটচারী লোক। মুসলমানদের কাছে সে মুনাফিক সর্দার হিসেবে পরিচিত। আমরাও তাকে ইহুদীদের একজন গাদ্দার বলে জানি। সে মুসলমান হয়ে আমাদের সাথে গাদ্দারী করেছিল। এবং আপনাদের স্বার্থেও সে তাদের সাথে প্রতারণা করেছে। উহুদে আপনারা বিজয় অর্জন করলে সে নিজেকে আপনাদেরই একজন বলে প্রচার করত। কিন্তু মুসলমানদের পাল্লা ভারী দেখে সে আপনাদের এবং ইহুদীদের থেকেও দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। যার কোন ধর্ম নেই এবং যে বিশ্বস্ত নয় তার উপর নির্ভর করা আদৌ ঠিক নয়।”
“হুয়াই ইবনে আখতার কোথায়?” আবু সুফিয়ান জানতে চায়।
সে যথাসম্ভব চেষ্টারত।” ইহুদী গুপ্তচর জবাবে বলে – মদীনায় আমার আরো সঙ্গী রয়েছে। তারা সম্ভবত মুসলমানদের ক্ষতি করতে থাকবে।”
