এভাবে ভাষণের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাবাসীদের মধ্যে বিদ্যুৎপ্রবাহ সঞ্চার এবং তাদের সাহস এমন পর্বতসম করে দেন যে, তারা এর চেয়েও বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা করতে তৈরী হয়ে যায়। আগত বিশাল জনস্রোতের হাত থেকে মদীনাকে রক্ষার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেরেশানীর অন্ত ছিল না। আল্লাহ্ পাক সাহায্য করবেন নিশ্চিত। কিন্তু কি করা যায়? চিন্তার সাগরে ডুবে যান তিনি। কিন্তু না, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যায় এমন কোন পরিকল্পনা তার মাথায় আসে না।
♣♣♣
আল্লাহ তায়ালা এক ব্যাক্তির মাধ্যমে মুসলমানদের সাহায্যের ব্যবস্থা পূর্বেই করে রেখেছিলেন। লোকটি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। লোকটির নাম ছিল সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু। সালমান ফার্সী প্রথমে অগ্নিপূজকদের ধর্মীয় গুরু ছিলেন। কিন্তু অহর্নিশি সত্যের সন্ধানে ব্যাকুল থাকেন। তিনি আগুন পূজারী ছিলেন বটে কিন্তু আগুনের স্ফুলিঙ্গ এবং তার শিখায় ঐ রহস্য উদঘাটন করতে পারছিলেন না। যে কারণে তিনি বড়ই উদগ্রীব ও উতলা ছিলেন। পাণ্ডিত্য এবং বিচক্ষণতায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না। অগ্নিপূজকরা আগুনের ন্যায় তারও পূজা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা করত।
সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন বার্ধক্য অতিক্রম করেন তখন তার কর্ণে আরব ভূখণ্ডের এক ব্যতিক্রমধর্মী আওয়াজ পৌঁছে– “আল্লাহ এক। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল।” স্বদেশে থাকা কালে এ আহ্বান তার কানে পৌঁছেনি, বরং জ্ঞানের তালাশে তিনি জীবনভর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। ঘুরতে ঘুরতে তিনি এক সময় একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে সিরিয়া আসেন। এখানে ব্যবসার উদ্দেশ্যে কুরাইশ ও মুসলমান ব্যবসায়ীদের আনাগোনা হত। কুরাইশ ব্যবসায়ীরাই সর্বপ্রথম ঠাট্টাচ্ছলে তার কানে এ খবর পৌঁছায় যে, তাদের গোত্রের এক ব্যক্তির মাথা খারাপ হয়েছে। সে নিজেকে নবী বলে দাবী করে।
দু’একজন মুসলমান ধর্মীয় টানে সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আকীদাহ ও তার শিক্ষা সম্পর্কে অবগত করেন। তিনি মনোযোগ সহ তাদের কথা শুনে চমকে ওঠেন। তিনি আগ্রহ ভরে মুসলমান ব্যাবসায়ীদের নিকট আরো কিছু জানতে চান। তারা তাদের জানা কথা তাকে জানিয়ে দেন।
কিন্তু এতে তার পিপাসা মিটে না। তিনি এতই প্রভাবিত হয়ে পড়েন যে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছতে চান। দিন, রাত, মাস, বছর পেরিয়ে সময় নিজ গতিতে চলতে থাকে অবশেষে তিনি নবীজির হস্ত মোবারকে ইসলাম কবুল করেন। অনেক ত্যাগ, সীমাহীন কুরবানী দিতে হয়। এ সময় হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বার্ধক্যের সর্বশেষ সোপান অতিক্রমকারী তৎকালীন বিশ্বের সর্বাধিক বর্ষীয়ান ব্যক্তিত্ব।
নিজদেশে সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু শুধু ধর্মীয় গুরুই ছিলেন না, যুদ্ধ বিদ্যায়ও ছিলেন অদ্বিতীয়। তৎকালীন যুগে ধর্মগুরুও যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং শক্তি পরীক্ষায় পারদর্শী ছিলেন। প্রত্যেক বিজ্ঞ আলেমও সৈনিক হতেন। তবে আল্লাহ্ পাক সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে অপূর্ব রণকুশল প্রতিভা দান করেছিলেন। বিপদ মুহূর্তে অভূতপূর্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন করে প্রতিপক্ষকে বোকা ও অসহায় করতে তাঁর তুলনা ছিল না। স্বদেশে কোন যুদ্ধ বাঁধলে কিংবা বহিঃশত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হলে তৎক্ষণাৎ বাদশা সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে পাঠাতেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি তাকে জ্ঞাত করে জরুরী পরামর্শ চাইতেন। প্রখ্যাত সেনাপতিরাও তাঁর শিষ্য ছিল।
সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু এ সময় মদীনায়। তখন তিনি একজন সম্মানিত সাহাবী ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অপূর্ব রণ-কুশল সম্পর্কে জানতে পেরে পুরো পরিস্থিতি তাঁর সামনে তুলে ধরেন।
গভীর চিন্তা-ভাবনা শেষে মন্তব্য করতে গিয়ে হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “শহর পরিবেষ্টনকারী পরিখা খনন করলে ভাল হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম এবং কমান্ডারগণ পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। হযরত সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু কি বলেন। কারণ, আরবের লোকেরা পরিখা সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন না। পারস্যে পরিখা খননের প্রচলন ছিল। পরিখার কথা শুনে সবাইকে অবাক হতে দেখে সালমান ফার্সী রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিখার বিস্তারিত বিবরণ ও প্রতিরক্ষার কথা বৈঠকে তুলে ধরেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মত ঐতিহাসিক রণকুশলী সেনাপতি অতি সহজেই পরিখার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বুঝতে সক্ষম হন। কিন্তু রাসূলের সেনাপতিগণ পড়েন দোটানায়। বিস্তৃত এ শহরের চারপাশে বেশ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থবিশিষ্ট গভীর খন্দক খনন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক খননেরই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলে তাদের আপত্তির কোন অবকাশ রইল না। খন্দকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং গভীরতার পরিমাপ করা হয়। খননকারীদের সংখ্যাও হিসাব করা হয়। খননযোগ্য স্থান এবং খননকারীদের সংখ্যাকে সামনে নিয়ে হিসেব করে কতজন কতটুকু জায়গা খনন করবে তা ভাগ করে দেয়া হয়। এ বণ্টন হিসেবে প্রতি ১১০ জনের ভাগে ৪০ হাত খননের দায়িত্ব পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পারলেন খন্দক কি লোকেরা এখনো বুঝতে পারছেনা এবং পরিখা খনন করতে তারা কেমন যেন ইতস্তত করছে। তিনি কোন কথা বলেন না। কোদাল নিয়ে খনন করতে শুরু করেন।
