এ দৃশ্য দেখে সাহাবায়ে কেরামের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর হয়। তারা কোদাল-বেলচা নিয়ে তাকবীরধ্বনি দিয়ে মাটি সরাতে থাকেন। এ সময় কবি হাসসান বিন সা‘বত রাযিয়াল্লাহু আনহু চলে আসেন। নাতের জগতে তিনি ছিলেন অতুলনীয় নক্ষত্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সাথে রাখতেন। পরিখা খননকালে হযরত হাসসান রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন আকর্ষণীয় কণ্ঠে গজল পরিবেশন করতে শুরু করেন যে, খননকারীদের মধ্যে গভীর অনুরাগ ও জোশের সৃষ্টি হয়। পরিখার দৈর্ঘ্য কয়েক গজ ছিল না; বরং কয়েক মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শাইখাইন পর্বত থেকে বনী উবাইদ পর্বত পর্যন্ত খনন করা লক্ষ্য ছিল। মাটি ছিল কোথাও নরম এবং কোথায় পাথুরে। দুশমন কাছাকাছি থাকায় এ খনন প্রকল্প অতি দ্রুত সম্পন্ন করা আবশ্যক হয়ে পড়েছিল।
কুরাইশ বাহিনী এই অভূতপূর্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত অবস্থায় উহুদ পর্বতের অপর প্রান্তে ক্যাম্প করে অবস্থান করছিল।
“এর পেছনে অবশ্যই ইহুদীদের হাত ছিল।” চলতে চলতে খালিদের মন বলে ওঠে– “কুরাইশরা তো এক প্রকার হালই ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে মুসলমান-ভয় ভর করেছিল।”
আপন মনে চলছিল ঘোড়া। মদীনা এখনও বেশ দূর। হঠাৎ খালিদের শরীরে লজ্জার শিহরণ বয়ে যায়। কুরাইশদের কাপুরুষোচিত যুদ্ধ-নীতি তাকে মারাত্মক লজ্জিত করেছিল। তিনি সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না যে, ইহুদীদের জোর প্রচেষ্টার পর কুরাইশ সেনাপতি আবু সুফিয়ান মদীনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্য লড়াইয়ের সংবাদে তিনি খুব খুশি হন। ইহুদীদের প্রচেষ্টার ফলে আরব ভূমিতে এটাই সর্বপ্রথম বৃহৎ সৈন্য-সমাবেশ হলেও খালিদ সৈন্য-সমাবেশের পয়েন্টে খুবই খুশী ছিলেন।
এ কথা ভেবে মনে মনে বড়ই আনন্দিত হন যে, বিশাল এ সেনাবাহিনী দেখেই মুসলমানরা মদীনা ছেড়ে পালাবে। আর যদিও বা সাহস করে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় তবে খুব অল্প সময়েই তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবে। উহুদের অপর প্রান্তে সৈন্যরা ক্যাম্পে অবস্থানকালে তিনি অত্যন্ত উৎফুল্ল ছিলেন। যে প্রভাতে আক্রমণের কথা ছিল। তার পূর্বরাতে তার মধ্যে এমন উত্তেজনা সৃষ্টি হয় যে, তিনি নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। চতুর্দিকে মুসলমানদের ছড়িয়ে থাকা লাশ আর লাশ তিনি কল্পনার চোখে দেখতে থাকেন।
পরদিন প্রত্যুষে বহুজাতিক বাহিনীর ১০ হাজার সৈন্য মদীনা আক্রমণ করতে উহুদকে পেছনে ফেলে মদীনার দিকে এগিয়ে চলে সারিবদ্ধভাবে। বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে পৌঁছে হঠাৎ থেমে যায়। গভীর পরিখা তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। সেনাপতি আবু সুফিয়ান সৈন্যদের মধ্যভাগে ছিল। হঠাৎ সৈন্যদের থেমে যেতে দেখে সে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছে।
কুরাইশদের বাহাদুর বাহিনী! থেমে গেলে কেন?” আবু সুফিয়ান উচ্চঃস্বরে বলছিল– “তুফানের মত অগ্রসর হও এবং মুহাম্মাদের অনুসারী মুসলমানদেরকে পিষ্ট করে ফেল।.. শহরের প্রতিটি ইট খুলে ফেল।”
আবু সুফিয়ান সামনে অগ্রসর হলে সে নিজেই ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে এবং সৈন্যদের ঘোড়ার ন্যায় তার ঘোড়াও থেমে যায়। সামনে পরিখা দেখে সে থমকে যায়। নীরবতা তাকে ছেয়ে ফেলে।
“আল্লাহর কসম! এটি একটি নতুন জিনিস যা আমার চোখ কখনো দেখেনি।” আবু সুফিয়ান ক্রোধ-কম্পিত কণ্ঠে বলে– “আরবের যোদ্ধারা বিস্তৃত ময়দানে লড়াই করে আসছে।.. খালিদ বিন ওলীদকে ডাক।… ইকরামা এবং সফওয়ানকেও ডাক।”
আবু সুফিয়ান পরিখার কিনারা দিয়ে ঘোড়া নিয়ে চক্কর দিতে থাকে। পরিখা অতিক্রম করতে পারে এমন কোন জায়গা তার চোখে পড়ে না। শাইখাইন নামক উঁচু পর্বত থেকে নিয়ে বনু উবাইদ এর উপর দিয়ে পশ্চাৎভাগ পর্যন্ত ছিল পরিখা। মদীনার পূর্ব দিক শাইখাইন ও অন্যান্য পাহাড় কুদরতিভাবে মদীনাকে নিরাপদ রাখে।
আবু সুফিয়ান অনেক দূর পর্যন্ত পরিখার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। পরিখার ওপাড়ে সতর্ক প্রহরীর মত মুসলমানরা টহল দিচ্ছিল। সে কিছুক্ষণ পায়চারি করে ঘোড়া ঘুরিয়ে সৈন্যদের কাছে ফিরে আসে। উল্টো দিক থেকে তিনটি ঘোড়া দৌড়ে এসে তার পাশে এসে থেমে যায়। খালিদ, ইকরামা ও সফওয়ান-এর ঘোড়া।
“দেখলে, মুসলমানরা কত ভীতু?” আবু সুফিয়ান তিনজনকে লক্ষ্য করে বলে– “পথিমধ্যে গতিরোধ করে কিংবা রাস্তায় গর্ত খনন করে দুশমনের সাথে কখনো লড়েছ?”
সেদিন আবু সুফিয়ানের কথা শুনে খালিদ নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। আজ মদিনার দিকে গমনকালে তার সে কথা স্মরণ হয় যে, সেদিন তার চুপ থাকার কারণ এই ছিল না যে, আবু সুফিয়ান মুসলমানদেরকে যে ‘ভীতু বলেছিল– তা ঠিকই ছিল; বরং তিনি নীরবতা অবলম্বন করে এই চিন্তা করছিলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিখা খনন কোন ভীতুর পরিচয় ছিল না; বরং বুদ্ধিমানের পরিচয় ছিল। শহর প্রতিরক্ষার উপায় হিসেবে এ পরিকল্পনা যিনি করেছেন তিনি কোন সাধারণ মেধার লোক নন। ইতোপূর্বেও তিনি টের পেয়েছিলেন যে, মুসলমানরা লড়াইয়ের ক্ষেত্রে শুধু দৈহিক শক্তির উপর নির্ভর করে না; মেধা এবং বিচক্ষণতাকেও ব্যবহার করে। খালিদের দেমাগও এ ধরনের যুদ্ধ-কৌশল জন্ম দিত। মুসলমানরা সংখ্যায় স্বল্প হওয়া সত্ত্বেও বদর যুদ্ধে বিশাল কুরাইশ বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিল। খালিদ পরবর্তীতে একাকী বসে এ পরাজয়ের কারণ বের করতে চেষ্টা করেন। মুসলমানদের বিজয়ের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল প্রতিটি মুসলিম যোদ্ধার অপূর্ব বিচক্ষণতা।
