এক ঐতিহাসিকের বর্ণনা মতে মদীনায় এই গুজবকে সত্য বলে বিশ্বাস করা হয় এবং মুসলমানদের চেহারাতে এর মারাত্মক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত এই গুজব পৌঁছলে এবং তাকে সাহাবায়ে কেরামের ভীতির কথা জানানো হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে একত্র করে এক হৃদয়স্পর্শী ভাষণ দেন–
“সংখ্যায় বেশির কথা শুনে আল্লাহর সৈনিকরা এত ভীত কেন? আল্লাহ্ পূজারীরা কি আজ মূর্তি-পূজারীদের ভয়ে সন্ত্রস্ত? যদি তোমরা কুরাইশদের ভয়ে এত ভীত হয়ে পড় যে, তাদের যুদ্ধ– আহ্বানে সাড়া দেয়ার হিম্মত না হয়, তাহলে যে সত্তা আমাকে রাসুল করে প্রেরণ করেছেন তাঁর নামে শপথ করে বলছি, কেউ না গেলেও আমি একাই তাদের মোকাবিলায় বদরে যাব।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ থেমে আরো কিছু বলতে চান; কিন্তু রাসূল-প্রেমিকদের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করা আবেগ-উত্তেজনাকর শ্লোগানে ঘুমন্ত মরু সিংহের দল জেগে ওঠে। ছড়ানো গুজবের সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক ভাষণেই গুজবের প্রতিক্রিয়া দূরীভূত হয়ে যায়। এবং মুসলমানরা সানন্দে যুদ্ধ-প্রস্তুতি নিতে থাকে। হাতে সময় ছিল কম। সীমিত এ সময়ের মধ্যেই তারা যথাসম্ভব প্রস্তুতি নেয়। সৈন্যরা যখন বদর অভিমুখে রওনা হয় তখন তাদের সংখ্যা ছিল দেড় হাজার। আর ছিল পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী।
গুজব ছড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে যে সমস্ত ইহুদীকে মদীনায় প্রেরণ করা হয়, তারা ফিরে এসে প্রতিবেদন দেয় যে, প্রথমে গুজব আশাতীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু একদিন মুহাম্মাদ মুসলমানদের সমবেত করে কয়েকটি কথা বলতেই সবাই এক পায়ে বদরে যেতে তৈরি হয়ে যায়। মদীনায় আমরা থাকা কালেই তাদের সংখ্যা দেড় হাজার পৌঁছেছিল। যতটুকু ধারণা এ সংখ্যা কমবেশী হবে না।
আজ মদীনা যেতে যেতে সে ঘটনা স্মরণ হওয়ায় খালিদ-এ জন্য লজ্জিত হন যে, তিনি সেদিন অনুমান করেন যে, আবু সুফিয়ান নাম মাত্র অজুহাতে মুসলমানদের মোকাবিলা থেকে পিছু থাকতে চায়। খালিদ মুসলমানদের সংখ্যা সম্পর্কে জানতে পেরে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে আবু সুফিয়ানের কাছে আসেন।
হযরত খালিদ বলেন– “আবু সুফিয়ান!” “নেতার আনুগত্যের ব্যাপারে আমরা শ্রদ্ধাশীল। আমি কুরাইশদের মাঝে নেতার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ধারা চালু করতে চাই না। কিন্তু তাই বলে কুরাইশ জাতির মান-মর্যাদা জলাঞ্জলী দিতে পারি না। আপনি আপনার অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করুন। কুরাইশদের মান-মর্যাদার প্রশ্নটি আমার অন্তরে তীব্রভাবে উজ্জীবিত হবে, যার ফলে আপনার নির্দেশ মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। এমনটি যেন না হয়।”
আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করে– মদীনায় ইহুদীদের পাঠানোর কারণ তুমি জান না?” “যুদ্ধের আগে আমি মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চাই..।”
হযরত খালিদ তার কথা শেষ না হতেই বলে উঠেন – “আবু সুফিয়ান!” “প্রকৃত যোদ্ধারা কখনও ভয় দেখায় না। মাত্র কয়েকজন মুসলমানকে লড়তে আপনি দেখেন নি? কুরাইশদের শত বর্শাঘাতের মুখে খুবাইব ও যায়েদকে তাকবীরধ্বনি দিতে শুনেন নি?… আমি শুধু এ কথাই বলতে এসেছি যে, আপন নেতৃত্বের মর্যাদা রক্ষা করুন এবং বদরে রওনা হওয়ার বাস্তব উদ্যেগ নিন।
♣♣♣
পরদিনই ফলাও হয়ে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, মুসলমানরা যুদ্ধ সামগ্রী নিয়ে মদীনা থেকে বদর অভিমুখে যাত্রা করেছে। সৈন্যদের রওয়ানা করার নির্দেশ ব্যতীত এরপর আবু সুফিয়ানের জন্য বিকল্প কোন রাস্তা খোলা ছিল না। সর্বমোট কুরাইশ সৈন্য সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার পদাতিক আর একশ অশ্বারোহী। সেনাপতির দায়িত্ব ছিল আবু সুফিয়ানের হাতেই। ইকরামা, সফওয়ান এবং খালিদ ছিলেন আবু সুফিয়ানের উপসেনাপতি। পূর্বের ন্যায় এবারও আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা, কতিপয় দাসী এবং সঙ্গীত শিল্পীরা সৈন্যদের সাথে থাকে।
৬২৬ খিষ্টাব্দের ৪ঠা এপ্রিল, বুধবার। পূর্ব নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মুসলিম বাহিনী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে বদর ময়দানে পৌঁছে যান।
এ সময় কুরাইশরা আসফান নামক স্থানে এসে উপস্থিত হয়। তারা সেখানেই রাত যাপন করে। ভোরেই তাদের সম্মুখে এগিয়ে যাবার কথা কিন্তু পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। সবাইকে হতবাক করে দিয়ে আবু সুফিয়ান সকালে সৈন্যদের সম্মুখে অগ্রসর হবার নির্দেশ দেয়ার পরিবর্তে এক স্থানে জমা করে বলেন–
“কুরাইশ বাহাদুরগণ! মুসলমানরা তোমাদের নাম শুনতেই আঁৎকে ওঠে। এটা হবে তাদের সাথে আমাদের চূড়ান্ত যুদ্ধ। মুষ্টিমেয় মুসলমানকে আমরা নিশ্চিহ্ন করে দেব। এরপরে দুনিয়ার বুকে কোন মুহাম্মাদ থাকবে না, থাকবে না তাকে স্মরণ করার কেউ। কি যে অবস্থার মধ্য দিয়ে আমরা যুদ্ধে চলেছি, তা আমাদের অনুকূল নয়। যা আমাদের পরাজয় ডেকে আনতে পারে। তোমরা জান, রসদ পত্র আমরা পরিমিত আনতে পারিনি। সম্মুখে রসদ পাবার সম্ভাবনাও নেই।স্মরণকালের ভয়াবহ খরা দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তারপরে রোদ্রের প্রখরতা তো আছেই। আমি আমার বীর-বাহাদুর ভাইদেরকে ক্ষুধা-পিপাসায় তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না; আমি চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য সুযোগের অপেক্ষা করব। আমি সম্মুখে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিব না; বরং মক্কায় ফিরে চল।”
