হযরত খালিদের মনে পড়ে, আবু সুফিয়ানের ভাষণের পর সৈন্যদের মধ্যে হতে দু’ধরনের শ্লোগান ওঠে। এক অংশ তার মনের কথার প্রতিধ্বনি করছিল যে, আমরা এ অবস্থায়ই মুসলমানদের মোকাবিলা করব। অপর অংশ আবু সুফিয়ানের সিদ্ধান্তকেই মেনে নেয়। প্রত্যাবর্তনের এই নির্দেশ ছিল স্বয়ং প্রধান সেনাপতির। তাই সবার জন্য তার আদেশই ছিল শিরোধার্য। কিন্তু খালিদ, ইকরামা এবং সফওয়ান আবু সুফিয়ানের এ নির্দেশ মানতে রাজি নয়। কিন্তু আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে তাদের এই বিদ্রোহ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। বিদ্রোহী তিন উপসেনাপতি সৈন্যদের উপর তাৎক্ষণিক এক জরীপ চালিয়ে তাদের পক্ষে কতজন আছে তা জানতে চেষ্টা করে। কিন্তু এ জরীপের ফলাফলও তাদের বিরুদ্ধে যায়। অধিকাংশ সৈন্য আবু সুফিয়ানের নির্দেশে মক্কায় ফেরত যায়। ফলে বাধ্য হয়ে বিদ্রোহীরাও সমমনা সৈন্যদের নিয়ে আবু সুফিয়ানের বাহিনীর পিছু পিছু চলে আসতে হয়।
হযরত খালিদের স্পষ্ট মনে পড়ে, সেদিন এভাবে মক্কায় ফিরে আসার সময় তার মস্তক ছিল অবনত। উপসেনাপতিদের কেউ একে অপরের প্রতি তাকাবার অবস্থা ছিল না। লজ্জা যেন সকলকে গ্রাস করে নিয়েছিল। হযরত খালিদের বারবার মনে হচ্ছিল। যুদ্ধে যদি তার একটি পা, বা একটি হাত দু’টি চোখ নষ্ট হয়ে গেলে তেমন দুঃখ হত না, যেমনটি আজ বিনা যুদ্ধে প্রত্যাবর্তনের কারণে হচ্ছে। তিনি অনুভব করেন, তার অস্তিত্ব বলতে এতদিন যা কিছু ছিল তা মৃত্যুবরণ করেছে। এখন অশ্ব পৃষ্ঠে তাঁর মরদেহ মক্কায় ফিরে যাচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হত্যা ছিল তার প্রধান টার্গেট; যা পূরণ না করে সে ফিরে চলছে। এই ব্যর্থতাই তাকে অব্যাহতভাবে দংশন করে চলছিল।
খালিদের অতীত ছিল স্মৃতির অভিধান। যার বর্ণনা শেষ হবার নয়। বনূ নযীর, বনু কুরাইজা এবং বনূ কায়নুকা তিন ইহুদী গোত্রের কথা তার স্মরণ হয়। তারা কুরাইশদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে। কিন্তু আবু সুফিয়ান তাদের প্ররোচনায় প্ররোচিত হয় নি। খালিদ চিন্তা করে আবিষ্কার করতে পারেননি যে, আবু সুফিয়ানের দুরভিসন্ধি কি? মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নাম শুনে তার এই ঘাবড়ানোর কারণ কি?
চলতি বছরেরই শীত মৌসুমের শুরুতে খায়বারের কতক ইহুদী মক্কায় যায়। তাদের নেতার নাম হুয়াই বিন আখতার। এ লোকটি ইহুদী গোত্র বনু নষীরের নেতাও ছিল। ইহুদীরা ছিল প্রচুর স্বর্ণ-রৌপ্যের মালিক। এই ইহুদী দলটি আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবৃন্দের জন্য মূল্যবান উপহার সামগ্রী নিয়ে যায়। সাথে ছিল সুন্দরী-রূপসী ললনা।
ইহুদীরা মক্কায় প্রথমে আবু সুফিয়ানের সাথে দেখা করে। তাকে মূল্যবান উপহার প্রদান করে এবং রাতে নৃত্যশিল্পীদের দ্বারা মনোজ্ঞ নৃত্য পরিবেশন করেও দেখায়। এরপর হুয়াই বিন আখতার খালিদ, ইকরামা ও সফওয়ানের উপস্থিতিতে আবু সুফিয়ানকে বলে তারা যদি এখনই মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন না করে এবং তাদের অগ্রসরমান যাত্রার গতিরোধ না করে তাহলে ইয়ামামাকেও একদিন তারা দখল করে নিবে। আর তাদের পা একবার ইয়ামামার মাটি স্পর্শ করতে পারলে, তখন আপনাতেই বাহরাইন ও ইরাক মুখী কুরাইশদের বাণিজ্যের রাস্তাও চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাবে। বাণিজ্যের এ রাস্তাটি ছিল কুরাইশদের শাহরগ এবং অর্থনীতির প্রতীক।
হুয়াইবিন আখতার বলে– “আপনারা যদি আমাদের সাথে থাকেন।”, “তাহলে আমরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি।”
আবু সুফিয়ান বলে– “আমরা সংখ্যায় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদেরকে পরাস্ত করতে পারিনি, তিনগুণ বেশি হলেও তাদের পরাস্ত করা সম্ভব নয়। কিছু গোত্র আমাদের সাথে এসে যোগ দিলেই কেবল আমরা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে পারি।”
হুয়াই বিন আখতার বলে– “এ ব্যবস্থা আমরা ইতোমধ্যেই করে রেখেছি, গাতফান এবং বনু আসাদ গোত্র আপনাদের সাথে থাকবে। আমাদের প্রচেষ্টার ফলে আরো কয়েকটি গোত্র আপনাদের সঙ্গে চলে আসবে।”
খালিদের স্মৃতির আয়নায় কোন কিছুই অস্পষ্ট নয়। বিগত দিনের সব কিছুই তার স্মৃতিপটে ভাসতে থাকে। তার মনে পড়ে আবু সুফিয়ানের ভীতু চেহারা। আবু সুফিয়ান ভাল করেই জানতেন, কুরাইশদেরকে এভাবে উত্তেজিত করার পেছনে ইহুদীদের বড় স্বার্থ হল, তারা ইসলামের উত্থানকে ইহুদীবাদের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ বলে আশঙ্কা করত। কিন্তু চতুর ইহুদীরা এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে আবু সুফিয়ানের কাছে এমন চিত্র তুলে ধরে, যার মধ্যে মুসলমানদের হাতে কুরাইশদের ধ্বংস ছিল ভোরের আলোর ন্যায় স্পষ্ট। তাছাড়া আবু সুফিয়ানের উপর খালিদ, ইকরামা এবং সফওয়ানের ক্রমবর্ধমান চাপও ছিল উল্লেখযোগ্য।
ঋতুচক্রের প্রতিকূলতা এবং দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও যদি মুসলমানরা যুদ্ধ করতে পারে তাহলে আমরাও যুদ্ধ করতে পারতাম।”
“আপনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে আমাদেরকে প্রতারিত করেছেন।”
আবু সুফিয়ান ভীরু…। সে পুরো গোত্রকেই কাপুরুষ বানিয়েছে।
এখন মুহাম্মাদের অনুসারীরা আমাদের মাথার উপর লাফিয়ে পড়বে।”
এ জাতীয় তিরস্কার ও বিদ্রুপাত্মক বিভিন্ন কথাবার্তা শহরের অলি-গলিতে ফলাও হয়ে প্রচারিত হতে থাকে। এ আওয়াজ উঠার পেছনে ইহুদীদের হাত ছিল। কিন্তু কুরাইশদের স্বকীয়তা এবং প্রতিশোধ স্পৃহা তাদেরকে অস্থির করে তোলে আবু সুফিয়ানের অবস্থা এতই নাজুক হয়ে পড়ে যে, তিনি বাইরে বের হওয়াই ছেড়ে দেন।
