এত সুন্দর প্রাণীর এভাবে লড়াই করাটা ভাল মানায় না। খালিদ তবুও দেখতে থাকেন। তার অশ্বটি এক দর্শক হরিণের চোখে পড়ে যায়। সে সাথে সাথে গলা লম্বা এবং পা দ্বারা মাটিতে আঘাত করতে থাকে। লড়াইরত হরিণদ্বয় যে যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় থেমে যায়। মুহূর্তে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সকল হরিণ এক দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায় এবং খালিদের চোখের আড়ালে চলে যায়।
কুরাইশ নেতারা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। পরস্পরের মধ্যে বৈরীতা সৃষ্টি না হলেও পূর্বের মত একতা, আন্তরিকতা ও হৃদ্যতা ছিল না। সবাই তখনও বাহ্যিকভাবে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্ব মেনে চলছিল। কিন্তু ভিতরে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। যখন সিসাঢালা ঐক্য প্রয়োজন তখন তারা দ্বিমুখী আচরণ শুরু করে। এ অবস্থা খালিদ কে অত্যন্ত বেদনাহত করে।
“নিজেদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হলে তা শত্রুদের শক্তি বৃদ্ধি করে” খালিদ একদিন আবু সুফিয়ানকে বলেন– “অনৈক্যকে ঐক্যে রূপ দেয়ার উপায় নিয়ে কখনও ভেবেছো কি?
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবু সুফিয়ান বলে– “অনেক ভেবেছি খালিদ। পূর্বের ন্যায় সকলেই এখনও আমার সাথে উঠা-বসা এবং কথাবার্তা বললেও অনেকের অন্তর আমার নিকট পরিষ্কার মনে হচ্ছে না।… এমন কোন উপায় উদ্ভাবন করতে পার যা অন্তরের পঙ্কিলতা দূরীভূত করে দেয়?”
খালিদ বলেন– “হ্যাঁ, আমার মাথায় একটি উপায় রয়েছে।” “নেতাদের অন্তরে ফাটল সৃষ্টি হওয়ার আসল কারণ, হচ্ছে তাদের ভুল ধারণা। তারা ভাবছে, আমরা এখন কাগুজে বীর। আমাদের হৃদয় মুসলমানদের ভয়ে ভীত। বিশেষ করে শারযা ধোঁকা দিয়ে ছয়জন মুসলমানকে এনে এবং তাদের দু’জনকে আমাদের হাতে হত্যা করিয়ে আমাদের ঐতিহ্যকেই যেন বদলে দিয়েছে। এর প্রতিবিধান আমার মতে এভাবে করা যেতে পারে যে, আমরা হয়ত মদীনা আক্রমণ করব নতুবা মুসলমানদেরকে কোন রণাঙ্গনে আহ্বান করে আমরা প্রমাণ করব যে, আমরা কাগুজে বীর নই, আমরা প্রকৃতই বীর। মুসলমানদের মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত আমাদের এ যুদ্ধসাজ থাকবেই।”
“আমাদের কাছে এর যুক্তিও রয়েছে।” আবু সুফিয়ান গদ গদ কণ্ঠে বলে– “উহুদ যুদ্ধ শেষে আমি মুহাম্মাদকে আহ্বান করে বলেছিলাম, বদরে পরাজয়ের প্রতিশোধ আমরা উহুদে নিয়েছি। আমি তাকে আরো বলেছিলাম, কুরাইশদের অন্তরে প্রতিশোধের আগুন জ্বলতেই থাকবে। আগামী বছরেই আমরা তোমাদেরকে বদর প্রান্তরে ডাকব।”
খালিদ বলেন– “হ্যাঁ, মনে আছে।” “ওমর জবাবে বলেছিল, আমাদেরও ইচ্ছা যে, আমাদের এবং তোমাদের মধ্যে পরবর্তী সাক্ষাৎ বদরেই হোক।”
আবু সুফিয়ান বলে– “ঘোষণা ওমর করলেও কথাগুলো কিন্তু মুহাম্মাদেরই।” “মুহাম্মাদ মারাত্মক আহত ছিল। জোরে কথা বলার শক্তি তার ছিল না।… আমি এখনই মুহাম্মাদের কাছে এই মর্মে বার্তা পাঠাচ্ছি যে, অমুক দিন বদর প্রান্তরে এস; দেখবে যুদ্ধ কাকে বলে।”
অতঃপর উভয়ে পরামর্শক্রমে একটি দিনক্ষণ ধার্য করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ ব্যাপারে জানাতে কোন ইহুদীকে মদীনায় পাঠানো হবে।
পরের দিন আবু সুফিয়ান কুরাইশের সকল নেতৃবৃন্দকে তার বাসভবনে ডেকে এনে বড় উচ্ছ্বাস ও আনন্দের সাথে ঘোষণা করে যে, সে মুসলমানদেরকে যুদ্ধের জন্য বদরে আহ্বান করছে। কুরাইশরা এমন একটি সংবাদ শুনতে অপেক্ষায় ছিল। আত্মীয়-স্বজনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। তাদের অন্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বৈরীতা বারুদের ন্যায় উত্তপ্ত ছিল, যা একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল। তাদের ক্ষোভের মূল কারণ, মুহাম্মাদ পিতা-পুত্র এবং ভাই-ভাইকে পরস্পরের দুশমনে পরিণত করেছে।
আবু সুফিয়ানের এই ঘোষণা সবাইকে এক প্লাটফর্মে এনে দাঁড় করায়। সব ধরনের মন-মালিন্য দূর করে দেয়। সকল বিভেদ ভুলে গিয়ে যুদ্ধ প্রস্তুতির আলোচনা করে। এক বিচক্ষণ ইহুদীর উপর বার্তা প্রেরণের দায়িত্ব অর্পণ করে বলা হয়, সে যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বার্তা হস্তান্তর করে এবং দ্রুত ফিরতি উত্তর নিয়ে আসে।
কুরাইশ নেতৃবৃন্দের অন্তর থেকে যেদিন পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অনৈক্যের পর্দা দূর হয় সেদিন খালিদ মনে মনে খুবই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। তিনি বাগাড়ম্বরী ছিলেন না, তবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজ হাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কতল করবেন।
ইহুদী দূত সংবাদ নিয়ে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু সুফিয়ানের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করেছেন। ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের একটি দিন যুদ্ধের জন্য নির্ধারিত হয়। কিন্তু আবহাওয়া বাঁধার কারণ হয়। মৌসুমে সাধারণত যতটুকু বৃষ্টি হত এ বছর তার থেকে অনেক কম হয়। যার ফলে মৌসুমটি এক প্রকার ভীষণ খরার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। মার্চ মাসেই প্রচণ্ড গরম পড়ে, যা অন্য বছর আরো ২/৩ মাস পড়ে হয়। আবু সুফিয়ান তাই পূর্ব নির্ধারিত দিনে যুদ্ধ করা সমীচীন মনে করে না।
স্মৃতির এ হিসাবটি তাকে লজ্জিত করে। কেননা আবু সুফিয়ান গ্রীষ্ম মৌসুমের ছুতায় যুদ্ধ বিলম্ব করেছিল।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ লিখেন, আবু সুফিয়ান কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে একত্র করে বলে, সে সৈন্য পাঠানোর আগে মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করতে চায়। সে এ লক্ষ্যে ইহুদীদের হাত করে এবং দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দিয়ে ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে তাদেরকে মদীনায় প্রেরণ করে। তাদের দায়িত্ব ছিল, মদীনায় গিয়ে এই গুজব রটিয়ে দেয়া যে, কুরাইশরা বিশাল বাহিনী নিয়ে বদরে আসছে, যা ইতোপূর্বে মুসলমানরা কখনো দেখেনি।
