খালিদের ঐ দিনের কথা স্মরণ হয় যেদিন আবু সুফিয়ান তাকে তার বাসভবনে ডেকে পাঠায়। আবু সুফিয়ানের প্রতি একদিন যে শ্রদ্ধা ও মর্যাদাবোধ তার অন্তরে ছিল তখন তা ছিল না। আবু সুফিয়ান যেহেতু তখনও সর্বোচ্চ নেতার আসনে সমাসীন ছিল তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি তার বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন। তিনি সেখানে গিয়ে ইকরামা ও সফওয়ানকে দেখতে পান।
আবু সুফিয়ান বলে–“খালিদ! আমি মদীনায় হামলা করার স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” খালিদের মনে হয়েছিল, তিনি যেন ভুল শুনছেন। বিস্মিত নয়নে ইকরামা এবং সফওয়ানের দিকে তাকান। তাদের উভয়ের ঠোঁটে ছিল মুচকি হাসি।
আবু সুফিয়ান বলে–“হ্যাঁ, খালিদ! যত দ্রুত সম্ভব লোকদেরকে মদীনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত কর।”
যে সমস্ত গোত্রকে ইহুদীরা কুরাইশদের সহযোগিতা করতে রাজি করিয়েছিল সে সকল গোত্রের কাছে বার্তা প্রেরণ করা হল।
৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস। এ সময় বিভিন্ন গোত্রের যোদ্ধারা দলে দলে মক্কায় জমায়েত হতে থাকে। গাতফান গোত্রের সৈন্য ছিল বেশি। তারা প্রায় তিন হাজার। মুনিয়া নামক এক ব্যক্তি ছিল তাদের অধিনায়ক। বনূ সালেম ৭০০ সৈন্য প্রেরণ করে। বনূ আসাদও তুলাইহা বিন খুয়াইলাদের নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করে। কুরাইশদের নিজস্ব সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪ হাজার পদাতিক, ৩‘শ অশ্বারোহী এবং দেড় হাজার উষ্ট্রারোহী। অবশেষে ১০ হাজারের বিশাল বাহিনী মদীনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়। আবু সুফিয়ান ছিল এ সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। সে এ বাহিনীর নাম দেয় বহুজাতিক বাহিনী।
কয়েকটি গোত্র মক্কায় আসেনি। তারা খবর পাঠায়, বহুজাতিক বাহিনী মদীনা অভিমুখে যাত্রা করলে তারা পথিমধ্যে মূল বাহিনীর সাথে যোগ দিবে। বহুজাতিক বাহিনীর মদীনাভিমুখে যাত্রা করার ঐতিহাসিক সময়ের কথা খালিদের স্মৃতিতে ভেসে উঠে। এ বিশাল বাহিনীর একাংশের অধিনায়ক খালিদ ছিলেন অপেক্ষাকৃত একটি উঁচু স্থানে। অশ্বপৃষ্ঠে বসে সৈন্যদের দিকে তিনি তাকান। বাহিনী এত বিশাল ছিল যে, শুরু এবং শেষ তার নজরে আসে না। যতদূর দৃষ্টি যায় সৈন্যদের অগ্রযাত্রার দৃশ্যই শুধু দেখতে পান। বিভিন্ন বাদ্য-যন্ত্র, রণ-সঙ্গীত এবং সৈন্যদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস খালিদের রক্তে শিহরণ তুলছিল। তিনি গর্দান সোজা করে মনে মনে বলতে থাকেন, এবার মুসলমানরা নিশ্চয় পিষ্ট হয়ে যাবে। আর ইসলামের অণুকণা আরবের বালুর সাথে একাকার হয়ে চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এটা ছিল তার বদ্ধমূল বিশ্বাস।
৬২৭ খিষ্টাব্দের ২৪শে ফ্রেব্রুয়ারি বহুজাতিক বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে গিয়ে হাজির হয়। উহুদের পূর্ববর্তী অবস্থান স্থলে গিয়ে কুরাইশরা এবারও তাঁবু ফেলে। এটি ছিল বিপরীত দিক দিয়ে আসা দু’টি নদীর মিলন মোহনা। কুরাইশ ব্যতীত অন্যান্য সৈন্যরা উহুদের পূর্বপ্রান্তে শিবির স্থাপন করে।
মদীনাবাসী কুরাইশদের আগমন বার্তা জানে কি-না তা পরীক্ষা করতে তারা দু’গুপ্তচরকে ব্যবসায়ী সাজিয়ে মদীনায় প্রেরণ করে। আবু সুফিয়ানসহ অন্যান্য উপসেনাপতিদের ইচ্ছা ছিল মদীনাবাসীদের অজান্তেই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু পর দিনই কুরাইশদের প্রেরিত এক ইহুদী গুপ্তচর মদীনা হতে ফিরে এসে আবু সুফিয়ানকে জানায় যে, মুসলমানরা তাদের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল।
“মুসলমানদের মধ্যে ভয় আর ভীতি এবং উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছিল।” ইহুদী গুপ্তচর বলে–“সারা শহরে ভয় আর আতঙ্ক ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মুহাম্মাদ ও তাঁর একান্ত সহযোগিদের বক্তৃতায় মুসলমানরা সীসাঢালা প্রাচীরের মত হয়ে যায়। শহরের অলি-গলিতে ঘোষক যুদ্ধের প্রতি আহবান করে ফিরছে। এতে সবার মধ্যে বিপুল সাড়া জেগেছে। সবাই যুদ্ধ করতে সমবেত হচ্ছে। আমার ধারণা মতে তাদের সংখ্যা তিন হাজারের অধিক হবে না।”
ঐতিহাসিকগণ লিখেন, প্রকৃতই মুসলমানদের সংখ্যা তিন হাজার ছিল। তারা আগেভাগেই জানতে পেরেছিলেন যে, শত্রুবাহিনীর সংখ্যা দশ হাজার। অশ্বারোহী এবং উষ্ট্রারোহীর সংখ্যা অনেক। ইতোপূর্বে আরবের মাটি একসাথে এত লোকের সমাবেশ আর কখনো দেখেনি।
সৈন্যসংখ্যা এবং যুদ্ধাস্ত্রের দিক বিবেচনা করলে যুদ্ধ না করেই মুসলমানদের আত্মসমর্পণ করা কিংবা রাতের অন্ধকারে মদীনা ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকা উচিত ছিল। কেউ ভাবতেও পারে না যে, তিন হাজার মুসলমান দশ হাজার সৈন্যের মোকাবিলায় মুহূর্তের জন্য দাঁড়াতে পারবে। দশ হাজার মানুষ মদীনার ইট একটি একটি করে খুলে নিবে অনায়াসে। কিন্তু এটা ছিল হক ও বাতিলের যুদ্ধ। আল্লাহ্ পূজারী ও মূর্তি পূজারীদের যুদ্ধ। সত্যের বিজয় সুনিশ্চিত করা ছিল অনিবার্য। ঐ মহান আহ্বানের মর্যাদা রক্ষাও ছিল অবশ্যকর্তব্য, যা আল্লাহ্ পাক হেরা গুহায় এক আরব রত্নের মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে সম্প্রচার করেছিলেন এবং তাকে নবুওয়াতের মর্যাদায় বিভূষিত করেছিলেন।
“যারা সত্য এবং সততার উপর থাকে আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন।” মদীনার অলি-গলিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই বাণী গুঞ্জন তুলে ফিরছিল– “কিন্তু মনে রেখ, আল্লাহর সাহায্য তখনই লাভ করবে, যখন অন্তর থেকে ভয়-ভীতি দূর করে একে অপরের হাত ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে। এবং আল্লাহর রাহে জীবন উৎসর্গের দৃঢ় শপথ করবে। যারা রব হিসেবে একমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করে না এবং ইসলামের সত্যতা স্বীকার করে না তারা আমাদের দুশমন। তাদেরকে হত্যা করা ফরয। মনে রেখ, আঘাত করতে গেলে অনেক সময় আঘাত খেতেও হয়। ঈমান থেকে শক্তিশালী এমন কোন শক্তি নেই যা শত্রুর হাত থেকে তোমাদেরকে বাঁচাতে পারে। মদীনা নয়, লালিত চেতনা ও ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাস রক্ষা করাই এখন প্রধান কাজ। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে অগ্রসর হলে তখন ১০ হাজারের মোকাবিলা করেও বিজয় ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হবে। হতবল এবং ভীতুদের পক্ষে আল্লাহ পাক কখনো স্বীয় কুদরত প্রদর্শন করেন না। আকীদা রক্ষা এবং স্বীয় ভূখণ্ড রক্ষায় তোমাদেরই সর্বোচ্চ নৈপুণ্য ও বীরত্বের চমক দেখাতে হবে।”
